যোগে প্রতিষ্ঠিত গোকর্ণ একদিন তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে পড়লেন, তাঁর মনে ছিল না কোনো সুখ বা দুঃখ, শত্রু বা বন্ধু—সবকিছু থেকে তিনি ছিলেন বিরত। অপরদিকে তাঁর ভাই ধুন্ধুকারী গৃহে রয়ে গেলেন; তিনি পাঁচজন দুষ্চরিত্রা নারীর পরিবেষ্টিত হয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠুর কর্মে লিপ্ত ছিলেন এবং তাদের ভরণপোষণের চিন্তায় বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। একদিন সেই নারীরা অলঙ্কারের লোভে ধুন্ধুকারীকে প্ররোচিত করল। কামে অন্ধ হয়ে এবং মৃত্যুর কথা ভুলে গিয়ে ধুন্ধুকারী গৃহত্যাগ করলেন সম্পদ সংগ্রহের জন্য। নানা জায়গা থেকে অর্থ এনে তিনি সেই নারীদের দিলেন সুন্দর বস্ত্র, অলঙ্কার এবং নানাবিধ উপহার। ধুন্ধুকারীর কাছে বিপুল সম্পদের সঞ্চয় দেখে নারীরা রাতে পরস্পর বলাবলি করতে লাগল, ‘‘সে তো প্রতিদিন চুরি করে, ফলে রাজা নিশ্চয়ই তাকে ধরবেন।’’ তারা ভাবল, ‘‘রাজা সম্পদ নিয়ে তাকে হত্যা করবেনই; সুতরাং নিজেদের স্বার্থে আমরা কেন গোপনে তাকে হত্যা করব না?’’ এইরূপ সিদ্ধান্তে পৌঁছে তারা ধুন্ধুকারীকে ঘুমন্ত অবস্থায় দড়ি দিয়ে বেঁধে হত্যা করল, সম্পদ নিয়ে কোথাও চলে গেল। তারা তাঁর গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যার চেষ্টা করলেও ধুন্ধুকারী তখনও মরছিলেন না, এতে তারা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। অবশেষে তাঁর মুখে জ্বলন্ত অঙ্গার ঢেলে দিল; অগ্নিদাহের প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ধুন্ধুকারী প্রাণত্যাগ করলেন। সেই নারীরা তাঁর দেহ গর্তে ফেলে রেখে পালিয়ে গেল; এই ঘটনা কারও জানা ছিল না। লোকেরা জিজ্ঞেস করলে তারা বলত, ‘‘সে তো আমাদের প্রিয়, ধনলোভে দূরে চলে গেছে, এ বছর ফিরবে।’’ এইভাবে তারা গোপন রাখল সত্যি ঘটনা। এখানে বলা হয়েছে, জ্ঞানী ব্যক্তিকে কখনো দুষ্ট নারীর ওপর ভরসা করা উচিত নয়; যে নির্বোধ তাদের ওপর নির্ভর করে, সে দুঃখে ডুবে যায়। কামনাপরায়ণা নারীর কথা মধুর, কিন্তু অন্তর তীক্ষ্ণ—পুরুষদের মধ্যে কে তাদের সত্যিই প্রিয়? তাদের দ্বারা ধন লুট হয়ে গেলে, সেই অসংখ্য স্বামীযুক্ত নারীরা চলে যায়; ধুন্ধুকারী তখন মহাভূতের রূপ ধারণ করেন, কুকর্মের ফলে চরম যন্ত্রণায় কাতর হন। তিনি ঘূর্ণিঝড়ের মতো দশ দিক দিয়ে ছুটে বেড়াতে লাগলেন, শীত-গ্রীষ্মে কষ্ট পেলেন, খাদ্য ও জলবিহীন, সর্বত্র আশ্রয়হীন হয়ে কাঁদতে লাগলেন, ‘‘হায়, নিয়তি!’’ কিছুদিন পরে গোকর্ণ ধুন্ধুকারীর মৃত্যুসংবাদ জানতে পারলেন। ভাইয়ের এই অসহায় দশা বুঝে গোকর্ণ গয়ায় তার শ্রাদ্ধ করলেন এবং যেখানেই তীর্থে গেলেন, সেখানেই শ্রাদ্ধাদি সম্পন্ন করলেন। এভাবে ঘুরে শেষে গোকর্ণ নিজ নগরে ফিরে এলেন। রাতে, গৃহের আঙিনায় অজানা অবস্থায় তিনি শুয়ে পড়লেন। সেই সময়, গভীর রাতে, গোকর্ণকে ঘুমন্ত দেখে ধুন্ধুকারী এক ভয়ংকর রূপে আত্মপ্রকাশ করলেন। তিনি কখনও ভেড়া, কখনও হাতি, কখনও মহিষ, কখনও ইন্দ্র, কখনও অগ্নি, আবার কখনও মানুষের রূপ ধারণ করলেন—প্রত্যেকটি রূপ একবার করে দেখালেন। এই অদ্ভুত পরিবর্তন দেখে গোকর্ণ ধীর ও স্থির থেকে বুঝলেন, নিশ্চয়ই এটি কোনো দুঃস্থ আত্মা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘তুমি কে, এত ভয়ানক রূপে রাত্রিতে এসেছ? কোথা থেকে এ অবস্থায় পড়লে? তুমি কি ভুত, পিশাচ না রাক্ষস? বলো।’’ এই প্রশ্নে সেই আত্মা উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগল, কথা বলতে পারল না, কেবল চেতনার ইঙ্গিত করল। তখন গোকর্ণ হাতে জল নিয়ে তাকে উঠালেন; এই কৃত্যে সে পাপী মুক্ত হয়ে কথা বলতে পারল। সে বলল, ‘‘আমি তোমার ভাই ধুন্ধুকারী; নিজের দোষে আমি মানবজন্ম বিনষ্ট করেছি। আমার কুকর্মের কোনো হিসাব নেই, মহামোহে বিভ্রান্ত হয়ে আমি জগৎকে কষ্ট দিয়েছি, নারীদের হাতে নির্যাতনে প্রাণ দিয়েছি।’’ ‘‘তাই আমি ভূত হয়ে এই দুরবস্থায় আছি; বায়ু ছাড়া আমার অন্য কোনো ভরণ নেই, ভাগ্যের অনুকূলেই ফল পাই। হে বন্ধু, করুণার সাগর, ভাই, দয়া করে আমাকে দ্রুত মুক্ত করো!’’ এই কথা শুনে গোকর্ণ বললেন, ‘‘তোমার জন্য আমি গয়ায় যথাযথ শ্রাদ্ধ করেছি, তবুও তুমি মুক্তি পাওনি কেন, এটি সত্যিই আশ্চর্য! যদি গয়া শ্রাদ্ধেও মুক্তি না হয়, তবে আর কোনো উপায় নেই; কী করব তোমার জন্য, বলো বিশদে।’’ ধুন্ধুকারী বললেন, ‘‘শত গয়া শ্রাদ্ধ করলেও আমার মুক্তি হবে না; মুক্তির অন্য কোনো উপায় ভেবে দেখো।’’ এই কথা শুনে গোকর্ণ বিস্মিত হলেন—গয়া শ্রাদ্ধেও যদি মুক্তি না হয়, তবে মুক্তি সত্যিই দুরূহ। তিনি বললেন, ‘‘তুমি নির্ভয়ে নিজের স্থানে থাকো, আমি চিন্তা করে তোমার মুক্তির ব্যবস্থা করব।’’ এইভাবে গোকর্ণের কথায় ধুন্ধুকারী চলে গেলেন। গোকর্ণ সেই রাত নির্ঘুম কাটালেন, মুক্তির উপায় ভাবতে থাকলেন। সকালে তিনি আসলে, লোকেরা আনন্দে জড়ো হল, তিনি রাত্রির সব ঘটনা খুলে বললেন। পণ্ডিত, যোগী, জ্ঞানী ও বেদজ্ঞরা বহু শাস্ত্র বিচার করেও মুক্তির কোনো উপায় খুঁজে পেলেন না। তখন সকলের সম্মতিতে সূর্যদেবের বাণী মুক্তির সর্বোচ্চ পথ হিসেবে স্থির হল। সেই সময় গোকর্ণ সূর্যের গতি রোধ করে প্রণাম জানিয়ে বললেন, ‘‘হে জগতের সাক্ষী, মুক্তির কারণ বলুন।’’ দূর থেকে সূর্য স্পষ্টভাবে বললেন, ‘‘সপ্তাহকাল ধরে শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ করো—এতেই মুক্তি হবে।’’ সূর্যের এই বাক্য সবাই প্রকৃত ধর্মরূপে গ্রহণ করল। সকলে বলল, ‘‘এটি সহজ এবং অবশ্যই করা উচিত।’’ গোকর্ণ দৃঢ় সংকল্পে ভাগবত পাঠ আরম্ভ করলেন।