ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন তিন জগতের অধীশ্বর হিসেবে রুক্মিণীকে এমন কঠোর কথা বললেন—যা তার প্রিয়তমের মুখে আগে কখনও শোনেননি—তখন রুক্মিণী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গভীর ও অন্তহীন বিষাদে ডুবে গেলেন এবং অশ্রুপাত করতে লাগলেন। তাঁর সুন্দর পদযুগল, যা লাল রঙের নখে শোভিত ছিল, সেই পদ দিয়ে তিনি মাটিতে আঁকিবুকি করতে লাগলেন। তাঁর কাজল মাখা চোখ থেকে ঝরা অশ্রু তাঁর স্তনদেশে গড়িয়ে পড়ছিল, যা কেশর দিয়ে অলঙ্কৃত ছিল; তিনি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং তীব্র শোকে তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। অসহ্য দুঃখ, ভয় ও বিষাদে তাঁর মন ভেঙে পড়েছিল। তাঁর হাত থেকে চুড়ি খুলে পড়ে গেল, পাখা মাটিতে পড়ে গেল; দেহ ও মন বিভ্রান্ত হয়ে তিনি হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেলেন, যেন বাতাসে কলাগাছ ভেঙে পড়ে—চুল এলোমেলো হয়ে গেল। এই দৃশ্য দেখে প্রেমে আবদ্ধ শ্রীকৃষ্ণ, যিনি তাঁর প্রিয়ার গভীর ভালোবাসার কথা তখনও পুরোপুরি জানতেন না, করুণায় বিগলিত হলেন। তিনি দ্রুত শয্যা থেকে নেমে এলেন, চারভুজ বিশিষ্ট ভগবান নিজ হাতে রুক্মিণীকে উঠিয়ে নিলেন, তাঁর চুল গুছিয়ে দিলেন এবং পদ্মসম হাত দিয়ে মুখ মুছে দিলেন। তাঁর চোখের জল ও দুঃখে ভেজা স্তন মুছে দিয়ে ভগবান তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন—এই রুক্মিণী যিনি একমাত্র স্বামীকেই সর্বস্ব মানেন। যিনি সকলকে শান্তনা দিতে জানেন, সেই ভগবান করুণায় তাঁর বিভ্রান্ত চিত্তকে শান্ত করলেন; অহংকার ও পরিহাসে বিভ্রান্ত হলেও তিনি এমন কষ্টের যোগ্য ছিলেন না—ভগবান, যিনি সদাচারীদের আশ্রয়, তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন। এরপর ভগবান বললেন, ‘‘হে বিদর্ভরাজকন্যে, রাগ করো না। আমি জানি, তুমি আমার প্রতি একান্তভাবে নিবেদিত। তোমার কথা শোনার অভিলাষে আমি কৌতুক করেছিলাম, হে সুন্দরী। আমি চেয়েছিলাম, তোমার প্রেমে কাঁপা অধর, রক্তিম চাহনি আর ভ্রুকুটি-ভঙ্গিমা দেখব।’’ ‘‘গৃহস্থ জীবনে, হে ভীত-স্বভাবা ও সুন্দরী, পরস্পরের সঙ্গে কৌতুকপূর্ণ কথা বলাই সর্বোচ্চ লাভ।’’ শ্রীশুক বললেন, ‘‘এইভাবে ভগবানের সান্ত্বনায় রুক্মিণী বুঝলেন, ভগবান যা বলেছিলেন তা কেবল পরিহাস ছিল এবং স্বামীর পরিত্যাগের ভয় তাঁর মন থেকে সরে গেল।’’ তিনি ভগবানের মুখের দিকে তাকিয়ে কোমল ও স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে, লজ্জাভরা হাসি দিয়ে বললেন, ‘‘হে পদ্মনয়ন, আপনি যা বলেছেন তা সত্যিই। আমার সামান্য গুণ ও অজ্ঞানতা নিয়ে আমি কিভাবে আপনার মতো সর্বশ্রেষ্ঠ, ঐশ্বর্যময়, স্বমহিমায় তৃপ্ত প্রভুর উপযুক্ত সঙ্গিনী হতে পারি?’’ ‘‘হে মহাবাহু, আপনি সকল গুণে বিরাজমান হয়েও সেগুলোর দ্বারা স্পর্শিত নন—যেমন সমুদ্র তরঙ্গের নিচে থাকে। আপনি ইন্দ্রিয়াতীত, ভক্তদের জন্য রূপ ধারণ করেন, রাজন্যদের হৃদয় থেকে অজ্ঞানের ঘন অন্ধকার দূর করেন।’’ ‘‘আপনার চরণপথ, যেটি মুনিদের আনন্দের বিষয়, মানুষ ও পশুর জন্য দুর্জ্ঞেয়, কারণ আপনার কার্যকলাপ জাগতিক বোধের অতীত; কেবল আপনার পথের অনুসারীরাই আপনাকে বুঝতে পারে, হে মহান।’’ ‘‘আপনি প্রকৃতপক্ষে নিরপেক্ষ, আপনার বাইরে কিছু নেই; প্রবলরাও আপনাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। যারা অতৃপ্ত কামনা ও ঐশ্বর্যে অন্ধ, তারা আপনাকে জানে না, তবুও মহাপ্রভুরা আপনার প্রিয় এবং আপনিও তাদের প্রিয়।’’ ‘‘আপনি সকল মানব-লক্ষ্যের আধার ও ফল; জ্ঞানীরা আপনাকে পেতে সবকিছু ত্যাগ করেন। আপনার সঙ্গ তাদেরই উপযুক্ত, যারা নারী-পুরুষের সুখদুঃখে আসক্ত নয়।’’ ‘‘আপনার মহিমা যাঁরা ক্রোধ ত্যাগ করেছেন, সেই ঋষিদের দ্বারা বন্দিত; আপনি জগতের আত্মা ও আত্মাদাতা—এমনই শুনেছি। আপনার ভ্রুকুটি যখন কালের সংকেত দেয়, তখন ব্রহ্মা ও শিবও তাদের বর হারান; অন্যদের কথা কী!’’ ‘‘হে গদার বড় ভাই, আপনার কথা হয়তো সহজ মনে হয়, কিন্তু আপনি ধনুকের টংকারে রাজাদের তাড়িয়ে আমায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যেমন সিংহ পশুদের মধ্য থেকে নিজের অংশ নেয়; তাদের ভয়ে আমি সমুদ্রের আশ্রয় নিয়েছিলাম।’’ ‘‘আপনার জন্য, হে পদ্মনয়ন, অম্বরীষ, নাহুষ, গয়া প্রভৃতি রাজারা রাজ্য ত্যাগ করে অরণ্যে প্রবেশ করেছিলেন; তবু যারা এখানে থাকে, তারা কেন আপনার পথ অনুসরণ করে না?’’ ‘‘আপনার চরণকমলের সুবাস, যা সদাচারীরা বর্ণনা করেন ও মুক্তি প্রদান করে, তা যারা পেয়েছে তারা আর অন্য আশ্রয় খুঁজবে কেন? কিন্তু সাধারণ মানুষ, যারা ভোগে অন্ধ, তারা লক্ষ্মীর ধামকেও উপেক্ষা করে।’’ ‘‘আমি যথাযথভাবে আপনাকে, জগতের ঈশ্বরকে পূজা করেছি; আপনি এই ও পরজন্মের অভিলাষ পূর্ণ করেন। জন্মচক্রে ঘুরতে ঘুরতে আপনার চরণই আমার একমাত্র আশ্রয় হোক, কারণ যারা আপনাকে পূজা করে, আপনি তাদের কাছে এসে মিথ্যা মোহ কাটিয়ে দেন।’’ ‘‘হে অচ্যুত, যেসব গৃহে আপনার কীর্তি—যা শিব ও ব্রহ্মার সভায় গীত হয়—শোনা হয় না, সেখানে পুরুষরা গাধা, গরু, ঘোড়া, বিড়াল কিংবা দাসের মতো; তাদের জীবন বৃথা।’’ ‘‘যে মূর্খ নারী আপনার চরণরেণুর সুবাস পায়নি, সে তার প্রিয়তমকে ভালোবাসে—যার দেহ চামড়া, লোম, নখে ঢাকা, মাংস, হাড়, রক্ত, কৃমি, মল, কফ, পিত্ত ও বায়ুতে পূর্ণ—একটি জীবন্ত মৃতদেহ।’’ ‘‘হে পদ্মনয়ন, আমি আপনার চরণে ভক্তি চাই, কারণ আপনি স্বয়ংসম্পূর্ণ, কাউকে নিজ থেকে পৃথক মনে করেন না। যখন বার্ধক্যের কারণে রজোগুণ বৃদ্ধি পায় এবং আপনি আমার প্রতি দৃষ্টিপাত করেন, সেটিই আমাদের প্রতি আপনার পরম অনুগ্রহ।’’ ‘‘হে মধুসূদন, আমি আপনার কথা মিথ্যা মনে করি না। কুমারীর প্রেম সাধারণত মায়ের জন্য, অন্যের জন্য কদাচিৎ হয়।’’ ‘‘এমনকি চরিত্রহীন বিবাহিতা নারীও বারবার নতুনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। জ্ঞানী পুরুষের উচিত নয় এমন অবিশ্বস্ত নারীকে রাখা; রাখলে দু’দিকই হারায়।’’ ভগবান বললেন, ‘‘হে পতিব্রতা রাজকন্যে, তোমার ইচ্ছা জানার জন্য আমি তোমাকে কথার মাধ্যমে পরীক্ষা করেছি। তুমি যা জানতে চেয়েছিলে, আমি যা বলেছি, সবই সত্য।’’ ‘‘হে সুন্দরী, তোমার যেসব ইচ্ছা, যদি তুমি কেবল আমার প্রতি একান্ত নিবেদিত হও, তবে সেগুলো সবসময় পূর্ণ হবে, কারণ তুমি আমার একমাত্র ভক্তা।’’ ‘‘হে নিষ্পাপা, তোমার স্বামীর প্রতি প্রেম ও সতীত্ব প্রমাণিত হয়েছে। আমার কথায় তুমি বিচলিত হলেও তোমার মন আমার থেকে বিচ্যুত হয়নি।’’ ‘‘যারা গার্হস্থ্য জীবনে ব্রত ও তপস্যা করে আমাকে পূজা করে, কিন্তু কামনায় আসক্ত, তারা আমার মায়ায় মোহিত হয়ে আমাকে মুক্তিদাতা ভাবলেও ভোগের আশায় থাকে।’’ ‘‘যারা গর্বিত, আমাকে ও মুক্তির ঐশ্বর্য লাভের পরও ভোগ ও স্বামী কামনা করে, তারা দুর্ভাগা। এমন মানুষের কাছে নরকও সুখকর, কারণ তারা আপনজনেই আসক্ত।’’ ‘‘হে গৃহলক্ষ্মী, সৌভাগ্যবশতঃ তুমি বারবার আমার অনুকূলে কাজ করেছ, যা বিরল এবং জন্মবন্ধন কাটায়—এমনকি নারীজাতির পক্ষে, যাদের অভিলাষ দুর্লভ ও প্রতারণায় প্রবণ।’’ ‘‘হে গর্বিতা, আমি আর কোনো গৃহে তোমার মতো পতিব্রতা স্ত্রী দেখি না; নিজের বিবাহের সময়ও আগত রাজাদের তোয়াক্কা না করে, গোপনে আমার গুণ শুনে ব্রাহ্মণ পাঠিয়েছিলে।’’ ‘‘যখন তোমার ভাই যুদ্ধে বিকৃত ও জুয়াড়ি সভায় নিহত হয়েছিল, তখনও আমার বিচ্ছেদের ভয়ে তুমি সেই অসহ্য দুঃখ সহ্য করেছিলে, কিছু বলোনি—এইভাবে তুমি আমায় জয় করেছ।’’ ‘‘যখন তুমি দূত পাঠিয়ে গোপনে আমায় চেয়েছিলে, আর ভাবলে আমি যদি এই অযোগ্য দেহ ত্যাগ করি, তবুও তুমি আমার প্রতি অবিচল ছিলে; তার প্রতিদান আমি দিচ্ছি।’’ শ্রীশুক বললেন, ‘‘এইভাবে জগতের প্রভু স্নেহপূর্ণ আলাপে রুক্মিণীর সঙ্গে সময় কাটালেন, তাঁকে নিজ কথায় আনন্দ দিলেন এবং মানবীয় আচরণে কৌতুক করলেন।’’ ‘‘এইভাবেই সর্বব্যাপী ভগবান হরি, জগতগুরু রূপে, প্রতিটি পত্নীর গৃহে গৃহস্থধর্ম পালন করতেন, যেন তিনি একজন সাধারণ গৃহস্থ।’’ এরপর, প্রত্যেক রানি শ্রীকৃষ্ণের দশটি করে পুত্র প্রসব করলেন, প্রত্যেকে শক্তিতে সমান এবং নবম পুত্রও ছিল, যারা সকলেই পিতার গুণে গুণান্বিত ছিল। অচ্যুত, যিনি কখনও গৃহত্যাগ করেন না, তাঁকে গৃহে দেখে রাজকন্যারা তাঁকে একান্ত আপন মনে করতেন, যদিও তাঁর প্রকৃত স্বরূপ তাঁদের জানা ছিল না।