শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের এই অধ্যায়ে এক গভীর ও বর্ণিল কাহিনি unfolds হয়। এখানে প্রথমে ভগবান তাঁর মায়ার শক্তির কথা বলেন, যা এক নারীর রূপে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, “দেখো আমার মায়ার শক্তি, নারী-রূপে অবতীর্ণ, যার ভ্রু-ভঙ্গিতেই পৃথিবীজয়ী বীরদেরও পরাজিত করা যায়।” এমনকি যারা পৃথিবীর চারদিকে বিজয় অর্জন করেছে, তারাও এই নারী-রূপী মায়ার সামনে নত হয়। ভগবান আরও বলেন, “যে ব্যক্তি যোগের সর্বোচ্চ স্তরে উঠতে চায়, তার উচিত নারীর সঙ্গে সঙ্গ না করা। আমার সেবায় যারা আত্ম-জ্ঞান লাভ করেছে, তারা ঘোষণা করেছে, নারীর সঙ্গে সঙ্গই নরকের দ্বার।” দেবতাদের দ্বারা সৃষ্ট এই নারী-রূপী মায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে; তাকে চিনতে হবে আত্মার জন্য মৃত্যুরূপে, ঠিক যেমন ঘাসে ঢাকা কূপ অদৃশ্য মৃত্যুর মতো। ভ্রমিত ব্যক্তি তাকে নিজের স্ত্রী বলে মনে করে, যদিও সে আমারই মায়া, গোমাতার রূপে। নারীর সঙ্গ গ্রহণ করলে, সে নারীত্বে প্রবেশ করে এবং ধন, সন্তান, ও গৃহের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তাকে—যিনি স্বামী, সন্তান ও গৃহের মূর্তরূপ—বুঝতে হবে ভাগ্য দ্বারা প্রেরিত মৃত্যুরূপে, যেমন শিকারির গান হরিণের জন্য মৃত্যুর কারণ। জীবাত্মা প্রাণবন্ত দেহে এক জগৎ থেকে অন্য জগতে ঘুরে বেড়ায়, অবিরাম কর্ম করে ও তার ফল ভোগ করে। দেহ, যা উপাদান, ইন্দ্রিয় ও মন দ্বারা গঠিত, তার সঙ্গী; দেহের বিলয়ই মৃত্যুর নাম, আর প্রকাশই জন্মের নাম। যখন কোনো বস্তু উপলব্ধির উপায় ও শক্তি হারিয়ে যায়, তখনই বিলয় হয়; আর বস্তু উপলব্ধিতে ‘আমি’ বোধের জন্ম, সেটাই জন্ম। যেমন চোখ বা তার অংশদ্বয় দর্শনের ক্ষমতা হারালে দর্শকের দেখা বন্ধ হয়, তেমনি দুটোই অযোগ্য হলে দর্শনও শেষ হয়। তাই, আত্মার যাত্রা জানলে, জ্ঞানী ব্যক্তি কোনো ভয়, দয়া বা বিভ্রান্তি অনুভব করবেন না; তিনি অনাসক্ত হয়ে এখানে জীবনযাপন করবেন। সত্য দর্শনযুক্ত বুদ্ধি, যোগ ও বৈরাগ্যে সংযুক্ত হয়ে, তিনি এই মায়াময় জগতে দেহের প্রতি উদাসীন হয়ে বাস করবেন। এরপর শ্রীশুক বলেন, “এভাবে গোপীরা নানা ভাবে গান ও বিলাপ করে কাঁদছিল, হে রাজন, কৃষ্ণকে দেখার আকাঙ্ক্ষায়।” তখন হরি তাদের মাঝে উপস্থিত হলেন, তাঁর পদ্মের মতো মুখে হাসি, পীতবর্ণ বস্ত্র পরিহিত, মালা পরা—যিনি প্রেমের দেবতাকেও বিভ্রান্ত করেন। প্রিয়তমকে ফিরে পেয়ে গোপীদের চোখ আনন্দে প্রস্ফুটিত হলো; তারা সবাই একসাথে উঠে দাঁড়াল, যেন প্রাণ ফিরে এসেছে। কেউ আনন্দে হরির পদ্মহাত জোড়া হাতে ধরল; কেউ তাঁর চন্দন-লেপা বাহু নিজের কাঁধে রাখল। এক স্লিম গোপী তাঁর চিবানো পানপাতা হাতে তুলে নিল; অন্য কেউ, আকুলতায়, তাঁর পদ্মপদ নিজের বক্ষে রাখল। কেউ, প্রেমের উচ্ছ্বাসে, ভ্রু কুঁচকে, ঠোঁটের নিচে দাঁত চেপে, পার্শ্বদৃষ্টিতে আঘাত করছিল। কেউ অনিমেষ চোখে তাঁর পদ্মমুখের দিকে তাকিয়ে রইল, তবু তৃপ্তি পেল না, যেমন জ্ঞানীরা কখনো তাঁর পদ্মপদে তৃপ্ত হয় না। আরেকজন চোখ বন্ধ করে, চক্ষুর দ্বার দিয়ে তাঁকে হৃদয়ে টেনে নিল, রোমাঞ্চিত অঙ্গ দিয়ে তাঁকে আলিঙ্গন করল, যোগীর সুখে নিমগ্ন। সবাই, কেশবকে দেখে, আনন্দের উৎসবে ডুবে, বিরহের যন্ত্রণা ভুলে গেল, যেমন জ্ঞান লাভে মানুষ দুঃখ ভুলে যায়। দুঃখমুক্তদের মাঝে অচ্যুত ভগবান আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন, হে প্রিয়, যেমন শক্তিতে পূর্ণ মানুষ। তাদের নিয়ে ভগবান প্রবেশ করলেন যমুনার বালুকা তীরে, যেখানে জুঁই ও মন্দার ফুল ফুটে আছে, সুগন্ধি বাতাস বইছে, মৌমাছি গুঞ্জন করছে। স্থানটি শুভ, শরৎ-রাত্রির চাঁদের আলোয় অন্ধকার দূর হয়েছে, কৃষ্ণের চঞ্চল হাত, বালুকা নরম ও উজ্জ্বল। গোপীরা নিজেদের উর্দ্ধবস্ত্র দিয়ে, বক্ষের লাল চিহ্নে চিহ্নিত, প্রিয়তমের জন্য আসন প্রস্তুত করল, যেমন বেদ তার লক্ষ্য অর্জন করে। সেখানে, ভগবান যোগীদের হৃদয়ে আসন গ্রহণ করলেন, গোপীদের মাঝে দীপ্তিমান হয়ে উঠলেন, তিন জগতের লক্ষ্মীর একমাত্র আবাসরূপে পূজিত। তারা হাসি, খেলা, চাহনি ও ভ্রু দিয়ে কামনা জাগিয়ে, তাঁর পদ্মপদ স্পর্শ করল, কোলের ওপর হাত রেখে, প্রশংসা করে সামান্য রাগের অভিনয়ে বলল, “যে ভালোবাসে, সে পাল্টা ভালোবাসা পায়; কেউ উল্টো করে, কেউ দু’জনকেই ভালোবাসে না। বলুন, হে মহামান্য, কোনটি ঠিক?” ভগবান বললেন, “যারা নিজেদের লাভের জন্য একে অপরকে ভালোবাসে, তারা বন্ধু, কিন্তু সেখানে প্রকৃত স্নেহ বা ধর্ম নেই, কারণ তা কেবল স্বার্থের জন্য। যারা ভালোবাসে তাদের, যারা তাদের ভালোবাসে না—যেমন করুণাময় পিতা-মাতা—তারা নির্দোষ; এখানে স্নেহ ও ধর্ম শ্রেষ্ঠ। কেউ কেউ তাদেরও ভালোবাসে না, যারা তাদের ভালোবাসে; তারা আত্মতুষ্ট, নিজে পূর্ণ, কৃতজ্ঞ নয়, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করেন না। কিন্তু আমি, হে বন্ধু, এমনকি যারা আমাকে ভালোবাসে, তাদেরও ভালোবাসি না, তাদের ভক্তির জন্য; যেমন দরিদ্র লোক ধন পেয়ে আবার হারিয়ে, তার চিন্তায় মগ্ন হয়ে অন্য কিছু জানে না। তোমরা, দুর্বলরা, আমার জন্য সংসার ও শাস্ত্রের কর্তব্য ত্যাগ করেছ; সরাসরি আমাকে পূজা করেও আমি নিজেকে গোপন করি—তোমরা যেন এতে বিরক্ত না হও, হে প্রিয়জনেরা। তোমাদের নিখুঁত ভক্তির প্রতিদান আমি দেবার মতো নই, দেবতাদের আয়ুষ্কালেও নয়; যারা গৃহের কঠিন বন্ধন ভেঙে আমাকে ভালোবেসেছে, তাদের সৎকর্মই তোমাদের পুরস্কার হোক।” এইভাবে ত্রিশ-দ্বিতীয় অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো—‘গোপীদের সান্ত্বনা’ নামে, শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের প্রথমার্ধের দশম স্কন্ধের মহাপুরাণে, সর্বোচ্চ রাজহংসের শাস্ত্রে। এরপর বলা হয়, ভক্তি-রূপী যোগ যখন ভগবান বাসুদেবের প্রতি নিবেদিত হয়, তখন দ্রুতই বৈরাগ্য ও জ্ঞান উৎপন্ন হয়, যা ব্রহ্মজ্ঞান লাভে পৌঁছে দেয়। যখন কারো মন, ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপে, কোনো বস্তুতে সুখ-দুঃখের ভেদ গ্রহণ করে না—তখন, সেই মুহূর্তেই, সে নিজেকে নিজেই দেখে, অনাসক্ত, সবকিছু সমানভাবে দেখে, গ্রহণ-বর্জনহীন, সর্বোচ্চ অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হয়। শুদ্ধ জ্ঞানই শ্রেষ্ঠ ব্রহ্ম, পরম আত্মা, ঈশ্বর, পুরুষ; ভগবান এক, যদিও বস্তু ও উপলব্ধির দ্বারা পৃথক বলে মনে হয়। পূর্ণ যোগ দ্বারা যোগী এখানে কেবল এতটুকুই অর্জন করেন—সবকিছু থেকে সম্পূর্ণ অনাসক্তি। এক জ্ঞান, বাহ্য ইন্দ্রিয়ের দ্বারা, মায়া-রূপে, বস্তু-রূপে প্রকাশিত হয়; নির্গুণ ব্রহ্মই শব্দ ইত্যাদি গুণ ধারণ করে। এইভাবে, শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের এই অংশে ভগবানের মায়া, গোপীদের প্রেম, এবং যোগ-ভক্তি ও জ্ঞানের গূঢ় তত্ত্ব এক অপূর্ব ও হৃদয়স্পর্শী কাহিনিতে প্রকাশিত হয়েছে।