বনভূমিতে গোপীরা যখন শ্রীকৃষ্ণের সন্ধানে এগিয়ে চলেছেন, তারা নানা রকম চিহ্নিত পদচিহ্ন অনুসরণ করতে করতে অগ্রসর হলেন। হঠাৎ তারা দেখলেন, কারও পদচিহ্ন শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে খুব কাছাকাছি মিশে গেছে। এই দৃশ্য দেখে গোপীরা বিষণ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘‘এ পদচিহ্ন কার, যে নন্দপুত্রের সঙ্গে চলেছে? দেখো, তার বাহু কৃষ্ণের কাঁধে, যেন হাতির সঙ্গে হাতিনী মিশে আছে।’’ তারা বললেন, ‘‘নিশ্চয়ই এই ভাগ্যবতী বহু জন্মে ভগবান হরিকে পূজা করেছে, তাই গোবিন্দ আমাদের ছেড়ে গোপনে তাকে নিয়ে গেছেন।’’ গোপীরা আরও দেখলেন, লতাগুল্মরা শ্রীগোবিন্দের পদধূলি ও চরণরেণুতে ধন্য হয়েছে—এই পদধূলি ব্রহ্মা, শিব ও লক্ষ্মীও তাদের কল্যাণের জন্য শিরে ধারণ করেন। তারা আবার বললেন, ‘‘ওর পদচিহ্নগুলো এখানে গভীরভাবে পড়েছে—এতে আমাদের মন ভারাক্রান্ত। কৃষ্ণ কেবল তাকেই নিয়ে গোপন স্থানে তার অধর আস্বাদন করছেন। এরপর পদচিহ্ন আর নেই—নিশ্চয়ই কচি ঘাস ও অঙ্কুরে তার কোমল পদযুগল ব্যথিত হয়েছে, তাই তার প্রিয়তম তাকে কোলে তুলে নিয়েছেন।’’ গোপীরা বললেন, ‘‘এখানে দেখো, পদচিহ্ন আরও গভীর, বোঝা যায় কৃষ্ণ প্রেমভারে তাকে কোলে নিয়েছেন। এখানে আবার দেখো, তিনি তাকে মাটিতে নামিয়ে ফুল তুলেছেন।’’ তারা দেখলেন, ‘‘এখানে কৃষ্ণ তার প্রিয়ার জন্য ফুল তুলেছেন, প্রতিটি পদক্ষেপে তার চিহ্ন স্পষ্ট। এখানে তিনি তার প্রিয়ার চুল সজ্জিত করেছেন, নিশ্চয়ই সে এখানে বসে ছিল, কৃষ্ণ তার কেশ দুলিয়ে দিয়েছেন।’’ তারা ভাবলেন, ‘‘যিনি স্বয়ং পরিপূর্ণ, তিনিও তার সঙ্গে প্রেমলীলা করলেন, যেন প্রেমিকের দুর্বলতা ও নারীর চঞ্চলতা প্রকাশ পায়।’’ এভাবে গোপীরা নানা চিহ্ন দেখে বনের মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে ঘুরতে লাগলেন। যাকে কৃষ্ণ গোপীদের ছেড়ে গোপনে নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই গোপী মনে মনে ভাবল, ‘‘আমি নিশ্চয়ই সকল নারীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ, কারণ আমার প্রিয়তম কৃষ্ণ গোপীদের ত্যাগ করে এখন কেবল আমাকে পূজা করছেন।’’ বনের মধ্যে এক স্থানে পৌঁছে সে গর্বভরে কেশবকে বলল, ‘‘আমি আর হাঁটতে পারছি না। তুমি আমায় যেখানে ইচ্ছা নিয়ে চলো।’’ কৃষ্ণ তখন স্নেহভরে বললেন, ‘‘আমার কাঁধে চড়ে এসো।’’ কিন্তু পরক্ষণেই কৃষ্ণ অদৃশ্য হয়ে গেলেন, আর সেই নববধূ গোপী নিঃসহায় হয়ে বিলাপ করতে লাগলেন, ‘‘হে প্রভু, হে প্রিয়, হে প্রাণনাথ! তুমি কোথায়? হে বলবান, হে বন্ধু, তোমার দীন দাসীকে দর্শন দাও!’’ শুকদেব বললেন, গোপীরা তখন কৃষ্ণের পথ খুঁজতে খুঁজতে, কোথায় তিনি গেছেন না জেনে, সেই গোপীকে দেখলেন—সে তখন বিচ্ছেদে মুষড়ে পড়েছে। তার কাছ থেকে সব শুনে—তার অহংকার, মাধবের প্রতিক্রিয়া, ও তার দুর্ভাগ্যের লজ্জা—গোপীরা বিস্ময়ে অভিভূত হলেন। তারপর তারা যতক্ষণ চাঁদের আলো ছিল, ততক্ষণ বনে খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু রাত গভীর হলে তারা ফিরে গেলেন। তখন তাদের মন কৃষ্ণে নিমগ্ন, মুখে কৃষ্ণের কথা, কাজে কৃষ্ণের অনুকরণ, আত্মা কৃষ্ণে নিবেদিত—তারা নিজেদের ঘর ভুলে, কেবল তাঁর গুণগান করতে লাগলেন। পুনরায় তারা যমুনার তীরে এসে, কৃষ্ণকে স্মরণ করে, একত্রিত হয়ে, তাঁর প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় কৃষ্ণের গুণগান করতে লাগলেন। এদিকে, রাজন, ক্রোধে গোপীরা যেন তাদের মুখ থেকে অগ্নি ও বায়ু নিঃসরণ করলেন, যেন পৃথিবীকে শুকিয়ে দিতে চায়, ঠিক সম্বর্তক অগ্নির মতো। গাছগুলি দগ্ধ হতে দেখে ব্রহ্মা এলেন ও বারিষ্মতের পুত্রদের জ্ঞান দিয়ে শান্ত করলেন। ভীত গাছগুলি তখন স্বয়ম্ভূর আদেশে তাদের কন্যা মারিষাকে প্রাচেতাসদের হাতে সমর্পণ করল। ব্রহ্মার নির্দেশে প্রাচেতাসরা মারিষাকে গ্রহণ করলেন, যাঁর গর্ভ থেকে, এক মহাপাপের ফলে, সৃষ্টির প্রজাপতি জন্ম নিলেন। চাক্ষুষ মন্বন্তরের অবসানে, সৃষ্টির শুরুতে, কালের অনুরোধে, দাক্ষ প্রয়োজনীয় প্রাণীদের সৃষ্টি করলেন। জন্মের সময় তিনি নিজ আভায় সকলকে ছাপিয়ে গেলেন, নিজের কর্মদক্ষতায় ‘দাক্ষ’ নামে খ্যাত হলেন। যিনি অনাদি, তিনি দাক্ষ ও অন্যান্যদের জীবসৃষ্টির কর্তৃত্ব দিলেন। এরপর গোপীরা বললেন, ‘‘তোমার জন্মে ব্রজ ধন্য হয়েছে, এখানে চিরকাল লক্ষ্মী বাস করেন। প্রিয়, তোমার ভক্তরা সর্বত্র তোমার সন্ধান করে—তুমি যেন তাদের সামনে প্রকাশিত হও। আমরা তো কেবল তোমার দয়া ছাড়া বাঁচি না।’’ ‘‘হে মহাশয়, শরৎ রজনীতে তোমার চাহনি পদ্মের সৌন্দর্যকেও হার মানায়। হে প্রেমের অধিপতি, আমরা তোমার নিঃস্ব দাসী—হে বরদাতা, আমাদের কি এভাবে মেরে ফেলা তোমার শোভা পায়?’’ ‘‘জলবিষ, কালীয় দানব, ঝড়, বজ্র, অগ্নি, বরুণপুত্র ও নানা বিপদ থেকে তুমি আমাদের বারবার রক্ষা করেছ, হে পরমেশ্বর।’’ ‘‘তুমি শুধু গোপীদের আনন্দ নও, তুমি সকল জীবের অন্তর্যামী। ব্রহ্মার অনুরোধে জগতের রক্ষার জন্য তুমি সাত্বত বংশে আবির্ভূত হয়েছ।’’ ‘‘হে বৃষ্ণিদের শ্রেষ্ঠ, তোমার চরণ যারা আশ্রয় নেয়, তুমি তাদের সংসারভয় থেকে মুক্ত করো। প্রিয়, তোমার পদ্মহস্তে আমাদের শিরে আশীর্বাদ দাও।’’ ‘‘হে বীর, বৃন্দাবনের দুঃখ দূরকারী, তোমার হাসি তোমার আপনজনের গর্ব ভেঙে দেয়। বন্ধু, আমাদের দাসী হিসেবে গ্রহণ করো, তোমার পদ্মমুখ আমাদের দেখাও।’’ ‘‘যারা তোমাকে নমস্কার করে, তুমি তাদের পাপ নাশ করো; তুমি গোপালকদের সঙ্গী, সৌভাগ্যের নিকেতন। তোমার পদ্মপায় নতমস্তকে নাগরাজও পূজা করেছে—সেই চরণ আমাদের বক্ষে স্থাপন করো, আমাদের হৃদয়ব্যথা দূর করো।’’ ‘‘তোমার মধুর বাক্য, মনোহর কথা ও হৃদয়গ্রাহী জ্ঞান আমাদের মোহিত করে, হে পদ্মনয়ন, তোমার অধরামৃত দিয়ে আমাদের পুষ্টি দাও।’’ ‘‘তোমার কাহিনীর অমৃত দুঃখীদের প্রাণ, কবিদের দ্বারা গীত, পাপ নাশ করে, শ্রবণে মঙ্গল ও ঐশ্বর্য দেয়—যারা এই কাহিনি প্রচার করে, তারা সত্যিই দানশীল।’’ ‘‘প্রিয়, তোমার হাসি, প্রেমভরা দৃষ্টি, খেলা ও ধ্যান আমাদের জন্য মঙ্গলময়। তোমার গোপন কথা হৃদয় ছুঁয়ে যায়, হে মাধব, আমাদের মন উদগ্রীব করে তোলে।’’ ‘‘যখন তুমি গরু চরাতে চরাও, তখন তোমার পদ্মপদে কাঁকর, ঘাস, অঙ্কুর লাগে; আমাদের মনও তোমার পিছে পিছে ছুটে চলে, হে প্রিয়, আকুলতায় পীড়িত হয়ে।’’ ‘‘দিনশেষে, নীল কেশে, বনফুল-মুখে, ধূলিধূসরিত হয়ে, বারবার প্রকাশিত হও, হে বীর, আমাদের হৃদয়ে প্রেম জাগাও।’’ ‘‘তোমার পদ্মপদ, যারা নমস্কার করে তাদের অভিলাষ পূর্ণ করে, লক্ষ্মীও যাকে পূজা করেন—সেই চরণ আমাদের বক্ষে স্থাপন করো, আমাদের যাতনা দূর করো।’’ ‘‘তোমার বংশীধ্বনিতে চুম্বিত অধর প্রেম বাড়ায়, দুঃখ দূর করে, অন্য সকল আকাঙ্ক্ষা ভুলিয়ে দেয়—হে বীর, আমাদের তোমার অধরামৃত দান করো।’’ এভাবেই গোপীরা কৃষ্ণের প্রেমে, তাঁর স্মরণে, তাঁর গুণগানে ও তাঁর অভিপ্রায়ে নিজেদের সম্পূর্ণ নিবেদন করলেন।