কেশীর দেহটি ছিল কাঁঠালের মতো গোলাকৃতি। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, তাঁর বলশালী বাহু সেই দেহ থেকে সহজেই প্রত্যাহার করলেন। শত্রু-বধের এই কৃতিত্বে তিনি বিন্দুমাত্র বিস্মিত বা গর্বিত হলেন না। তখন দেবতারা তাঁর ওপর পুষ্পবৃষ্টি করে তাঁকে সম্মানিত করলেন। হে রাজন, তখন ভক্তশ্রেষ্ঠ দেবর্ষি নারদ স্বয়ং উপস্থিত হয়ে, নিষ্কলঙ্ক কর্মধারী কৃষ্ণকে একান্ত গোপন বাণী শোনালেন। নারদ বললেন, ‘‘হে কৃষ্ণ, হে কৃষ্ণ! তুমি অসীম আত্মা, যোগেশ্বর, জগদীশ্বর, সকলের আশ্রয়, সাত্বতদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, প্রভু! তুমি সকল জীবের অন্তর্যামী, জ্ঞানীদের মধ্যে একমাত্র আলো, হৃদয়গুহায় গোপন, সাক্ষী, পুরুষোত্তম, ঈশ্বর।’’ ‘‘তুমি নিজেই নিজের আশ্রয়। আদিতে তোমার মায়া দ্বারা তিন গুণ সৃষ্টি করেছ, সেই গুণসমূহ দ্বারা তুমি এই জগত সৃষ্টি, পালন ও লয় করো। অতএব, তুমি পৃথিবীর ভার—অর্থাৎ অসুর, দুষ্ট ও রাক্ষসদের বিনাশ এবং সাধুদের রক্ষার জন্য অবতীর্ণ হয়েছ।’’ ‘‘ভাগ্যক্রমে, আজ তোমার লীলা-বশে ঘোড়ার রূপী এই অসুর নিহত হয়েছে, যার হ্রেষা দেবতাদের আতঙ্কিত করেছিল এবং যারা সেই ভয়ে স্বর্গ ত্যাগ করেছিল। কাল অথবা পরশু, হে প্রভু, আমি দেখব তুমি চাণূর, মুষ্টিক, অন্যান্য মল্ল, হাতি ও কংসকে বধ করবে।’’ ‘‘এরপর শঙ্খ, যবন, মুর, নরক—তাদের পরাজয়, পারিজাত বৃক্ষ গ্রহণ, ইন্দ্রের পরাজয়ও আমি প্রত্যক্ষ করব। তুমি বীর কন্যাদের সঙ্গে বিয়ে করবে, বীরত্ব ও গুণে জয়লাভ করে, এবং দ্বারকায় রাজা নৃগকে অভিশাপমুক্ত করবে।’’ ‘‘তুমি শ্যামন্তক মণি ও তার সঙ্গে পত্নী লাভ করবে, মৃত ব্রাহ্মণপুত্রকে নিজের ধামে এনে ফিরিয়ে দেবে। পৌণ্ড্রক বধ, কাশী নগর দহন, দন্তবক্র নিধন ও মহাযজ্ঞে শিশুপালের মৃত্যু—এসবও আমি দেখব। দ্বারকায় অবস্থানকালে তুমি আরও যে সকল বীর্যপূর্ণ কীর্তি করো, সেগুলোও আমি প্রত্যক্ষ করব, যেগুলো পৃথিবীর কবিরা গেয়ে থাকেন।’’ ‘‘এখন আমি দেখব, কালেরূপী সেই ভাগবানের দ্বারা এই সমস্ত সেনাবাহিনীর বিনাশ, যেখানে অর্জুন তাঁর রথী। আমরা ধ্যান করি সেই ভগবানকে, যিনি বিশুদ্ধ জ্ঞানে পরিপূর্ণ, স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত, সকল ইচ্ছা সিদ্ধ, যিনি মায়ার দ্বারা কখনো আচ্ছন্ন হন না, এবং গুণসমূহের প্রবাহের উৎস।’’ ‘‘আমি তোমাকে নমস্কার করি, হে সর্বাশ্রয় ভগবান, যিনি নিজের মায়াশক্তিতে সকল ভেদ সৃষ্টি করেছ, এবং লীলার জন্য মানবরূপ ধারণ করেছ, যদু, বৃশ্ণি ও সাত্বতদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।’’ শ্রীশুকদেব বললেন, নারদ এভাবে কৃষ্ণকে প্রণাম করে, কৃষ্ণের অনুমতি নিয়ে, ভক্তশ্রেষ্ঠ ঋষি আনন্দিত চিত্তে বিদায় নিলেন। আর ভগবান গোবিন্দ, কেশী অসুরকে বধ করার পর, আনন্দিত গোপগণদের সঙ্গে গাভী চরাতে চরাতে বৃন্দাবনকে সুখময় করে তুললেন। একদিন, গোপগণ পর্বতের ঢালে গাভী চরাতে চরাতে লুকোচুরি খেলায় মত্ত হল। কেউ চোর, কেউ গোপ, কেউ ভেড়ার ভূমিকায় খেলতে লাগল; সকলেই নির্ভীক ও নির্ভাবনায় মগ্ন। তখন মায়ার পুত্র, মায়াবিদ ভ্রমাসুর, গোপবেশ ধরে ভেড়ার নেতা হয়ে চোরদের দলে অনেককে নিয়ে গেল। সে মহাসুর তাদের একটি পর্বতের গুহায় নিয়ে গিয়ে আটকে রাখল এবং চার-পাঁচজন ছাড়া বাকিদের গুহার দ্বার পাথর দিয়ে বন্ধ করল। কৃষ্ণ বুঝতে পারলেন এই কীর্তি, তিনি সদাচারীদের আশ্রয়দাতা। তিনি চোরদের নিয়ে যাওয়া সময় ভ্রমাসুরকে সিংহ যেমন নেকড়েকে ধরে, ঠিক তেমনই ধরে ফেললেন। তখন ভ্রমাসুর নিজের প্রকৃত, বিশালাকার পর্বতের মতো দেহ ধারণ করে পালানোর চেষ্টা করল; কিন্তু কৃষ্ণের শক্তির কাছে সে মুক্ত হতে পারল না। অচ্যুত কৃষ্ণ তাঁর বাহু দিয়ে তাকে বশীভূত করে ভূমিতে ফেলে দিলেন এবং দেবতারা আকাশ থেকে দর্শন করলেন—তিনি গোহত্যাকারী অসুরকে বধ করলেন। এরপর তিনি কষ্টসহকারে গুহার দ্বার ভেঙে গোপগণকে মুক্ত করলেন এবং দেবতা ও গোপদের প্রশংসা সহকারে নিজ বৃন্দাবনে প্রবেশ করলেন। এভাবেই দশম স্কন্ধের প্রথমার্ধের ‘ভ্রমাসুর বধ’ অধ্যায় সমাপ্ত হল, যা পরমহংসদের জন্য নির্দিষ্ট শ্রীমদ্ভাগবতের সাতত্রিশতম অধ্যায়। শ্রীশুক বললেন, এরপর অক্রূর, জ্ঞানী মহাপুরুষ, মথুরায় সে রাত কাটিয়ে, প্রভাতে রথে চড়ে নন্দের গোলে রওনা দিলেন। পথ চলতে চলতে, তাঁর হৃদয়ে ভগবান পদ্মনয়নের প্রতি ভক্তির সঞ্চার হল এবং তিনি ভাবতে লাগলেন— ‘‘আমি এমন কী পুণ্য করেছি, কী তপস্যা করেছি, কিংবা কী দান দিয়েছি, যে আজ আমি কেশবকে দর্শন করতে যাচ্ছি? আমি মনে করি, ভগবানের এই দর্শন আমার জন্য অতি দুর্লভ, যেমন শূদ্রের জন্য ব্রহ্মপদ ধ্যান দুর্লভ, যিনি ইন্দ্রিয়সুখে আসক্ত।’’ ‘‘হয়তো আমার মতো অধমের জন্য অচ্যুতের দর্শন নিষিদ্ধ হবে না; কারণ, কখনো কখনো কালের প্রবাহে ভেসে যাওয়া কেউও পার হয়ে যায়।’’ ‘‘আজ আমার দুর্ভাগ্য বিনষ্ট হয়েছে এবং আমার জীবন সার্থক হয়েছে, কারণ আমি সেই ভগবানের পদ্মপদে প্রণত হব, যাঁকে যোগীরা ধ্যান করেন। আজ কংস আমায় চরম অনুগ্রহ করেছেন, কারণ আমি হরির পদ্মপদ দেখব, যিনি অবতাররূপে অবতীর্ণ, যাঁর নখের দীপ্তিতে অতীতের জ্ঞানীরাও অতিক্রম করতে পারেননি এমন অন্ধকার দূর হয়েছিল।’’ ‘‘ব্রহ্মা, শিব, অন্যান্য দেবতা, লক্ষ্মী, ঋষি এবং সাত্বতেরা যাঁর চরণ পূজা করেন, সেই চরণগুলি গোপসঙ্গী হয়ে বনে বিচরণ করেন, গোপীদের কুঙ্কুমে চিহ্নিত। নিশ্চয়ই আমি আজ মুকুন্দের মুখ দর্শন করব—তাঁর সুন্দর গণ্ড, নাসিকা, মৃদু হাসি, চঞ্চল রক্তিম পদ্মনয়না, কুন্তলবিন্যাসে আবৃত, যার চারপাশে হরিণেরা প্রদক্ষিণ করে।’’ ‘‘হয়তো আজ আমার চোখ সরাসরি বিষ্ণুর দর্শনে সার্থক হবে, যিনি স্বেচ্ছায় মানবরূপে অবতীর্ণ হয়ে পৃথিবীর ভার লাঘব করেছেন, যিনি সৌন্দর্যের আধার। যাঁকে আমি দেখতে যাচ্ছি, তিনি অহংকার ও দ্বন্দ্বমুক্ত, নিজের জ্যোতিতে অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করেন; তাঁর মায়ায় তিনি জীবের প্রাণ, ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধিতে গৃহে গৃহে উপলব্ধ হন।’’ ‘‘তাঁর বাক্য, কীর্তি ও জন্ম, যা শুভগুণে পরিপূর্ণ, সমস্ত অশুভ দূর করে, প্রাণিত ও পবিত্র করে, জগৎকে শুদ্ধ করে; যাঁরা এতে উদাসীন, তারা যেন শোভন মৃতদেহ মাত্র। তিনি সত্যিই সাত্বত বংশে অবতীর্ণ, দেবতাদের আনন্দদায়ক, স্বগৌরব রক্ষাকারী, যাঁর কীর্তি সর্বত্র ছড়ায়; তিনি বৃন্দাবনে অবস্থান করেন, দেবতারা যাঁর সর্বমঙ্গলময় কর্মগাথা গেয়ে থাকেন।’’ এভাবেই কেশবের দর্শনলাভের আশায় অক্রূর এগিয়ে চললেন, অন্তরে ভক্তির উচ্ছ্বাসে পূর্ণ।