কংসার কথা শুনে যখন কংসা, ভগবান কংসার কথা। একবার ভগানকে-আ identity, অর্থাৎ কংসার পরিচয়। এখনো কংসার কথা—করে স্পষ্টভাবে স্পষ্টভাবে, এক পর্যায়ে, স্বয়ান্বিতভাবে কংসা-কে। কিভাবে কংস-এ আপনি, কংসা-সহজে, যে সকলের চেয়ে ধীরগতি সম্পন্ন, সেইভাবে, প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করল—সে কাহিনি এইরূপ: কংস যখন জানতে পারল দেবকীর গর্ভজাত দুই পুত্রই তার মৃত্যুর কারণ হবে, তখন সে প্রচণ্ড ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ধারালো খড়গ তুলে বসে Vasudeva-কে হত্যা করতে উদ্যত হয়। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে মহর্ষি নারদ এসে কংসকে নিবৃত্ত করেন এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেন—এই দুই পুত্রই তার মৃত্যুর কারণ, অন্য কেউ নয়। নারদের কথা শুনে কংস আতঙ্কিত হয়ে Vasudeva এবং তার পত্নী দেবকীকে লোহার শিকলে বেঁধে ফেলে। নারদ চলে গেলে, কংস তার বিশ্বস্ত রাক্ষস কেশীকে ডেকে পাঠায়। কংস কেশীকে আদেশ দেয়, “তুমি যাও, রাম ও কেশবকে হত্যা করো। এরপর মুষ্টিক, চাণূর, শল, তোশল ও অন্যান্য কুস্তিগীরদের পাঠিয়ে দাও।” এরপর কংস তার মন্ত্রিসভা ও হাতির পালকদের ডেকে বলে, “শোনো, এরা হল চাণূর ও মুষ্টিক—অপরাজেয় কুস্তিগীর। নন্দের বৃন্দাবনে Vasudeva-র দুই পুত্র রাম ও কৃষ্ণ বাস করছে। ভাগ্যবাণী রয়েছে, তাদের হাতেই আমার মৃত্যু হবে।” তাদের উদ্দেশ্যে কংস বলে, “তোমরা এই দুই ভাইকে কুস্তি প্রতিযোগিতায় হত্যা করবে। চারিদিকে কুস্তির মঞ্চ তৈরি করো, যাতে নগরবাসী ও গ্রামবাসী সকলেই এই যুদ্ধ দেখতে পারে।” এরপর প্রধান মন্ত্রীকে আদেশ দেয়, “প্রবেশদ্বারে কুয়লয়াপীড় হাতিটিকে আনো। সে যেন আমার শত্রুদের হত্যা করে।” কংস আরও বলে, “চতুর্দশী তিথিতে বিধি অনুযায়ী ধনুর্যজ্ঞ শুরু হোক, বিশুদ্ধ পশু বলি দিয়ে ভগবানের পূজা করো।” এরপর কংস, কার্যকুশলে পারদর্শী অগ্রজদের নির্দেশ দিয়ে, যাদুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ অক্রূরকে ডেকে তার হাত ধরে বলে, “হে মহাশয়, দয়া করে আমার প্রতি সদ্ভাব রাখো। ভোজ ও ঋষ্ণিদের মধ্যে তোমার মতো শুভাকাঙ্ক্ষী কেউ নেই। তাই আমি তোমার শরণাপন্ন হয়েছি, ঠিক যেমন ইন্দ্র বিষ্ণুর আশ্রয়ে নিজ উদ্দেশ্য সাধন করেছিল।” কংস অক্রূরকে বলে, “তুমি নন্দের বৃন্দাবনে যাও। Vasudeva-র দুই পুত্র সেখানে আছে, তাদের এই রথে নিয়ে এসো। শোনা যায়, বৈকুণ্ঠবাসী দেবতারা আমার মৃত্যুর ব্যবস্থা করেছে; তাই নন্দসহ গোপগণ ও তাদের উপহারের সঙ্গে দুই ভাইকে নিয়ে এসো। এখানে এলে, কুয়লয়াপীড় হাতির দ্বারা তাদের হত্যা করাবো; যদি বেঁচে যায়, তাহলে বজ্রের মতো ভীষণ কুস্তিগীরদের দিয়ে মারাবো। এরপর Vasudeva ও তার দুর্ভোগগ্রস্ত আত্মীয়-স্বজন, ঋষ্ণি, ভোজ, দাশারহা—সবাইকে হত্যা করব। বৃদ্ধ পিতা উগ্রসেন, সিংহাসন-লোভী তার ভাই দেবক ও যারা আমার বিরোধী, তাদেরও শেষ করব।” “তখন এই পৃথিবী হবে কাঁটারহীন। আমার গুরুভার হল জরাসন্ধ, প্রিয় বন্ধু দ্বিবিদ, শম্ভর, নারক, বাণ—তারা আমার অনুগত। তাদের নিয়ে দেবতাদের মিত্র রাজাদের ধ্বংস করব, আর পৃথিবীর সুখভোগ করব। তাই, রাম ও কৃষ্ণকে দ্রুত নিয়ে এসো, তারা যেন ধনুর্যজ্ঞ ও যাদুপুরীর ঐশ্বর্য দেখে।” অক্রূর শ্রদ্ধাভরে কংসকে বলেন, “রাজন, আপনার আদেশ যথার্থ; শত্রুনাশ আপনার কর্তব্য। তবে জয়-পরাজয় ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল—কারণ ভাগ্যই ফলের মূল। মানুষ চেষ্টায় ব্যস্ত থাকলেও, ভাগ্যের বাধায় তারা সুখ-দুঃখ ভোগ করে। তবুও, আমি আপনার আদেশ পালন করব।” শ্রীশুকদেব বলেন, কংস এভাবে অক্রূরকে নির্দেশ দিয়ে মন্ত্রীদের বিদায় দেয় ও নিজ প্রাসাদে প্রবেশ করে। অক্রূরও নিজের গৃহে ফিরে যায়। এদিকে কংসের আদেশে কেশী নামে এক দুর্ধর্ষ, মনের মতো দ্রুতগামী অশ্ব রাক্ষস, ক্ষিপ্রগতিতে পৃথিবী কাঁপিয়ে, তার কেশরের ঝাঁকুনিতে আকাশ কাঁপিয়ে, ভীষণ হ্রেষায় সবাইকে আতঙ্কিত করে বৃন্দাবনের দিকে আসে। তার চোখ ছিল বড়, মুখ ভয়ঙ্কর, গলা বিশাল, আর রং ছিল মেঘের মতো কালো—সব মিলিয়ে সে ছিল মহাদৈত্য। সে কংসকে সাহায্য করতে চেয়েছিল। কেশী যখন বৃন্দাবনে প্রবেশ করে, তার হ্রেষায় গোটা গোকুল কেঁপে ওঠে, মেঘের মতো তার লেজের ঝাপটায় চারিদিক অন্ধকার। তখন গোপগণের অধিপতি কৃষ্ণ, সিংহের মতো গর্জন করে কেশীকে আহ্বান করেন। কেশী তখন যজ্ঞে রত কৃষ্ণের সামনে এসে, আকাশ গিলে ফেলতে উদ্যত হয়ে, প্রচণ্ড ক্রোধে তার পদাঘাতে পদ্মনয়ন কৃষ্ণকে আঘাত করে। কিন্তু অপ্রাকৃত ভগবান, ক্রোধে ছলনা করে, দুই হাতে কেশীর পা ধরে, তাকে প্যাঁচিয়ে, অবজ্ঞাভরে শত ধনুর্য দূরে ছুঁড়ে ফেলেন, যেমন গরুড় সাপকে ছুঁড়ে ফেলে। কেশী সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে আরও রেগে গিয়ে, উন্মুক্ত মুখে কৃষ্ণের দিকে ঝাঁপিয়ে আসে। কৃষ্ণ শান্ত হাসি হেসে নিজের বাহু তার মুখে প্রবেশ করান, যেন সাপ গর্তে ঢোকে। ভগবানের বাহু তার দাঁতে ছোঁয়ামাত্রই, গরম লোহার মতো দাঁত ভেঙে পড়ে। কৃষ্ণের বাহু তার শরীরে প্রবেশ করে লোহার শলাকার মতো ফুলে ওঠে। কেশীর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, হাত-পা ছটফট করতে থাকে, গা ঘামে ভিজে যায়, চোখ উল্টে যায়—শেষে সে মাটিতে পড়ে রক্তবমি করে প্রাণত্যাগ করে। কৃষ্ণ তার বাহু বের করে আনেন, কোনো বিস্ময় বা গর্ব প্রকাশ করেন না। দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করে ভগবানকে সম্মান জানান। এরপর দেবর্ষি নারদ এসে কৃষ্ণকে গোপনে বলেন, “হে কৃষ্ণ, হে অনন্ত আত্মা, যোগেশ্বর, জগৎপতি, হে বাসুদেব, হে সত্ত্বতদের শ্রেষ্ঠ, হে অধীশ্বর! আপনি সকল জীবের অন্তর্যামী, জ্ঞানীদের মধ্যে একমাত্র আলোক, হৃদয়গুহায় গোপন, সাক্ষী, মহাপুরুষ, ঈশ্বর। আপনি স্বয়ং নিজ আশ্রয়, আপনার মায়ায় গুণত্রয় সৃষ্টি করে, তাদের দ্বারা সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় করেন।” “আপনি ধরিত্রী থেকে বোঝা—অর্থাৎ অসুর, দানব, রাক্ষস—নাশ ও সাধুদের রক্ষার জন্য অবতীর্ণ হয়েছেন। ভাগ্যবশত এই অশ্বরূপ দানব, যার হ্রেষায় দেবতারা স্বর্গ ত্যাগ করেছিল, খেলাচ্ছলে আপনার হাতে নিহত হয়েছে।” “শীঘ্রই, হয় কাল বা পরশু, আপনি চাণূর, মুষ্টিক, অন্যান্য কুস্তিগীর, হাতি ও কংসকে বধ করবেন। এরপর শঙ্খ, যবন, মুর, নারক বধ, পারিজাত হরণ, ইন্দ্রজয়—সব ঘটবে। আপনার বীর্যগুণে বহু কন্যাবরণ ও দয়ার কারণে রাজা নৃগের মুক্তি ঘটবে দ্বারকায়।” এভাবেই ভাগবত পুরাণের এই অংশে কংসের ষড়যন্ত্র, কেশীর বধ ও নারদের কৃষ্ণ বন্দনা বর্ণিত হয়েছে—যেখানে সর্বত্র ভগবানের লীলার মহিমা ও তাঁর অবতারধর্মের গভীর তাৎপর্য ফুটে উঠেছে।