এভাবে, বৃন্দাবনের গোপীবৃন্দ তাঁদের চিত্তে কেবল কৃষ্ণের চিন্তা ধারণ করে এক মাসব্যাপী ব্রত পালন করছিলেন। তাঁরা ভদ্রকালী দেবীর পূজা করতেন, তাঁদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল—নন্দনন্দন কৃষ্ণ যেন তাঁদের স্বামী হন। প্রতি ভোরে, সখীদের সঙ্গে উঠে, পরস্পরের বাহু জড়িয়ে ধরে, তাঁরা উচ্চস্বরে কৃষ্ণের গুণগান করতে করতে প্রতিদিন কালিন্দী নদীতে স্নানের জন্য যেতেন। একদিন, নদীতীরে এসে, পূর্বের মতোই তাঁদের বস্ত্র রেখে, কৃষ্ণের গান গাইতে গাইতে আনন্দে জলে খেলতে লাগলেন। সেই সময়, সমস্ত যোগীদের অধিপতি শ্রীকৃষ্ণ, গোপীদের মনের বাসনা বুঝে, তাঁর সখাদের নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি তাঁদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে এসেছেন। দ্রুত গিয়ে গোপীদের বস্ত্র নিয়ে একটি কদম্ব গাছে উঠে পড়লেন এবং সখাদের সঙ্গে হাসতে হাসতে গোপীদের উদ্দেশ্যে কৌতুকপূর্ণ কথা বলতে লাগলেন। তিনি বললেন, ‘‘এসো, তোমরা প্রত্যেকে নিজের নিজের বস্ত্র নিয়ে যাও; আমি সত্যি বলছি, কেবল মজা করছি না। যদি ব্রত পালন করে ক্লান্ত হয়ে থাকো, তবে এসো। আমি কখনো মিথ্যা বলিনি, এই ছেলেরাও তা জানে। হে সুন্দরী, তোমরা একে একে এসে বস্ত্র নিয়ে যাও, সবাই একসঙ্গে নয়।’’ কৃষ্ণের এই কৌতুক দেখে গোপীরা লজ্জায় পরস্পরের দিকে তাকালেন, মৃদু হাসলেন, কিন্তু জলের বাইরে এলেন না। গোবিন্দ যখন এমনভাবে হাস্যরস করছিলেন, গোপীদের মন ছিল ব্যাকুল, তাঁরা ঠান্ডা জলে গলা পর্যন্ত ডুবে কাঁপতে কাঁপতে কৃষ্ণকে বললেন, ‘‘হে নন্দনন্দন, আমাদের প্রতি দয়া করো। আমরা জানি, তুমি বৃজবাসীদের গৌরব। আমাদের বস্ত্র ফিরিয়ে দাও, আমরা কাঁপছি।’’ ‘‘হে শ্যামসুন্দর, আমরা তোমার দাসী, তুমি যা বলবে তাই করব। আমাদের বস্ত্র ফেরাও, হে ধর্মজ্ঞ, না হলে আমরা রাজাকে জানাবো।’’ তখন ভগবান বললেন, ‘‘যদি সত্যিই আমার দাসী হও এবং আমার কথা মানো, তবে এই নির্মল হাস্যময়ীরা এখানে এসে তাঁদের বস্ত্র নিয়ে যাক।’’ তখন সমস্ত গোপী ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে জলের বাইরে এলেন, লজ্জায় শরীর ঢাকলেন, এবং কষ্টে দাঁড়ালেন। তাঁদের এই অসহায় অবস্থা দেখে ভগবান তাঁদের নির্মল ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে বস্ত্র কাঁধে নিয়ে স্নেহভরে হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘তোমরা ব্রত পালন করতে গিয়ে নগ্ন অবস্থায় জলে প্রবেশ করেছ, এটি দেবতাদের প্রতি অপরাধ। হাত জোড় করে মাথা নত করো, এই দোষ দূর হবে, তারপর বস্ত্র নিয়ে পরিধান করো।’’ অচ্যুতের এই কথা শুনে গোপীরা বুঝলেন, নগ্ন হয়ে স্নান করা তাঁদের ব্রতের লঙ্ঘন। কিন্তু কৃষ্ণ নিজে যেহেতু এইভাবে বললেন, তাই তাঁর কথাকে ব্রতের সমাপ্তি ও সিদ্ধি বলে গ্রহণ করলেন এবং এতে কোনো দোষ দেখলেন না। তাঁদের এই নম্রতা দেখে দেবকী-পুত্র কৃষ্ণ করুণায় অভিভূত হয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে তাঁদের বস্ত্র ফিরিয়ে দিলেন। এইভাবে কৌতুক, লজ্জা, খেলায়, এমনকি বস্ত্রহরণের মধ্যেও গোপীরা কৃষ্ণের ওপর কোনো রাগ করলেন না; বরং প্রিয়জনের সান্নিধ্যে তাঁরা আনন্দই অনুভব করলেন। বস্ত্র পরিধান করে, হৃদয়ে কৃষ্ণ-সঙ্গের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, গোপীরা লজ্জায় চোখ নিচু করে তাঁর কাছ থেকে সরে গেলেন না। তাঁদের চরণের স্পর্শলাভের ইচ্ছা বুঝে দামোদর কৃষ্ণ, ব্রতরতা গোপীদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘‘হে সদ্ব্রতা, তোমরা আমাকে পূজার বাসনা নিয়ে ব্রত পালন করেছ, আমি তা জানি এবং তোমাদের উদ্দেশ্য পূরণ হবে। যাঁদের মন আমার ওপর স্থির, তাঁদের কামনা কামরূপে পরিণত হয় না, যেমন ভাজা ও সিদ্ধ শস্য থেকে চারা গজায় না।’’ ‘‘এখন তোমরা বৃজে ফিরে যাও, তোমাদের ব্রত সিদ্ধ হয়েছে। অচিরেই রাতের বেলায় আমার সঙ্গে মিলিত হবে, কারণ এই ব্রত আমার পূজার জন্যই ছিল।’’ শুকদেব বললেন—এভাবে ভগবানের নির্দেশে, গোপীরা তাঁদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়েছে জেনে, কৃষ্ণের পদপদ্ম স্মরণ করতে করতে বৃজে ফিরে গেলেন—যদিও তাঁদের পক্ষে বিচ্ছেদ ছিল খুবই কষ্টকর। এরপর দেবকী-পুত্র কৃষ্ণ, চারিদিকে রাখালবালকদের নিয়ে, বড় ভাই বলরামের সঙ্গে বৃন্দাবন থেকে দূরে গিয়ে গরু চরাতে লাগলেন। তখন তিনি দেখলেন, গাছেরা নিজেদের দেহ ছায়া দিয়ে রৌদ্রের তীব্রতা থেকে সকলকে রক্ষা করছে। তিনি বৃজবাসীদের বললেন, ‘‘হে স্তোককৃষ্ণ, অংসু, শ্রীদাম, সুবল, অর্জুন, বিশাল, ঋষভ, তেজস্বিন, দেবপ্রস্থ, বরূথপ! দেখো, এরা কত মহান আত্মা—অন্যের কল্যাণেই বেঁচে থাকে। বাতাস, বৃষ্টি, রোদ, ঠান্ডা সহ্য করে আমাদের রক্ষা করে।’’ ‘‘ধন্য এদের জন্ম, কারণ সব জীবই এদের ওপর নির্ভরশীল। সত্যিকারের কল্যাণকারী যেমন কারও অনুরোধে মুখ ফেরায় না, এরাও তেমন। পাতার ছায়া, ফুল, ফল, মূল, বাকল, কাঠ, গন্ধ, রস, ছাই, হাড়—সবকিছু দিয়ে এরা আমাদের ইচ্ছা পূরণ করে।’’ ‘‘এই পৃথিবীতে দেহধারীদের প্রকৃত জন্মসার্থকতা একটাই—নিজের জীবন, সম্পদ, বুদ্ধি ও বাক্য দিয়ে সর্বদা পরোপকারে ব্রতী হওয়া।’’ এভাবে, তারা গাছের ঝুলন্ত নতুন কুঁড়ি, ফল, ফুল, পাতার মধ্য দিয়ে যমুনার তীরে পৌঁছল। সেখানে, গরুগুলিকে শীতল, পবিত্র, শুভ্র জলে জল পান করিয়ে, রাখালরাও তৃষ্ণা মিটিয়ে মিষ্টি জল পান করল। তারপর, গাছের ছায়াময় বনে গরুগুলিকে মুক্তভাবে চরতে দিয়ে, কৃষ্ণ ও বলরাম এগিয়ে এলেন। তখন রাখালরা ক্ষুধায় কৃষ্ণকে বলল, ‘‘ইন্দ্রিয়বিষয়ে আসক্তির কারণে জীব নিজেকে ভুলে যায়; কোনো এক অজানা কারণে মৃত্যু মানে হলো সম্পূর্ণ বিস্মৃতি।’’ ‘‘জন্ম, যা মানুষ নিজের অস্তিত্ব মনে করে, আসলে ইন্দ্রিয়বিষয়ের গ্রহণ—ঠিক স্বপ্ন বা কল্পনার মতো। যেমন কেউ পূর্বের স্বপ্ন বা কল্পনা মনে রাখতে পারে না, তেমনি সেই অবস্থায় নিজেকে নতুন মনে হয়, আগের মতো নয়।’’ ‘‘ইন্দ্রিয়, তাদের বিষয় ও মন—এই তিনরূপ প্রকাশ পদার্থে ঘটে; অন্তর-বাহিরের বিভাজন মানুষের থেকেই আসে, যেমন সৎ ও অসৎ কর্মের পার্থক্য।’’ ‘‘প্রিয়, জীবেরা অবিরত জন্মায় ও লুপ্ত হয়; সময়ের অতি সূক্ষ্ম ও দ্রুতগামী শক্তির ফলে তা আমাদের চোখে পড়ে না।’’ ‘‘আগুনের শিখা, নদীর প্রবাহ, বৃক্ষের ফল—এইভাবে সব জীবের বয়স ও অবস্থাও স্থাপিত হয়।’’ এভাবেই, কৃষ্ণ ও বলরামের সঙ্গে রাখালবালকরা, গোপীদের ব্রত, গাছের দানশীলতা, জীবনের অর্থ ও সময়ের রহস্য নিয়ে দিন কাটাতে লাগল বৃন্দাবনের পবিত্র পরিবেশে।