ভগবতপুরাণের এই অংশে এক অনন্য কাহিনি প্রবাহিত হয়, যেখানে শ্রদ্ধা, ক্ষমা, ও ধর্মের গুরুত্ব ফুটে ওঠে। প্রথমে, সর্পের স্ত্রীরা পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের কাছে গভীর ভক্তিতে প্রার্থনা করেন। তারা বলেন, “হে পরম পুরুষ, মহাত্মা, সমস্ত জীবের আশ্রয়, সব কিছুর উৎস, অতীত ও সর্বোচ্চ আত্মা, আপনাকে আমাদের নমস্কার। আপনি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভাণ্ডার, অসীম শক্তির অধিকারী, গুণের বাইরে, অচঞ্চল ও অজাগতিক। আপনিই সময়ের উৎস, সময়ের বিভাজনের সাক্ষী, বিশ্বজগতের নির্মাতা ও কারণ। আপনি উপাদান, ইন্দ্রিয়, প্রাণ, মন, বুদ্ধি ও অন্তঃকরণরূপী আত্মা, যিনি অন্তরে অনুভূত হন, কিন্তু তিন গুণের পরিচয়ে গোপন আছেন। আপনিই অসীম, সূক্ষ্ম, অপরিবর্তনীয়, সর্বজ্ঞ, সমস্ত মতের ধারক, বাক্য ও মৌন শক্তির উৎস।” তারা আরও বলেন, “আপনি সমস্ত সত্য জ্ঞানের মূল, ঋষি, শাস্ত্রের উৎস, কর্ম ও ত্যাগের পথ, স্বয়ং বেদ; বারবার আপনাকে নমস্কার। কৃষ্ণ, রাম, বসুদেবপুত্র, প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ ও সাত্বতদের অধিপতি, আপনাকে নমস্কার। আপনি গুণের প্রদীপ, গুণে আচ্ছাদিত, গুণের কার্য দ্বারা উপলব্ধ, গুণের দ্রষ্টা ও অন্তঃসত্তা। আপনি অব্যক্তে ক্রীড়া করেন, প্রকাশ্যে সবকিছু পূর্ণ করেন, হৃষীকেশ, ঋষি ও মুনিরূপে আপনাকে নমস্কার। আপনি উচ্চ-নিম্ন পথের জ্ঞানী, সবকিছুর তত্ত্বদ্রষ্টা, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্যরূপে, সবকিছুর কারণ ও দ্রষ্টা। আপনি গুণে অনাসক্ত হয়েও জগতের জন্ম, স্থিতি ও বিনাশের অধিষ্ঠাতা, সময়ের শক্তি ধারণ করেন, জীবের স্বভাব জাগিয়ে তুলেন, আপনার অপরাজেয় দৃষ্টিতে লীলায় মগ্ন থাকেন।” তারা বলেন, “তিন জগতে আপনার নানা রূপ—কেউ শান্ত, কেউ অশান্ত, কেউ মোহময়—সবই আপনার প্রিয়, তবে শান্তরূপ বিশেষ প্রিয়। এখন আপনি ধর্ম রক্ষায় সৎজনদের রক্ষা করতে চেয়েছেন। শাসকের উচিত নিজের অধীনদের অপরাধ সহ্য করা; অজ্ঞানে কৃত অপরাধ ক্ষমা করা উচিত। হে প্রভু, আমাদের দয়া করুন, কারণ সর্প মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে; স্বামীই আমাদের প্রাণ—দয়াযোগ্য—তাকে ফিরিয়ে দিন। আমাদের কী করতে হবে বলুন, যাতে বিশ্বাসসহ পালন করে আমরা সব ভয় থেকে মুক্তি পাই।” শুকদেব বলেন, সর্পের স্ত্রীরা এভাবে কৃষ্ণের প্রশংসা করলে, তিনি অচেতন, মাথা ভাঙা সর্পকে তাঁর পা থেকে মুক্ত করেন। কালীযা ফিরে পান চেতনা ও প্রাণ, ধীরে হরি’র দিকে তাকান, দুর্বল, কষ্টে, হাত জোড় করে কৃষ্ণকে বলেন, “আমরা জন্ম থেকে কুটিল, অন্ধকারে আচ্ছন্ন, দীর্ঘদিনের ক্রোধে আক্রান্ত; এই স্বভাব ত্যাগ কঠিন, কারণ এটি সকল জীবের মিথ্যা ধারণা। আপনি, হে স্রষ্টা, গুণ-বিভাজনসহ এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন; নানা স্বভাব, শক্তি, রূপ, বীজ ও প্রবৃত্তি আপনিই দেন। আমাদের মধ্যে, সর্পেরা, প্রচণ্ড ক্রোধ নিয়ে জন্মাই; আপনার মায়া ত্যাগ কঠিন, আমরা নিজেই তাতে বিভ্রান্ত। আপনি সব কিছুর কারণ, সর্বজ্ঞ, বিশ্বপতি; আপনি দয়া বা শাস্তি যা ঠিক মনে করেন, আমাদের ওপর করুন।” শুকদেব বলেন, কৃষ্ণ মানবরূপে উত্তর দেন, “হে সর্প, এখানে থাকো না; বিলম্ব না করে সমুদ্রের দ্বীপে যাও। এই নদী গরু, মানুষ, তোমার আত্মীয়, সন্তান ও স্ত্রীদের জন্য ছাড়ো। যে মানুষ আমার এই নির্দেশ স্মরণ করে, সকাল-সন্ধ্যায় পাঠ করে, সে তোমার ভয় থেকে মুক্ত থাকবে। যে এখানে স্নান করে, দেবতা ও অন্যদের জল দেয়, উপবাস করে, আমাকে স্মরণ করে পূজা করে, সে সব পাপ থেকে মুক্ত হবে। তুমি রমনক দ্বীপ ছেড়ে এই হ্রদে আশ্রয় নিয়েছ; সুপর্ণ তোমাকে খায়নি, কারণ তুমি আমার পদচিহ্ন বহন কর।” শুকদেব বলেন, কৃষ্ণের এই বিস্ময়কর কথা শুনে, সর্পের স্ত্রীরা আনন্দ ও শ্রদ্ধায় কৃষ্ণকে পূজা করেন। তারা দেবীয় বস্ত্র, মালা, রত্ন, অলংকার, সুগন্ধি মলয়, ও বৃহৎ পদ্মমালা দিয়ে তাঁকে সম্মান জানান। তাঁরা বিশ্বপতি, গরুড়ধ্বজ কৃষ্ণকে পূজা করে, প্রদক্ষিণ ও নমস্কার করেন। কালীযা তাঁর স্ত্রী, বন্ধু, সন্তানদের নিয়ে সমুদ্রের দ্বীপে চলে যান; তখন যমুনা বিষমুক্ত হয়ে যায়, মানবরূপী লীলাবান কৃষ্ণের কৃপায়। কালীযা কৃষ্ণকে ধূপ, সুগন্ধি ও নানা উপচার দিয়ে দ্বাদশাক্ষর মন্ত্রে পূজা করেন। পরবর্তী অধ্যায়ে, সুত বলেন, সেই স্থানে রাজা দেখেন, এক গরু ও বলদকে নির্যাতন করা হচ্ছে, যেন তারা অসহায়; তিনি দেখেন, এক শূদ্র, রাজবংশের কলঙ্ক, হাতে গদা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাজা দেখেন, বলদ, পদ্মের ডাঁটির মতো শুভ্র, ভয়ে কাঁপছে, যেন মূত্রত্যাগ করছে, এক পায়ে দাঁড়িয়ে, শূদ্রের আঘাতে দুর্বল। তিনি দেখেন, গরুটি, যা একসময় উষ্ণ দুধ দিত, এখন অত্যন্ত কষ্টে, শূদ্রের পায়ের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত, বাছুর থেকে বিচ্ছিন্ন, চোখে জল, দেহে ক্ষীণ, ঘাসের জন্য আকুল। রাজা সোনার অলংকারে সজ্জিত রথে চড়ে, বজ্রের মতো গম্ভীর কণ্ঠে, ধনুক উঁচু করে প্রশ্ন করেন, “তুমি কে, আমার রাজ্যে, আমার আশ্রয়ে, দুর্বলকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দিচ্ছো? রাজা হয়েও তোমার আচরণ অভিনেতার মতো, দ্বিজ নয়। তুমি, নিরীহকে গোপনে আঘাত করেছ, মৃত্যুদণ্ডের যোগ্য, কারণ কৃষ্ণ ও গাণ্ডীবধারী দূরে চলে গেছেন। অথবা তুমি, পদ্মের ডাঁটির মতো শুভ্র, কম পায়ে হাঁটছ, দেবতা বলদরূপে আমাদের দুঃখ দিচ্ছো? কৌরবদের শক্ত বাহুতে পৃথিবী আবৃত থাকলে, কখনও জীবেরা দুঃখ পায়নি, শুধু তোমার দ্বারা। হে সুরভীর কন্যা, এখানে দুঃখ করো না; শূদ্রের ভয় ত্যাগ করো, কাঁদো না মা, শুভ হোক; আমি দুষ্টদের শাস্তিদাতা। যে রাজার রাজ্যে সকল প্রজা দুষ্ট ও সজ্জনের দ্বারা কষ্ট পায়, সেই মাতাল শাসক তার কীর্তি, আয়ু, সৌভাগ্য ও পথ হারায়।” এভাবেই কাহিনি প্রবাহিত হয়, যেখানে ভক্তি, ক্ষমা, ধর্মরক্ষা ও ন্যায়বিচারের মহিমা প্রকাশিত হয়।