একদিন নন্দ ও তাঁর সঙ্গীরা শ্রীকৃষ্ণের নেতৃত্বে ব্রহ্মসরোবরের তীরে নিয়ে যাওয়া হলেন। সেখানে তাঁরা ব্রহ্মসরোবরে অবগাহন করলেন। শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের জল থেকে তুলে আনলেন এবং তাঁরা দেখলেন সেই ব্রহ্মলোক, যেখানে একসময় অক্রূরও গিয়েছিলেন। এই অপূর্ব স্থান দর্শনে নন্দ ও অন্যান্য গোপগণ চরম আনন্দে অভিভূত হয়ে গেলেন। বিস্ময়ে তাঁরা দেখলেন, সেই স্থানে শ্রীকৃষ্ণ স্তব পাঠ দ্বারা বন্দিত হচ্ছেন। এরপর শ্রীশুকদেব গোস্বামী বললেন— জ্ঞান, বিচার, শাস্ত্র, তপস্যা, প্রত্যক্ষানুভব, পরম্পরা ও অনুমান— এ সকলের আদিতে ও অন্তে যিনি আছেন, সময় ও কারণ যাঁর মধ্যে নিহিত, তিনিই মধ্যেও বিরাজমান। যেমন স্বর্ণকার স্বর্ণের গয়না বানানোর আগে ও পরে স্বর্ণ সর্বত্র বিরাজ করে, ঠিক তেমনই নানা নাম ও রূপের মধ্যেও আমি সেই এক। প্রিয়জন, এই জ্ঞান তিনটি অবস্থায় বিভক্ত— ত্রিগুণের দ্বারা গঠিত কারণ, কার্য ও কর্তা। এদের সংযোগ ও বিচ্ছেদের মধ্যেও যে চতুর্থ অবস্থা, সেটিই সত্য। যা পূর্বে ছিল না, পরে নেই, মধ্যেও নেই, তা কেবল নামমাত্র; যা সর্বোচ্চ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত, সেটাই বাস্তব— এটাই আমার উপলব্ধি। যা নেই, অথচ দেখা যায়— এ রজোগুণজাত পরিবর্তন। স্বয়ংপ্রভ ব্রহ্ম স্বয়ং নিজেই বিচিত্র ব্রহ্ম, ইন্দ্রিয়, বিষয়, মন ও তাদের পরিবর্তনরূপে প্রকাশিত হয়। এইভাবে যুক্তি-বিচার দ্বারা ব্রহ্মকে উপলব্ধি করে, বিপরীতমত খণ্ডন করে, আত্মসন্দেহ ছিন্ন করে, নিজস্ব আনন্দে তৃপ্ত ও নিরাসক্ত হয়ে থাকতে হয়। আত্মা মাটির দেহ নয়, ইন্দ্রিয় নয়, দেবতা, অসুর, বায়ু, জল বা অগ্নিও নয়; মন অন্ন, বুদ্ধি সত্ত্ব, অহংকার আকাশ, পৃথিবী পঞ্চভূতের সাম্য। গুণময় ইন্দ্রিয় যার আসন স্পষ্টভাবে নির্ধারিত, তাকে কি স্পর্শ করতে পারে? অথবা, তারা যদি উদ্বেলিত হয়, তাতে দোষ কোথায়? যেমন মেঘ সূর্যকে ঢেকে রাখলেও, চলে গেলে সূর্যের কিছু আসে যায় না। আকাশ যেমন বায়ু, অগ্নি, জল, ভূমির গুণে লিপ্ত হয় না, তেমনি অব্যয় সত্তা সত্ত্ব, রজ, তম— মানসিক জন্মান্তরের কারণ— এগুলোর দ্বারা স্পর্শিত হয় না। তথাপি, গুণসমূহ, যা মায়ার সৃষ্টি, তাদের সঙ্গ ত্যাগ করা উচিত, যতক্ষণ না আমার প্রতি দৃঢ় ভক্তিতে রজোগুণের অশুদ্ধি মন থেকে দূর হয়। যেসব মিথ্যা যোগী, দেবতা বা মানুষের সৃষ্ট বাধায় বিঘ্নিত হন, তারা পূর্বের অভ্যাসবশত পুনরায় যোগাভ্যাস করেন, তবে কর্মপদ্ধতি অনুযায়ী নয়। কর্ম হয়, জীব কর্ম করে, কোনো কারণ বা ভাগ্যের দ্বারা; কিন্তু জ্ঞানী, প্রকৃতিতে থেকেও, আসক্তি ত্যাগ করে, নিজস্ব আনন্দ উপভোগ করেন। দাঁড়ানো, বসা, হাঁটা, শোয়া, ত্যাগ বা আহার— আত্মা যেভাবেই থাকুক, আত্মস্থ মন অন্য কিছু জানে না। যদি কেউ অপ্রকৃত ইন্দ্রিয়বিষয় দেখে, নানা যুক্তিতে বিপরীত দেখে, জ্ঞানীরা তা বাস্তব মনে করেন না— যেমন জাগরণে স্বপ্ন বিলীন হয়। পূর্বজন্মের গুণকর্ম, যা অজ্ঞানে আত্মার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল, কেবল পর্যবেক্ষণে লয় হয়; আত্মা ধরা বা ত্যাগ করা যায় না। উদিত সূর্য যেমন কেবল অন্ধকার দূর করে, সৃষ্টি করে না, তেমনি আমার তীক্ষ্ণ বিচার বুদ্ধিতে মানুষের অজ্ঞতার অন্ধকার দূর হয়। এই স্বয়ংপ্রভ, অজন্মা, অসীম সত্তাই মহাস্বাদ, সকলের স্বাদ, দ্বিতীয়হীন, যার দ্বারা বাক্য ও প্রাণ পরিচালিত হয়, বাক্য যখন স্তব্ধ হয়, তখন তাকেই উপলব্ধি করা যায়। আত্মবিভ্রম এতটুকুই— বিশুদ্ধের মধ্যে পার্থক্যের ধারণা; আত্মা ছাড়া আর কিছুই নিজের সমর্থন নয়। নাম ও রূপে, পঞ্চভেদে যা ধরা পড়ে— তা অর্থহীন হলেও কেবল প্রশংসা, এই দ্বৈতবোধ তথাকথিত জ্ঞানীদের। যে যোগীর যোগ এখনও পরিপক্ক হয়নি, তার দেহে যে বিঘ্ন আসে, তার জন্য নিয়ম নির্ধারিত আছে। কেউ যোগের একাগ্রতায় আসন ও কুম্ভক দ্বারা দুঃখ নাশ করে; কেউ তপস্যা, মন্ত্র, ঔষধে বিঘ্ন দূর করে। কেউ আমার ধ্যান, নামসংকীর্তন বা যোগাচার্যদের পথ অনুসরণে অশুভ দূর করে। কেউ আবার যৌবনে দেহ সুস্থ ও সুগঠিত করে, নানা পদ্ধতিতে সিদ্ধি অর্জনের চেষ্টা করে। কিন্তু এই দক্ষতা গৌরবের বিষয় নয়, কারণ দেহ নশ্বর, বৃক্ষের ফলের মতো। যোগাভ্যাসে দেহ দীর্ঘজীবী হলেও, বুদ্ধিমান ব্যক্তি এতে বিশ্বাস করে না; বরং যোগ ত্যাগ করে আমার ভক্তিতে নিয়োজিত হয়। যে যোগী আমার আশ্রয়ে যোগাভ্যাস করে, সে বিঘ্নে বিচলিত হয় না, নিরাসক্ত থেকে নিজস্ব আনন্দে থাকে। ঠিক যেমন কোনো স্ত্রী, স্বামীর প্রস্থান অজানা থাকায়, স্বাভাবিকভাবেই বসে থাকে; কিন্তু স্বামীর পায়ে উষ্ণতা না পেলে, সে শঙ্কিত মনে বসে থাকে, যেন হরিণী দলের থেকে বিচ্ছিন্ন। তখন সে অসহায়, বন্ধুহীন, নিজেকে নিয়ে বিলাপ করতে করতে বুকে চাপড়ে কাঁদে। সে উচ্চস্বরে ডাকে— “ওঠো, ওঠো রাজর্ষি! তুমি তো সাগরবেষ্টিত এই ভূমিকে রক্ষা করবে, যা ডাকাত ও পতিত ক্ষত্রিয়দের ভয়ে কাঁপছে।” এভাবে বিলাপ করতে করতে সে স্বামীর পিছু পিছু অরণ্যে যায়, স্বামীর চরণে লুটিয়ে পড়ে অশ্রু বিসর্জন করে। সে কাঠের চিতা তৈরি করে, স্বামীর দেহ তাতে স্থাপন করে, নিজেও মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়, মন চিতায় স্থির রেখে বিলাপ করতে থাকে। তখন তার এক প্রাচীন বন্ধু, আত্মজ্ঞ ব্রাহ্মণ, কোমল বাক্যে তাকে সান্ত্বনা দেন, যখন সে কাঁদছিল। ব্রাহ্মণ বলেন, “তুমি কে? কাহার? কার জন্য এই শোক? আমাকেও কি তুমি সেই বন্ধুরূপে চেনো, যার সঙ্গে একদিন ঘুরে বেড়াতে? তুমি কি মনে করতে পারো, হে বন্ধু, আমি ছিলাম অজানা সঙ্গী? আমাকে ছেড়ে তুমি অন্যত্র গিয়েছিলে, সংসারসুখে মগ্ন হয়ে। হে মহাভাগ্যবতী, তুমি ও আমি ছিলাম রাজহংস, মানস সরোবরের বন্ধু; হাজার হাজার বছর আমাদের বিচ্ছেদ হয়নি। কিন্তু তুমি আমায় ছেড়ে সংসারমুখী হয়ে পৃথিবীতে গিয়েছিলে, ঘুরে বেড়িয়ে এক নারীর গৃহে প্রবেশ করেছিলে।” এভাবেই শ্রীশুকদেব গোস্বামী এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন, যা শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধের প্রথমার্ধের অষ্টাদশ অধ্যায়।