গোকুলে হঠাৎই শুরু হয় ভয়ঙ্কর শিলাবৃষ্টি। গরু, গোপ, পশুপাখি—সবাই প্রাণহীন হয়ে পড়ছে সেই শিলার আঘাতে। ভগবান হরি বুঝলেন, ইন্দ্রের ক্রোধ থেকেই এই বিপর্যয় নেমে এসেছে। তিনি বললেন, “আমাদের যজ্ঞ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইন্দ্র অত্যন্ত রুষ্ট হয়েছে। সে আমাদের ধ্বংস করতে চায় বলেই এই অস্বাভাবিক, ভয়ংকর, পাথর-বৃষ্টি ও ঝড় পাঠিয়েছে।” তিনি ঘোষণা করলেন, “আমার যোগবলেই আমি এর মোকাবিলা করব। যারা নিজেদের জগতের অধিপতি ভাবে, তাদের অহংকার থেকে জন্ম নেওয়া গর্ব আমি বিনাশ করব। প্রকৃত দেবতাদের জন্য ভগবানের কাছে আশ্চর্য কিছু নেই, কিন্তু যারা অযোগ্য, তাদের অহংকার ভাঙলেই তারা শান্ত হয়।” ভগবান বললেন, “এই গোকুলবাসীরা আমার আশ্রয় নিয়েছে, আমাকেই প্রভু মেনে নিয়েছে, আর আমি তাদের আপন বলে গ্রহণ করেছি। তাই আমার যোগবলেই আমি তাদের রক্ষা করব। এটাই আমার সংকল্প।” এই কথা বলে শ্রীকৃষ্ণ এক হাতে অনায়াসে গোবর্ধন পর্বত তুলে ধরলেন, যেন শিশুরা ছাতা ধরে। তারপর তিনি গোপ-গোপীদের বললেন, “মা, বাবা, বৃন্দাবনের বাসিন্দারা, তোমরা তোমাদের গরু নিয়ে, যেভাবে সুবিধা হয়, পর্বতের গুহার মধ্যে প্রবেশ করো।” তিনি আশ্বস্ত করলেন, “আমার হাতে থেকে পর্বত পড়ে যাবে বলে ভয় নেই, ঝড়-বৃষ্টি থেকেও ভয় নেই; তোমাদের রক্ষার ব্যবস্থা হয়ে গেছে।” কৃষ্ণের কথায় আশ্বস্ত হয়ে, গোকুলবাসীরা তাদের ধন-সম্পদ, পরিবার-পরিজন, গবাদি পশু নিয়ে, যতটুকু জায়গা ছিল, পর্বতের গুহায় প্রবেশ করল। তারা ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ক্লান্তি, আর আরামের আকাঙ্ক্ষা ভুলে গেল। সাত দিন ধরে কৃষ্ণ এক পা-ও না নেড়ে গোবর্ধন ধরে রইলেন। কৃষ্ণের এই অলৌকিক যোগশক্তির কথা শুনে ইন্দ্র বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন; তাঁর দৃঢ় সংকল্প ভেঙে গেল, আর তিনি তাঁর মেঘদল ফিরিয়ে নিলেন। আকাশ পরিষ্কার হল, সূর্য হাসল, ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেল। তখন গোবর্ধনধারী কৃষ্ণ গোপ-গোপীদের বললেন, “তোমরা সকলেই নির্ভয়ে বাইরে চলে যাও; গরু, ধন-সম্পদ, সন্তান নিয়ে ভয় ত্যাগ করো। ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেছে, নদীগুলোও শান্ত হয়েছে।” তখন গোপ-গোপীরা ধীরে ধীরে তাদের গরু, গাড়ি, ধন-সম্পদ, স্ত্রী, সন্তান, বৃদ্ধ-জ্যেষ্ঠদের নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। ভগবান কৃষ্ণ সকলের সামনে, যেন খেলাচ্ছলে, গোবর্ধন পর্বত আবার আগের জায়গায় বসিয়ে দিলেন। গোকুলবাসীরা কৃষ্ণকে ঘিরে গভীর স্নেহে তাঁকে আলিঙ্গন করলেন, চুপচাপ তাঁর কাছে এসে আনন্দে মিলিত হলেন। গোপিনীরা আনন্দে দই, অক্ষত চাল, নানা উপহার নিয়ে কৃষ্ণকে পূজা করলেন এবং আশীর্বাদ দিলেন। যশোদা, রোহিণী, নন্দ এবং বলরাম—শক্তিশালী নায়করা—কৃষ্ণকে বুকে টেনে নিয়ে অপরিসীম স্নেহে আশীর্বাদ করলেন। আকাশে দেবতা, সিদ্ধ, সাধ্য, গান্ধর্ব, চারণ সবাই আনন্দিত হয়ে কৃষ্ণকে প্রশংসা করলেন এবং ফুলের বৃষ্টি বর্ষালেন। শঙ্খ, ঢাক বাজতে লাগল, গান্ধর্বদের নেতা তুম্বুরু সঙ্গীত পরিবেশন করলেন। এরপর কৃষ্ণ বলরামকে নিয়ে গোপ-গোপীদের সঙ্গে নিজ গোকুলে ফিরে গেলেন। গোপিনীরা কৃষ্ণের এই আশ্চর্য কীর্তির গান গাইতে গাইতে আনন্দে, প্রেমে উদ্বেল হয়ে তাঁর পেছনে চলল। এইভাবেই শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণের দশম স্কন্ধের প্রথমার্ধের পঁচিশতম অধ্যায় শেষ হয়। এরপর ভগবান বললেন, “যারা প্রকৃতির গুণে আসক্তি ত্যাগ করে, জ্ঞানী, সংযমী, সর্বদা সতর্ক, তারা আমাকেই ভজনা করুক। সাধক সত্ত্বগুণ চর্চা করে রজ-তম জয় করে, পরে বৈরাগ্য ও প্রশান্তির দ্বারা সত্ত্বও অতিক্রম করে—তখন গুণাতীত হয়ে আমার মধ্যে বিলীন হয়, পৃথকত্ব ছেড়ে।” “আত্মা যখন অন্য আত্মা ও গুণজাত কামনা থেকে মুক্ত হয়, তখন সে আমার—পরম ব্রহ্মের—মধ্যে সম্পূর্ণ হয়, আর কোথাও গমন করে না। যারা আমার এই মহামায়ার অধিপতি রূপ জানে, অষ্টঋদ্ধি-সম্পন্ন, তারা লক্ষ্মীর সৌভাগ্যও কামনা করে না; এ পৃথিবীতে তারা আমার পরম অবস্থায় পৌঁছে যায়।” “যারা আমার প্রতি একান্ত ভক্ত, শান্ত-স্বভাব, তারা কখনো বিনষ্ট হয় না; কালের অস্ত্রও তাদের স্পর্শ করে না। যাদের কাছে আমি আত্মা, পুত্র, বন্ধু, গুরু, সুহৃদ ও আরাধ্য দেবতা—তাদের জন্য।” “এই জগৎ, পরজগৎ, যেসব আত্মা এই দুই জগতে বিচরণ করে, এবং যা কিছু নিজের বলে ধরা হয়—ধন, গরু, গৃহ—সবকিছু ত্যাগ করে, কেবল আমাকেই সর্বব্যাপী ভেবে, একান্ত ভক্তি নিয়ে যে আমায় আরাধনা করে, আমি তাকে মৃত্যুর ওপারে পৌঁছে দিই।” “আমিই সমস্ত জীবের পরম ঈশ্বর, আদ্য প্রকৃতির অধিপতি—আমার ছাড়া কোথাও ভয় দূর হয় না। আমার ভয়ে বাতাস বইছে, সূর্য আলো দেয়, ইন্দ্র বর্ষণ করে, অগ্নি জ্বলে, মৃত্যুও বিচরণ করে।” “জ্ঞান ও বৈরাগ্য-সমন্বিত যোগীরা ভক্তিযোগের মাধ্যমে আমার নির্ভয় চরণে আশ্রয় নেয়, নিজেদের মঙ্গল লাভ করে। এই পৃথিবীতে মানুষের সর্বোচ্চ কল্যাণ একমাত্র আমাতে একাগ্রচিত্তে ভক্তি স্থাপনেই।” “উপরের সাতটি, সামনে দুটি, নিচে দুটি—মোট এগারোটি দ্বার রয়েছে, যেগুলো দিয়ে ইন্দ্রিয়-বিষয় প্রবাহিত হয়; সেইসব দ্বারে এক অধিপতি বাস করেন।” “পূর্বদিকে পাঁচটি, দক্ষিণে একটি, উত্তরে একটি, পশ্চিমে দুটি দ্বার; এবার আমি তাদের নাম বলছি। পূর্বদিকে দুটি দ্বার একসঙ্গে, যেন জোনাকির মতো, সেখান দিয়ে দ্যুমৎসখ প্রবেশ করে ভূমি আলোকিত করে। পূর্বদিকে নলিনী ও নালিনী নামে দুটি দ্বার, সেখান দিয়ে অবধূতসখ সুগন্ধ ভূমিতে প্রবেশ করে।” “সামনে মুখ্য নামে একটি দ্বার, সেখানে অনেক দোকান ও খাদ্যবাহী নৌকা; সেই দ্বার দিয়ে নগরাধিপতি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে স্বাদ আস্বাদন করতে প্রবেশ করেন। দক্ষিণের পিতৃহূ নামে দ্বার দিয়ে পুরঞ্জন দক্ষিণ পাঞ্চাল দেশে প্রবেশ করেন, সঙ্গে থাকেন জ্ঞানবাহকরা। উত্তরের দেবহূ নামে দ্বার দিয়ে পুরঞ্জন উত্তর পাঞ্চাল দেশে প্রবেশ করেন, সঙ্গে থাকেন জ্ঞানবাহকরা।” “পশ্চিমের আসুরী নামে দ্বার দিয়ে পুরঞ্জন গামক দেশে প্রবেশ করেন, সঙ্গে নিয়ে অহংকার। পশ্চিমের নিরৃতি নামে দ্বার দিয়ে পুরঞ্জন বৈশস দেশে প্রবেশ করেন, সঙ্গে নিয়ে লোভ।” এইভাবেই শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত হল কৃষ্ণের গোবর্ধনধারণ, গোকুলবাসীর রক্ষা, এবং আত্মোপলব্ধির গূঢ় উপদেশ।