একদিন, গোকুলে নানা অলৌকিক ঘটনার কথা আলোচনা হচ্ছিল। কৃষ্ণ তাঁর অসীম শক্তিতে গোকুলবাসীদের বহু বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন—এ কথা সকলেই জানতেন। তিনি প্রথমে গোকুলের তালবনে প্রবেশ করে গাধা-রূপী দানব ও তার শক্তিশালী সঙ্গীদের বধ করেন, ফলে তালবনটি নিরাপদ হয়ে ওঠে এবং পাকা ফলসমৃদ্ধ হয়। এরপর, কৃষ্ণ তাঁর অসাধারণ বলপ্রয়োগে ভয়ঙ্কর প্রলম্বাসুরকে হত্যা করেন এবং বনদাহ থেকে গোপ ও গোপালদের মুক্ত করেন। একদিন, বিষাক্ত সাপরাজ কালীয়াকে দমন করে কৃষ্ণ তাকে যমুনা থেকে বিতাড়িত করেন। ফলে যমুনার জল আবার বিষমুক্ত ও পবিত্র হয়ে ওঠে। এইসব অসাধারণ কীর্তি দেখে বৃন্দাবনের সকল বাসিন্দার মনে কৃষ্ণের প্রতি এমন এক সহজাত ও অটুট স্নেহ জন্মে যায়, যা কখনোই ত্যাগ করা যায় না। সবাই বিস্মিত হয়ে নন্দকে জিজ্ঞাসা করলেন—নন্দ, তোমার পুত্রের প্রতি আমাদের মনে এমন স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা কেন জন্ম নিল? তাঁরা আরও বললেন, “কীভাবে মাত্র সাতদিন বয়সী একটি শিশু বিশাল পর্বত তুলে ধরতে পারে? তাই, হে বৃজের প্রধান, তোমার পুত্র সম্পর্কে আমাদের মনে সন্দেহ জাগে।” তখন নন্দ মহারাজ সকল গোপদের বললেন, “শুনো, গোপগণ, আমার কথা শুনে তোমাদের সন্দেহ দূর করো। এই শিশুকে নিয়ে ঋষি গর্গ, যিনি যাদুবংশীয় মুনি, আমাকে একদিন যা বলেছিলেন, তা জানাও।” নন্দ বললেন, “গর্গ মুনি বলেছিলেন, এই শিশুটি পূর্ববর্তী যুগে তিনটি রঙ ধারণ করেছিলেন—শ্বেত, লাল ও হলুদ; আর এখন তিনি শ্যামবর্ণ ধারণ করেছেন। পূর্বে তিনি বসুদেবের পুত্ররূপে জন্মেছিলেন, আর এখন তোমাদের সন্তান। জ্ঞানীরা তাঁকে ‘বাসুদেব’ নামে অভিহিত করেন। তোমাদের এই পুত্রের বহু নাম ও রূপ আছে, যা তাঁর গুণ ও কর্ম অনুসারে। আমি এগুলো জানি, কিন্তু সাধারণ মানুষ জানে না। গোপ ও গোকুলবাসীর আনন্দের উৎস এই শিশু তোমাদের সর্বপ্রকার কল্যাণ এনে দেবে; তাঁর দ্বারা তোমরা সহজেই সকল বিপদ পার হতে পারবে। প্রাচীন কালে, যখন কোনো রাজা ছিল না এবং সজ্জনরা দস্যুদের দ্বারা অত্যাচারিত হতেন, তখন এই শিশুরই আশ্রয়ে একত্রিত হয়ে তারা দস্যুদের পরাজিত করেছিলেন। যাঁরা সৌভাগ্যবান, তাঁর প্রতি যাঁদের স্নেহ জন্মে, তাঁদের কোনো দুর্দশা পরাস্ত করতে পারে না; যেমন, বিষ্ণুর আশ্রয়ে থাকা ব্যক্তিদের কোনো অসুর পরাস্ত করতে পারে না। তাই, হে বৃজেশ্বর, এই নন্দপুত্র গুণ, ভাগ্য, খ্যাতি ও প্রভাব—সব দিক দিয়েই নারায়ণের সমান। তাঁর কর্মে আশ্চর্য কিছু নেই। গর্গমুনি আমায় সরাসরি এই কথা বলে গৃহে ফিরে যান। তাই আমি কৃষ্ণকে, যিনি অক্লেশে সমস্ত কর্ম করেন, নারায়ণের অংশরূপে মনে করি।” নন্দের কথা ও গর্গমুনির বাণী শুনে, বৃন্দাবনের বাসিন্দারা কৃষ্ণের অসীম মহিমা নিজের চোখে দেখে ও শুনে আনন্দে নন্দ ও কৃষ্ণকে সম্মান জানালেন এবং বিস্ময়মুক্ত হলেন। একবার, ইন্দ্র যজ্ঞে বিঘ্ন ঘটায় প্রচণ্ড বর্ষণ, শিলাবৃষ্টি ও ঝড় পাঠান। গোপ ও গোপালরা যখন চরম দুঃখে পড়েন, তখন কৃষ্ণ, সকলের একমাত্র আশ্রয়, স্নেহভরে হাসলেন। তিনি এক হাতে গোবর্ধন পর্বতকে শিশুর মতো সহজে তুলে ধরলেন এবং গোপসমাজকে রক্ষা করলেন। এইভাবে ইন্দ্র, নিজের শক্তিতে গর্বিত হয়ে, গোপদের প্রতি সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। এইভাবে, শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধের প্রথম অংশের ছাব্বিশতম অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল, যা পরম বৈরাগ্যশালীদের মহাপুরাণ। এরপর ভগবান বললেন—যাঁরা সংসারে অনাসক্ত, আমার মধ্যে সম্পূর্ণ নিমগ্ন, শান্ত, সকলকে সমান দৃষ্টিতে দেখেন, মালিকানা ও অহংকারবোধহীন, দ্বন্দ্বে বিচলিত নন এবং লোভমুক্ত, তাঁরাই প্রকৃত সাধু। হে সৌভাগ্যবান, তাঁদের মধ্যে আমার কাহিনী সর্বদা উচ্চারিত হয়; এই কাহিনী যাঁরা শ্রদ্ধাভরে লালন করেন, তাঁদের পাপ মোচন হয়। যারা শ্রদ্ধাভরে শ্রবণ করেন, গান করেন বা অনুমোদন করেন এবং আমার প্রতি ভক্তি ও বিশ্বাস রাখেন, তারা আমারই ভক্তি লাভ করেন। যে সাধু ভক্তি লাভ করেছে, তার আর কিছু অর্জন করার থাকে না; কারণ, সে তখন আমার মধ্যেই, অনন্ত, ব্রহ্ম ও আনন্দময় সত্তায় পরম সুখ অনুভব করে। যেমন কেউ জ্বলন্ত অগ্নির কাছে গিয়ে শীত, ভয় ও অন্ধকার দূর করে, তেমনি সাধুজনের সঙ্গেও সব দুঃখ দূর হয়। যারা জন্ম-মৃত্যুর ভয়ঙ্কর সাগরে ডুবে-উঠছে, তাদের জন্য ব্রহ্মজ্ঞ, শান্ত সাধুরা যেন এক শক্তিশালী নৌকা। খাদ্য জীবের প্রাণ, আমি দুঃখিতদের আশ্রয়, ধর্ম মৃত্যু-পরবর্তী মানুষের সম্পদ, আর সাধুরা এই জগতে ভীতদের আশ্রয়। সাধুরা সূর্যের মতো জগতে দর্শন দেন; দেবতা, আত্মীয়, সাধু এবং আমিও—সবাই সাধুরূপে। এইভাবে, বৈতসেন, উর্বশীর সঙ্গ ত্যাগ করে, সংসারে অনাসক্ত, আত্মার আনন্দে বিচরণ করেছিলেন। তারপর, বায়ুতত্ত্বের কথা বলা হয়—মৃদুতা-কঠোরতা, শীত-উষ্ণতা—এগুলো স্পর্শের গুণ, যা বায়ুর সূক্ষ্ম উপাদান। গতি, সংগ্রহ, অধিগ্রহণ, বস্তু ও শব্দের মধ্যে নেতৃত্ব, এবং ইন্দ্রিয়গুলির সারাংশ—এগুলো বায়ুর কর্ম। স্পর্শের সূক্ষ্ম উপাদান ও ঈশ্বরের ইচ্ছায় রূপের উদ্ভব হয়; এরপর আলো সৃষ্টি হয়, এবং চক্ষু রূপ উপলব্ধির মাধ্যম হয়। বস্তুর স্বরূপ, ধর্মের গুণ, ব্যক্তির পৃথকত্ব—এগুলো অগ্নিতত্ত্বের বিশুদ্ধ রূপের কর্ম। আলোকিত করা, সিদ্ধি, উত্তাপ, দহন, শীত দূরীকরণ, শুকিয়ে দেওয়া, ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সৃষ্টি—এগুলো অগ্নির কাজ। বিশুদ্ধ রূপ, অগ্নিতে রূপান্তরিত ও ঈশ্বরের ইচ্ছায়, বিশুদ্ধ স্বাদের জন্ম দেয়; সেখান থেকে জল, এবং স্বাদ উপলব্ধির জন্য জিহ্বা। কষা, মিষ্টি, তিতো, ঝাল, টক—এইভাবে, উপাদানের পরিবর্তনে এক স্বাদ নানা রূপে বিভক্ত হয়। সিক্তকরণ, কঠিনকরণ, তৃপ্তি, জীবনধারণ, পুষ্টি, আনন্দ, উষ্ণতা নিবারণ ও প্রাচুর্য—এগুলো জলের গুণ। বিশুদ্ধ স্বাদ, জলে রূপান্তরিত ও ঈশ্বরের ইচ্ছায়, বিশুদ্ধ গন্ধের সৃষ্টি করে; সেখান থেকে পৃথিবী, এবং ঘ্রাণ উপলব্ধির জন্য নাসিকা। উপাদানভেদে এক গন্ধ নানা রূপে—মাটির, পঁচা, সুগন্ধি, কোমল, তীব্র, টক ইত্যাদি হয়ে যায়। গঠনের ভিত্তি, ব্রহ্মার আসন, আশ্রয়, প্রকৃত স্বাতন্ত্র্য, জীবের সকল গুণের উদ্ভব—এগুলো পৃথিবীর বৈশিষ্ট্য। যে বস্তুতে আকাশের বিশেষ গুণ লক্ষ্য করা যায়, তা শ্রবণ; বায়ুর বিশেষ গুণের বস্তু স্পর্শ; অগ্নির বিশেষ গুণের বস্তু দর্শন; জলের বিশেষ গুণের বস্তু স্বাদ; পৃথিবীর বিশেষ গুণের বস্তু গন্ধ। কোনো গুণ একটিতে থাকে, অন্যটিতে থাকে না—এভাবে উপাদানসমষ্টির কারণে পৃথকত্ব বোঝা যায় কেবল পৃথিবীতেই। এইভাবে, কৃষ্ণের অলৌকিক কীর্তি, গর্গমুনির বাণী, সাধুদের মহিমা ও উপাদানতত্ত্বের গূঢ় ব্যাখ্যা এক মহান ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত হল।