একদিন, মহান ধন্বন্তরি আচার্য্য সুশ্রুতকে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত গূঢ় জ্ঞান প্রদান করছিলেন। তিনি বললেন, “তুমি শুনো, শরীর ও মন সুস্থ রাখার জন্য নানা উপায় আছে। যেমন, প্রচুর জল বা দুধে সিদ্ধ ভাত, কিংবা শুধু গরম জলে রান্না করা ভাত, তৃষ্ণা নিবারণ করে। আবার কেউ চাইলে মুখে মুস্তা ও গুড়ের ট্যাবলেট রাখতে পারে। বার্লি দিয়ে তৈরি নানা খাবার, পিঠে, শুকনো মূল ও পটোল, বেতের ডগা ইত্যাদি সবজিও শরীরের জড়তা দূর করে। মুগ, অড়হর, মাসুর ডাল, তিল, বন্য পশুর মাংসের রস, সিঁধে, ঘি, আঙ্গুর, শুকনো আদা, আমলকি, ও কলা—এইসব উপাদান ব্যবহার করা উচিত। পুরনো গম, বার্লি ও চালের স্যুপ খেতে হবে। যাদের শরীরে ‘এরিসিপেলাস’ রোগ আছে, তাদের জন্য তিল, মধু, আঙ্গুর ও ডালিম দিয়ে তৈরি মিষ্টান্ন খুব উপকারী। লাল আখ, গম, বার্লি ও মুগ—এগুলি হালকা খাবার। কাকামারি, বেতের ডগা, বস্তুকা ও সুবর্চলা এগুলিও। বাত ও রক্তের রোগ দূর করতে মধু মিশ্রিত জল ভালো। দুর্বা ঘাস দিয়ে তৈরি ঘি অসাধ্য রোগে উপকারী। ভৃঙ্গরাজ বা আমলকার রস দিয়ে তৈরি তেল নাসারোগে ও মাথার পরজীবীজনিত রোগে ব্যবহার করা উচিত। ঠান্ডা জল, ঠান্ডা খাবার ও পানীয়, তিল খাওয়া—দ্বিজদের মধ্যে অলসতা সৃষ্টি করে, তবে তৃপ্তিও দেয়। তিলের তেল দিয়ে কুলকুচি করলে দ্বিজদের অলসতা আরও বাড়ে। অন্ত্রের কীটনাশক হিসেবে বিরঙ্গা চূর্ণ ও গোমূত্র খুব কার্যকর। আমলকি ও ঘি দিয়ে তৈরি প্রলেপ মাথার জন্য শ্রেষ্ঠ। মাথার রোগ দূর করতে উষ্ণ ও তৈলাক্ত খাবারও উপকারী। কানব্যথা দূর করতে উটের তেল বা মূত্র, এবং মুক্তাগুলি কান ভর্তি করার জন্য ব্যবহার করা যায়। পর্বত মাটি, চন্দন, লক্ষ ও জুঁইয়ের কুঁড়ি দিয়ে তৈরি প্রলেপ বীর্যঘাত দূর করে। ত্রিফলা ও ব্যোশা, টুচ্ছক ও জল দিয়ে তৈরি মিশ্রণ, এবং রসাঞ্জন—সব চোখের রোগে উপকারী। ঘি পাথরে ভেজে, লোধ্রা, টক জল ও সিঁধে মিশিয়ে চোখ ধোয়া ও চিকিৎসায় ব্যবহার করতে হবে। পর্বত মাটি ও চন্দনের প্রলেপ চোখে লাগাতে হবে; চোখের রোগ প্রতিরোধে ত্রিফলা সর্বদা ব্যবহার করা উচিত। রাতে দীর্ঘায়ু কামনা করলে মধু ও ঘি খেতে হয়। শতাবরি রস দুধ ও ঘি দিয়ে তৈরি করলে প্রাণবর্ধক হয়। কালম্বিকা ও মাসকলাই দুধ-ঘি দিয়ে তৈরি করলে শক্তি বাড়ে। ত্রিফলা ও যষ্টিমধু দীর্ঘায়ুর জন্য উপকারী। যষ্টিমধু ও অন্যান্য রস চুল পাকা রোধ করে এবং শক্তি দেয়; ভাচা দিয়ে তৈরি ঘি ভূত-প্রেতজনিত দোষ দূর করে। কবিতা বুদ্ধি বাড়ায় ও সব কাজ সিদ্ধ করে; ভলা ও কাল্ককষায় দিয়ে তৈরি মলম মালিশে উপকারী। রসনা ও সহচরার তেল বাতজনিত রোগে ব্যবহার করতে হয়। যে খাবার শরীরে বাধা সৃষ্টি করে না, তা ক্ষত নিরাময়ে প্রশংসিত। শাক্তু পিঠে ও টক খাবার হজমে উপকারী; ক্ষত ও তাদের নিরাময়ে নিমের গুঁড়া ভালো। শুদ্ধি ও বিশেষ যজ্ঞ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; প্রসূত নারীর সুরক্ষা সব জীবের জন্য কল্যাণকর। সাপের কামড়ে নিমপাতা খেতে হয়; তাল ও নিমপাতা, পুরনো তেল, বার্লি ও ঘি দিয়ে তৈরি প্রলেপও উপকারী। বিছে দংশনে ময়ূরের পালকের ঘি দিয়ে ধূপ, অথবা অর্কের দুধ, পদ্মবীজ ও পলাশবীজের প্রলেপ লাগাতে হয়। বিছের বিষে কালো নিশিন্দা বা শিব গাছের ফল, অর্ক দুধ, তেল, মাটি ও গুড়ের সমান অংশ মিশিয়ে ব্যবহার করতে হয়। পাগলা কুকুরের বিষ দূর করতে তান্ডুলিয়া মূল ও ত্রিভৃত সমান অংশ ঘি দিয়ে পান করলে দ্রুত উপকার হয়। সাপ ও পোকামাকড়ের সবচেয়ে বিষাক্ত বিষও চন্দন, পদ্মকা, কুষ্ট, তাল, উশিরা ও পাতলা দিয়ে দ্রুত নাশ হয়। নিরগুন্ডি, শরিভা, সেলু ও লুতা বিষের প্রতিকার; মাথা পরিষ্কারে গুড় ও নাগরা ভালো। অভ্যন্তরীণ তৈলবাতি ও এনিমাতে শ্রেষ্ঠ তেল ও ঘি ব্যবহার করতে হয়; আগুনে তীব্র সেঁক উপকারী; ঠান্ডা জল শ্রেষ্ঠ সংকোচক। ত্রিভৃত শ্রেষ্ঠ পিচ্ছিলকরণে, মদন বমনকারক; এনিমা, পিচ্ছিলকরণ, বমন, তেল, ঘি ও মধু প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে হয়। বাত, পিত্ত, কফের বিকারে এসবই শ্রেষ্ঠ ও সঠিক ক্রমে ব্যবহারযোগ্য। এরপর ধন্বন্তরি বলেন, “রোগ চার প্রকার—শরীরগত, মানসিক, বাহ্যিক ও জন্মগত। শরীরগত রোগে জ্বর ও চর্মরোগ পড়ে; রাগ ইত্যাদি মানসিক রোগ সৃষ্টি করে। বাহ্যিক রোগ চোট থেকে হয়; জন্মগত রোগে ক্ষুধা ও বার্ধক্য পড়ে। শরীর ও বাহ্যিক রোগ দূর করতে রবিবারে ঘি ও গুড় দান করতে হয়। সোনার সঙ্গে লবণযুক্ত ভাতের পিঠে ব্রাহ্মণকে দান করতে হয়; চন্দ্রের দিনে ব্রাহ্মণকে অভিষেক করলে সব রোগ মুক্তি হয়। শনির দিনে তেল দান করতে হয়; অশ্বিনী দিনে গরুর দুধ ও ভাত দান করতে হয়। গhee ও দুধ দিয়ে মূর্তি স্নান করালে রোগ মুক্তি হয়। দার্ভা ঘাস তিনটি মিষ্টি পদার্থে ভিজিয়ে গায়ত্রী পাঠ করে অগ্নিতে আহুতি দিতে হয়; রোগ যেখানে হয়েছে, সেখানে স্নান ও অর্ঘ্য প্রদান করতে হয়। মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্টে বিষ্ণুর স্তব উপকারী। এখন তুমি শুনো, বাত, পিত্ত, কফ ও শরীরের ধাতু সম্পর্কে। খাওয়া ও হজম হওয়া খাবার—সুশ্রুত—পেটে দুই ভাগে বিভক্ত হয়: একটি ভাগ অপচয়, অন্যটি সার। অপচয় থেকে মল, মূত্র, ঘাম, নাক, কান ও অন্যান্য শরীরের অপদ্রব্য তৈরি হয়। সার থেকে রস উৎপন্ন হয়, রস থেকে রক্ত, রক্ত থেকে মাংস, মাংস থেকে চর্বি, চর্বি থেকে অস্থি সৃষ্টি হয়।” এভাবে ধন্বন্তরি আচার্য্য সুশ্রুতকে স্বাস্থ্য, রোগ, চিকিৎসা ও উপাচার সংক্রান্ত গূঢ় জ্ঞান উপহার দিলেন, যা আজও সনাতন ধর্মের শ্রদ্ধাভাজন ও অনুসরণীয়।