আত্মদেব ব্রাহ্মণ যখন সেই যোগীর কাছ থেকে আশীর্বাদপ্রাপ্ত ফলটি পেলেন, তখন তাঁর স্ত্রী ধুন্ধুলী সেই ফলটি খেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেন। তখন যোগী বললেন, ‘‘এই ফলটি তুমি তোমার স্ত্রীকে নিয়ে খাও, তাহলে তোমাদের একটি পুত্রসন্তান হবে।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘স্ত্রী যদি এক বছর ধরে সত্যবাদিতা, শুচিতা, দয়া, দান এবং দিনে একবার আহার—এই ব্রতগুলি পালন করে, তবে তার গর্ভে যে সন্তান জন্মাবে, সে হবে অতিশয় পবিত্র।’’ এভাবে বলে যোগী চলে গেলেন। আত্মদেবও বাড়ি ফিরে এসে সেই ফলটি স্ত্রীর হাতে দিলেন এবং নিজেও কোথাও চলে গেলেন। কিন্তু ধুন্ধুলী, যিনি কুটিলমতি ছিলেন, তাঁর সখীদের সামনে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘‘আমি চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছি, আমি এই ফল খাব না।’’ তিনি বললেন, ‘‘ফল খেলে গর্ভসঞ্চার হবে, পেট ফেঁপে উঠবে, কম খেলে শক্তি থাকবে না—তখন গৃহস্থালির কাজ কীভাবে সামলাব? ভাগ্যে যদি গ্রামের রাজকর্মচারী আসে, গর্ভবতী স্ত্রী পালাবে কীভাবে? যদি গর্ভস্থ সন্তান তোতা পাখির মতো থেকে যায়, তখন আমি গর্ভ থেকে তাকে বের করব কীভাবে?’’ তিনি আরও ভাবলেন, ‘‘যদি সন্তান পাশের দিকে এসে পড়ে, তাহলে তো আমার মৃত্যু হবে; প্রসবের যন্ত্রণা ভয়াবহ—এত কোমল শরীরে আমি তা সহ্য করব কীভাবে?’’ তিনি ভাবলেন, ‘‘আমি যদি দেরি করি, তবে সহধর্মিণী সব কিছু দখল করে নেবে; সত্য, শুচিতা ইত্যাদি ব্রত পালন করা খুবই কঠিন। সন্তান পালন ও প্রতিপালনে কষ্ট, প্রসববেদনার কষ্ট—আমার মনে হয়, নিঃসন্তান বা বিধবা নারী-ই সুখী।’’ এভাবে ভুল যুক্তি দিয়ে তিনি ফলটি খেলেন না। স্বামী জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ‘‘আমি খেয়েছি, আমি খেয়েছি।’’ একদিন তাঁর ছোট বোন নিজে থেকেই বাড়িতে এলেন। তাঁর সামনে ধুন্ধুলী সব খুলে বললেন, ‘‘আমি খুবই দুশ্চিন্তায় আছি, দিদি, কী করব?’’ তখন ছোট বোন বলল, ‘‘আমি গর্ভবতী, সন্তান হলে তোমাকে দিয়ে দেব।’’ ‘‘ততদিন তুমি গৃহে গর্ভবতী সেজে সুখে থাকো; আমার স্বামীকে কিছু ধন দিও, সে তোমার কাছে ছেলেটিকে দিয়ে দেবে।’’ ‘‘লোকেরা বলবে, ছয় মাসে সন্তান মারা গেছে; আমি প্রতিদিন তোমার বাড়িতে এসে ছেলেটিকে লালন করব।’’ ‘‘এখন পরীক্ষা করে দেখ, ফলটি গরুকে দাও; এ সবই তো নারীর স্বভাব অনুযায়ী করা হচ্ছে।’’ সময়মতো সেই ছোট বোন একটি পুত্রসন্তান প্রসব করলেন। পিতা শিশুটিকে নিয়ে গোপনে ধুন্ধুলীর হাতে তুলে দিলেন। ধুন্ধুলী তাঁর স্বামীকে বললেন, ‘‘একটি সুস্থ পুত্র জন্মেছে; সবার আনন্দ হয়েছে, আত্মদেবের ঘরে পুত্র জন্মেছে।’’ আত্মদেব ব্রাহ্মণ দ্বিজদের দান দিলেন ও জন্মসংক্রান্ত সমস্ত শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান করলেন; ঘরের দ্বারে মঙ্গলগান ও বাদ্যবাজনা চলল। এরপর ধুন্ধুলী স্বামীর সামনে বললেন, ‘‘আমার স্তনে দুধ নেই; অন্য কেউ দুধ টেনে নিয়েছে, আমি কীভাবে শিশুকে দুধ খাওয়াব?’’ ‘‘আমার সহধর্মিণীর সন্তান মারা গেছে; তাকে বাড়িতে নিয়ে এসো, সে তোমার সন্তানকে দুধ খাওয়াবে।’’ শিশুর রক্ষার জন্য স্বামী এ সব ব্যবস্থা করলেন। মা শিশুটির নাম রাখলেন ধুন্ধুকারী। তিন মাস পর, সেই গরুটি একটি বাছুর প্রসব করল—সেই বাছুর ছিল অপূর্ব, দেবতুল্য, কলঙ্কহীন, সোনার মতো দীপ্তিমান। ব্রাহ্মণ নিজে আনন্দিত হয়ে সমস্ত অনুষ্ঠান করলেন। সবাই আশ্চর্য হয়ে দেখতে এল। বলাবাহুল্য, আত্মদেবের ভাগ্য জেগে উঠল; গরু থেকে এক দেবতুল্য সন্তান জন্মেছে। ভাগ্যের খেলা এমন ছিল যে, কেউই এই গোপন কথা জানল না। শিশুটির গরুর মতো কান দেখে সবাই তার নাম রাখল গোকর্ণ। সময়ে সময়ে দুই ভাই-ই বড় হয়ে উঠল। গোকর্ণ বিদ্বান ও জ্ঞানী হয়ে উঠল, আর ধুন্ধুকারী অত্যন্ত দুষ্ট হয়ে উঠল। সে স্নান ও শুচিতা মানত না, নিষিদ্ধ আহার করত, ক্রোধহীন ছিল, অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন করত, মৃতদেহ ছোঁয়া হাতে খেত। সে চোর ছিল, সকলের অপছন্দের ব্যক্তি, অন্যের ঘরে আগুন লাগাত, খেলার ছলে শিশুদের কুয়োতে ফেলে দিত। সে হিংস্র, অস্ত্রধারী, দরিদ্র ও অন্ধদের অত্যাচার করত, সর্বদা অসৎ সঙ্গ করত, হাতে দড়ির ফাঁস রাখত, কুকুরের সঙ্গী ছিল। বেশ্যাদের সান্নিধ্যে সে পৈতৃক সম্পদ অপচয় করল; একদিন সে নিজের পিতামাতাকে মারধর করে তাঁদের বাসনপত্রও নিয়ে নিল। হতভাগ্য পিতা, সর্বস্বান্ত হয়ে, উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগলেন, ‘‘এমন দুষ্ট সন্তান, যে কষ্ট দেয়, তাকে মেরে ফেলা উচিত।’’ ‘‘আমি কোথায় থাকব, কোথায় যাব, কে আমার দুঃখ দূর করবে? এই দুঃখে আমি প্রাণ ছাড়ব—হায়, আমার দশা কত করুণ!’’ তখন গোকর্ণ, জ্ঞানী ও সদ্বুদ্ধিসম্পন্ন, এসে পিতাকে উপদেশ দিলেন এবং তাঁকে বৈরাগ্যের পথ দেখালেন। তিনি বললেন, ‘‘এই সংসার মায়ার, দুঃখময় ও অস্থায়ী; কার ছেলে, কার সম্পদ, কার স্নেহ—সবই ক্ষণস্থায়ী।’’ ‘‘ইন্দ্রেরও সুখ নেই, বিশ্বজয়ী রাজাও সুখী নন; সুখ কেবল নিরাসক্ত, নির্জনবাসী মুনির। সন্তানস্নেহের মোহরূপ অজ্ঞান ত্যাগ করো; মোহে পড়লে নরকে যেতে হয়। এই দেহ সব ছেড়ে পড়ে যাবে—বনে যাও।’’ এই কথা শুনে আত্মদেব বললেন, ‘‘বৎস, আমাকে বিস্তারিত বলো, বনে গিয়ে কী করতে হবে?’’ তিনি কাতর কণ্ঠে বললেন, ‘‘স্নেহের বন্ধনে আমি অন্ধকার গর্তে পড়েছি, আমি পঙ্গু, কপট ও কর্মে অধম—হে দয়াসাগর, আমায় উদ্ধার করো।’’ গোকর্ণ বললেন, ‘‘হাড়, মাংস ও রক্তে গঠিত এই দেহের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করো; স্ত্রী, সন্তান প্রভৃতি আপন ভাবনা ছেড়ে দাও; এই সংসার চিরকাল অস্থায়ী ও নশ্বর—বৈরাগ্য ও ভক্তিতেই আনন্দ খুঁজে নাও।’’ ‘‘সর্বদা সত্য ধর্ম চর্চা করো, সংসারধর্ম ত্যাগ করো, সাধুজনের সেবা করো, কামনা ও তৃষ্ণা ছেড়ে দাও; অন্যের দোষ-গুণ বিচার ত্যাগ করো, সেবা ও শাস্ত্রকথার অমৃত পান করো।’’ এভাবেই আত্মদেবের জীবনে নানা ঘটনা প্রবাহিত হতে লাগল—ভাগ্যের খেলা, মানবমনের দুর্বলতা, এবং জ্ঞানের আলোয় আত্মার মুক্তির পথে তাঁর যাত্রা শুরু হল।