ধর্ম এবং পৃথিবী একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে কথা বলছিলেন। ধর্ম বললেন, ‘‘তোমার মধ্যে সত্য, পবিত্রতা, করুণা, ক্ষমা, ত্যাগ, সন্তুষ্টি, সরলতা, শান্তি, আত্মসংযম, তপস্যা, সমতা, সহনশীলতা, সংযম এবং বিদ্যা—এই সব গুণ সর্বদাই বিরাজমান।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘জ্ঞান, বৈরাগ্য, কর্তৃত্ব, বীরত্ব, দীপ্তি, শক্তি, স্মৃতি, স্বাধীনতা, দক্ষতা, সৌন্দর্য, সাহস এবং নম্রতা—তোমার মধ্যে সবই আছে।’’ ‘‘তুমি সাহসী, বিনয়ী, সদাচারী, সহনশীল, উদ্যমী, শক্তিশালী, সমৃদ্ধ, গভীর, স্থির, বিশ্বাসী, প্রসিদ্ধ, সম্মানিত এবং অহংকারহীন। এই সব মহান গুণাবলী ও আরও অনেক গুণ তোমার মধ্যে চিরকাল বিরাজ করে; যাঁরা মহত্ত্ব কামনা করেন, তাঁরা এগুলির সন্ধান করেন, কারণ এগুলি কখনও তোমার মধ্যে ক্ষয় হয় না।’’ ধর্মের কণ্ঠে ভারাক্রান্ততা প্রকাশ পেল, ‘‘তাই আমি এখন পৃথিবীর জন্য শোক করছি, কারণ শ্রীনিবাসের উপস্থিতি নেই, যিনি সকল গুণের আধার; কলির পাপদৃষ্টিতে পৃথিবী কষ্ট পাচ্ছে। আমি নিজেকেও শোক করছি, তোমার জন্যও—শ্রেষ্ঠ রাজাদের মধ্যে তুমি, দেবতা, পূর্বপুরুষ, ঋষি, সকল সদাচারী, সমাজের সকল শ্রেণী ও আশ্রমের জন্যও।’’ তিনি স্মরণ করলেন, ‘‘ব্রহ্মা ও অন্যান্য দেবতারা, তাঁর এক চাউনি পাওয়ার আশায়, কঠোর তপস্যা করেছিলেন, তাঁকে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। অথচ সেই শ্রীদেবী, নিজস্ব পদ্মবন ত্যাগ করে, প্রেমের সঙ্গে তাঁর পদধূলি পূজা করেন, যা শুভ চিহ্নে অলংকৃত।’’ পৃথিবী বললেন, ‘‘আমি তাঁর পদচিহ্নে অলংকৃত হয়েছিলাম—পদ্ম, বজ্র, অঙ্কুশ, পতাকা ও অন্যান্য চিহ্নে। এত মহিমা অর্জন করেও, আমি তাঁর অনুগ্রহ পেলাম না; শেষে তিনি আমাকে ত্যাগ করলেন, এবং পৃথিবীর বাসিন্দারাও আমাকে অবজ্ঞা করল।’’ তিনি স্মরণ করলেন, ‘‘তিনি স্বীয় শক্তিতে পৃথিবীর অসহনীয় বোঝা—অসুরদের শত শত সেনা—দূর করেছিলেন। তোমাকে, যদিও তোমার অবস্থান দুর্বল ও ক্ষীণ ছিল, নিজ শক্তিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এবং যাদব বংশকে আনন্দিত করেছিলেন, তাঁদের মনোমুগ্ধকর রূপ ধারণ করে।’’ ‘‘কে পারবে সেই পরম পুরুষের বিচ্ছেদ সহ্য করতে? তাঁর প্রেমময় দৃষ্টি, উজ্জ্বল হাসি, মধুর কথা এমনকি মৌমাছিদেরও স্থিরতা কেড়ে নেয়; তাঁর পদধূলির শুভ চিহ্নে আমার সত্তা আনন্দিত হয়।’’ এইভাবে যখন ধর্ম ও পৃথিবী আলাপ করছিলেন, ঠিক তখনই রাজর্ষি পারীক্ষিত পূর্ব দিকের সরস্বতী নদীর তীরে এসে পৌঁছালেন। তাঁর আগমন উপলক্ষে সবাই প্রণাম জানালেন, ‘‘আপনাকে প্রণাম, পরম পুরুষ, মহাত্মা, সকল জীবের আশ্রয়, সকলের উৎস, সর্বোচ্চ, পরম আত্মা।’’ তাঁকে অভিবাদন জানানো হল, ‘‘আপনি জ্ঞান ও বুদ্ধির ভাণ্ডার, নিরাকার, অসীম শক্তির অধিকারী, গুণাতীত, অপরিবর্তনীয়, জাগতিক নন।’’ ‘‘আপনি সময়, সময়ের উৎস, সময়ের বিভাজনের সাক্ষী, স্বয়ং বিশ্ব, সকলের তত্ত্বাবধায়ক, সৃষ্টিকর্তা ও কারণ।’’ ‘‘আপনি উপাদান, ইন্দ্রিয়, প্রাণ, মন, বুদ্ধি ও অন্তঃকরণের আত্মা, যিনি অন্তরে উপলব্ধি হন, অথচ তিন গুণের সঙ্গে পরিচয় ঢেকে রাখেন—আপনাকে প্রণাম।’’ ‘‘আপনি অসীম, সূক্ষ্ম, অপরিবর্তনীয়, সর্বজ্ঞ, সকল মতকে ধারণ করেন, এবং কথিত ও অকথিতের শক্তি।’’ ‘‘আপনি সকল প্রমাণিত জ্ঞানের মূল, ঋষি, শাস্ত্রের উৎস, কর্ম ও ত্যাগের পথ, স্বয়ং বেদ—বারবার আপনাকে প্রণাম।’’ ‘‘আপনাকে প্রণাম, কৃষ্ণ, রাম, বসুদেবের পুত্র, প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ, সাত্বতদের অধিপতি।’’ ‘‘আপনি গুণের প্রদীপ, গুণে নিজেকে আচ্ছাদিত করেন, গুণের কার্যে উপলব্ধি হন, গুণের দ্রষ্টা, অন্তঃসত্তা—আপনাকে প্রণাম।’’ ‘‘অপ্রকাশ্যে খেলেন, প্রকাশ্যকে পূর্ণ করেন, হৃষীকেশ, ঋষি, মুনি—আপনাকে প্রণাম।’’ ‘‘আপনি উচ্চ ও নিম্নের পথ জানেন, সকলের তত্ত্বাবধায়ক, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য, সব কিছুর দ্রষ্টা ও কারণ—আপনাকে প্রণাম।’’ ‘‘আপনি গুণে অনাসক্ত থেকেও, জন্ম, অবস্থান, ও বিলয় নিয়ন্ত্রণ করেন, সময়ের শক্তি ধারণ করেন, জীবদের নানা স্বভাব জাগিয়ে তোলেন, আপনার অনিবার্য দৃষ্টিতে লীলা করেন।’’ ‘‘এই তিন বিশ্বে আপনার দেহ—কিছু শান্ত, কিছু অশান্ত, কিছু মোহ থেকে জন্ম নেয়—আপনার প্রিয়। শান্ত দেহগুলি বিশেষভাবে আপনার কাছে প্রিয়, কারণ এখন আপনি ধর্ম রক্ষার জন্য সদাচারীদের সুরক্ষা করছেন।’’ ‘‘নিজের অধীনস্থের একটিমাত্র অপরাধ সহ্য করা উচিত; যারা অজ্ঞতায় আচরণ করেছে, তাদের ক্ষমা করা উচিত, শান্ত মনে।’’ ‘‘আমাদের ওপর করুণা করুন, প্রভু; সাপটি তার প্রাণ ত্যাগ করছে; স্বামী—যিনি আমাদের জীবনের উৎস, দুঃখী ও করুণার যোগ্য—তাঁকে আমাদের ফিরিয়ে দিন।’’ ‘‘আপনার দাসীরা কী করবে, আদেশ দিন; বিশ্বাসের সঙ্গে পালন করলে সকল ভয় থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।’’ শুকদেব বললেন, ‘‘সাপের স্ত্রীদের এই প্রশংসায়, প্রভু কৃষ্ণ অজ্ঞান, মাথা ভাঙ্গা সাপটিকে তাঁর পদদণ্ড থেকে মুক্ত করলেন।’’ সাপটি চেতনা ও প্রাণ ফিরে পেয়ে, ধীরে ধীরে হরি-কে দেখল; শ্বাস নিতে কষ্টে, দুর্বল ও ব্যথিত অবস্থায়, সে কৃষ্ণকে হাতজোড় করে বলল, ‘‘আমরা জন্মগতভাবে দুষ্ট, অন্ধকার ও দীর্ঘস্থায়ী রাগে আচ্ছন্ন; প্রভু, এই স্বভাব ত্যাগ করা কঠিন, কারণ এটা সকল জীবের মিথ্যা ধারণা।’’ ‘‘আপনি, সৃষ্টিকর্তা, এই বিশ্ব গুণ বিভাজন করে সৃষ্টি করেছেন; নানা স্বভাব, শক্তি, রূপ, বীজ ও প্রবৃত্তি আপনার থেকেই উদ্ভূত।’’ ‘‘আমরা সাপেরা, স্বভাবতই প্রচণ্ড রাগ নিয়ে জন্মেছি; আপনার মায়া ত্যাগ করা কঠিন, আমরা নিজেই এতে বিভ্রান্ত।’’ ‘‘আপনি এ সব কিছুর কারণ, সর্বজ্ঞ, বিশ্ব-নাথ; দয়া বা শাস্তি যেটা ঠিক মনে করেন, আমাদের ওপর করুন।’’ শুকদেব বললেন, ‘‘এই কথা শুনে, মানবরূপে কৃষ্ণ বললেন, ‘তুমি এখানে থাকতে পারবে না, সাপ; বিলম্ব না করে সাগরে চলে যাও। এই নদী গরু, মানুষ ও তোমার আত্মীয়, সন্তান ও স্ত্রীদের জন্য রেখে দাও।’’ ‘‘যে মানুষ আমার এই আদেশ স্মরণ করবে এবং দু’বার সন্ধ্যায় পাঠ করবে, সে তোমার ভয় পাবে না।’’ ‘‘যে এখানে স্নান করবে, যেখানে আমি খেলেছি, দেবতা ও অন্যদের জল দেবে, তারপর উপবাস ও আমার পূজা করবে, আমাকে স্মরণ করবে, সে সমস্ত পাপ থেকে মুক্তি পাবে।’’ ‘‘তুমি রামানক দ্বীপ ছেড়ে এই হ্রদে আশ্রয় নিয়েছিলে, সুপর্ণ তোমাকে খায়নি, কারণ তুমি আমার পদচিহ্ন ধারণ করো।’’ শুকদেব বললেন, ‘‘কৃষ্ণের এই আশ্চর্য কর্ম শুনে, সাপের স্ত্রীগণ আনন্দ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে কৃষ্ণকে পূজা করলেন।’’ ‘‘তারা তাঁকে দেবীয় বস্ত্র, মালা, মূল্যবান রত্ন ও অলংকার, সুগন্ধি লেপন এবং বিশাল পদ্মমালা দিয়ে সম্মান জানালেন।’’ ‘‘বিশ্বের প্রভুকে পূজা করে, গরুড়-ধ্বজ কৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করলেন, তাঁকে পরিক্রমা করে বিনয়ের সঙ্গে প্রণাম জানালেন।’’ ‘‘সকল স্ত্রী, বন্ধু ও পুত্রদের নিয়ে, সাপটি সাগরের দ্বীপে চলে গেল; সেই মুহূর্তে যমুনা নদী কৃষ্ণের মানবরূপী লীলায় বিষমুক্ত হয়ে গেল।’’ এইভাবে ধর্ম, পৃথিবী, রাজর্ষি পারীক্ষিত, কৃষ্ণ, এবং কালীসহ সকলের কথোপকথন ও ঘটনাবলী, শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের এই অধ্যায়ে একত্রে প্রকাশিত হলো।