মথুরা নগরী সেদিন সাজানো হয়েছিল অপূর্বভাবে। গৃহদ্বার ও প্রাসাদসমূহে ছিল দই ও চন্দনলিপ্ত পূর্ণ কলস, ফুলের সারি, দীপশিখা, কচি পাতার মালা, কলাগাছের গুচ্ছ, আর নানা রঙের পতাকা ও তোরণে শোভিত। রাজপথ ধরে বসুদেবের দুই পুত্র, কৃষ্ণ ও বলরাম, তাঁদের সখা-সঙ্গীদের নিয়ে প্রবেশ করলেন। তাঁদের দর্শনের জন্য নগরবাসিনীরা ব্যাকুল হয়ে উঠলেন—উচ্ছ্বাসে কেউ দ্রুত নিজ নিজ গৃহের ছাদে উঠে গেলেন, কেউ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলেন। এমন আকুলতায় কেউ কেউ ঠিকমতো পোশাক-গয়না পরতে ভুলে গেলেন, কারও এক কানে কুন্ডল, কারও এক পায়ে নূপুর, আবার কেউ শুধু এক চোখে কাজল দিলেন। কেউ আবার ভোজন অসমাপ্ত রেখেই, উৎসব ফেলে, স্নান না করেই ছুটে এলেন; কেউ বা ঘুম ভেঙে সদ্য-জাগ্রত অবস্থায়, শিশুদের দুধ না খাইয়েই, বেরিয়ে পড়লেন—এমনকি মাতারাও। কৃষ্ণের পদ্ম-নয়ন, সাহসী চঞ্চল দৃষ্টি, কোমল হাসি—এসব দেখে নগরনারীরা মোহিত হলেন। যেন মাতাল গজরাজের মতো কৃষ্ণ তাঁদের মন হরণ করলেন, চক্ষুতে আনন্দ আর হৃদয়ে উল্লাস সঞ্চার করলেন। বারবার তাঁকে দেখে, যাঁর কথা তাঁরা পূর্বে শুনেছিলেন, সেই কৃষ্ণের প্রতি তাঁদের আকর্ষণ আরও গভীর হল। কৃষ্ণের হাস্যভরা চাহনি তাঁদের মনে গৌরব জাগাল, চক্ষু দিয়ে তাঁরা আনন্দমূর্তিকে আলিঙ্গন করলেন, চর্মে কাঁটার মতো আনন্দের অনুভূতি হল, সকল দুঃখ ভুলে গেলেন। আনন্দে উজ্জ্বল মুখে নারীরা গৃহের ছাদে উঠে কৃষ্ণ ও বলরামের উপর শুভেচ্ছার ফুল বর্ষণ করলেন। ব্রাহ্মণগণ বিভিন্ন স্থানে দই, অক্ষত, জলপাত্র, মালা, সুগন্ধ দ্রব্য ও অন্যান্য উপহার দিয়ে তাঁদের পূজা করলেন। নগরবাসীরা বিস্ময়ে বললেন, ‘‘গোপিনীরা কী মহাতপস্যা করেছিলেন, যে তাঁরা এই দুই মানবলোকে মহোৎসবসম কৃষ্ণ ও বলরামকে প্রত্যক্ষ করতে পেরেছেন!’’ রাজপথে যেতে যেতে কৃষ্ণ, গদার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, এক ধোপাকে দেখলেন, যিনি রাজার জন্য রঙিন, নতুন কাপড় নিয়ে যাচ্ছিলেন। কৃষ্ণ বললেন, ‘‘ভদ্রলোক, আমাদের উপযুক্ত সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন বস্ত্র দিন। আপনি যদি দেন, অবশ্যই সর্বোচ্চ মঙ্গল লাভ করবেন।’’ কিন্তু ধোপা, রাজসেবক বলে অহংকারে উত্তেজিত হয়ে, অবজ্ঞাসূচক ও ক্রুদ্ধ স্বরে বলল, ‘‘এমন বস্ত্র তো পাহাড়-জঙ্গলে যারা থাকে, তাদের জন্য নয়; তোমরা এত সাহস করে রাজবস্ত্র চাও কেন? তাড়াতাড়ি চলে যাও, না হলে প্রাণে বাঁচবে না। রাজপরিবারের লোকেরা গর্বে দম্ভিত, তারা বেঁধে রাখে, মারে, লুট করে।’’ এই অবমাননায় দেবকী-পুত্র কৃষ্ণ ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর হাতের আঘাতে ধোপার মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করলেন। ধোপার সঙ্গীরা ভয়ে কাপড় ফেলে পালিয়ে গেল। অচ্যুত কৃষ্ণ সেই বস্ত্র নিয়ে নিলেন। কৃষ্ণ ও বলরাম নিজেদের পছন্দমতো বস্ত্র পরিধান করলেন, আর অবশিষ্ট কাপড় গোপসঙ্গীদের দিলেন, কিছু মাটিতে ফেলে রাখলেন। এরপর এক দর্জি এসে আনন্দে নানারঙা ও নকশার পোশাক তৈরি করে দিলেন। কৃষ্ণ ও বলরাম সেই বিচিত্র বস্ত্রে সজ্জিত হয়ে, যেন উৎসবে সুশোভিত এক শুভ্র ও এক শ্যামবর্ণ তরুণ গজশাবকের মতো দীপ্তিমান হয়ে উঠলেন। প্রীত হয়ে কৃষ্ণ তাঁকে স্বীয় সদৃশ রূপ, পার্থিব সৌভাগ্য, শক্তি, ঐশ্বর্য, স্মৃতি ও ইন্দ্রিয়জয় দান করলেন। এরপর তাঁরা গেলেন মালাকার সুদামার গৃহে। সুদামা তাঁদের দেখে ভূমিতে মস্তক নত করলেন, আসন, পদ্য, আরঘ্য ও নানা উপাচার দিয়ে কৃষ্ণ-বলরাম ও তাঁদের সঙ্গীদের পূজা করলেন—মালা, তাম্বুল, সুগন্ধ দ্রব্য দিয়ে। কৃতজ্ঞ চিত্তে বললেন, ‘‘প্রভু, আজ আমার জন্ম সার্থক, বংশ পবিত্র, পূর্বপুরুষ ও দেবতারা সন্তুষ্ট। আপনি দুইজনই বিশ্বসৃষ্টির পরম কারণ, কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্য অবতীর্ণ। আপনাদের দৃষ্টি সর্বদা সমদর্শী, ভক্ত ও পূজিত সকলের প্রতি সমান। আজ আমার কী কর্তব্য, বলুন—আপনাদের নির্দেশই আমার পরম প্রাপ্তি।’’ এভাবে ভাবতে ভাবতে সুদামা উৎফুল্ল মনে উৎকৃষ্ট সুগন্ধি ফুলের মালা নিবেদন করলেন। কৃষ্ণ-বলরাম সেই মালায় ভূষিত হয়ে, প্রীত হয়ে, আত্মসমর্পিত সুদামাকে বরদান করলেন। সুদামা চাইলেন—সর্বব্যাপী ঈশ্বরে অচল ভক্তি, ভক্তদের প্রতি মৈত্রি, ও সর্বপ্রাণীতে পরম দয়া। প্রভু তাঁকে সেই বর, বংশবৃদ্ধির ঐশ্বর্য, শক্তি, দীর্ঘায়ু, কীর্তি ও শ্রী প্রদান করে, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সঙ্গে বিদায় নিলেন। এভাবেই ‘নগরীতে প্রবেশ’ অধ্যায়ের সমাপ্তি হল। এরপর শুকদেব বললেন—এবার কৃষ্ণ কুব্জার প্রতি কৃপা, ধনুর্ভঙ্গ, ও কুস্তি-মঞ্চ প্রস্তুত করার কাহিনি। মাধব রাজপথ ধরে যেতে যেতে দেখলেন এক সুন্দরী যুবতী, হাতে সুগন্ধি চন্দন-সুরভিত মলমের পাত্র, তিনি কুব্জা নামে পরিচিত। কৃষ্ণ হাসিমুখে বললেন, ‘‘সুন্দরী, তুমি কে? এই মলম কী? কার দাসী তুমি? আমাদের অঙ্গে এই উৎকৃষ্ট মলম লাগিয়ে দাও; এতে তোমার সৌভাগ্য বৃদ্ধি পাবে।’’ সৈরন্ধ্রী বলল, ‘‘হে সুন্দর, আমি কংসের অনুমোদিত দাসী, নাম ত্রিবক্রা। আমি মলম তৈরি করি, যা ভোজরাজের প্রিয়। আপনাদের ছাড়া কে-ই বা এর উপযুক্ত?’’ কৃষ্ণ-বলরামের রূপ, সৌন্দর্য, হাস্য, ভাষা ও দৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে, কুব্জা তাঁদের অঙ্গে সুগন্ধি মলম মাখিয়ে দিলেন। সেই মলমে তাঁদের গাত্রবর্ণ আরও দীপ্তিমান হয়ে উঠল। কৃষ্ণ সন্তুষ্ট হয়ে স্থির করলেন কুব্জার কুঁজ সোজা করবেন, যেন তাঁর দর্শনের ফল প্রকাশ পায়। তিনি নিজের পা কুব্জার পায়ের উপর স্থাপন করে, হাতের আঙুলে তার থুতনি তুললেন ও দেহ সোজা করলেন। মুহূর্তেই মুকুন্দের স্পর্শে কুব্জার দেহ সোজা, সুন্দর, প্রশস্ত কটিদেশ ও পূর্ণবক্ষ হয়ে অপূর্ব রমণীতে রূপান্তরিত হল। নতুন রূপ, গুণ ও দানশীলতায় কুব্জা কৃষ্ণের উপরের বস্ত্র আকর্ষণ করে, হাস্যসহিত আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে বলল, ‘‘প্রিয়, এসো, আমার ঘরে চলো; তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারি না। তুমি আমার হৃদয়ে আলোড়ন তুলেছ—পুরুষশ্রেষ্ঠ, আমার প্রতি কৃপা করো।’’ এভাবেই কৃষ্ণ ও বলরাম মথুরা নগরীতে প্রবেশের সময় নানা অলৌকিক কীর্তি প্রকাশ করতে লাগলেন।