রাক্ষস তখন প্রবল ক্রোধে জ্বলতে জ্বলতে বলল, ‘‘তুমি সত্য কথা প্রকাশ করো, কারণ আমি এখনই এই মুনিবাস থেকে তাঁকে নিয়ে যেতে চাই। আমার হৃদয় যেন রাগে দাউ দাউ করে পুড়ে যাচ্ছে। যদি ভৃগু আমার প্রাক্তন পত্নীকে আমার অনুমতি ছাড়া নিয়ে থাকে, তবে আজই আমি তাঁকে এখান থেকে নিয়ে যাবো।’’ এইভাবে সেই অসুর বারবার দীপ্তিমান জাঠবেদা অগ্নিকে প্রশ্ন করতে লাগল, সন্দেহ করতে লাগল—তিনি কি সত্যিই ভৃগুর পত্নী? সে বলল, ‘‘হে অগ্নি, তুমি তো সকল জীবের অন্তরে বাস করো; পাপ-পুণ্যের সাক্ষী; জ্ঞানী, তুমি সত্য কথা বলো। যদি ভৃগু আমার পূর্বের পত্নীকে অন্যায়ভাবে নিয়ে থাকে, তবে তুমি আমাকে সত্য জানাও।’’ রাক্ষস আবার বলল, ‘‘তুমি যদি আমায় জানাও, তিনি ভৃগুর পত্নী—তবে আমি তাঁকে এখান থেকে নিয়ে যাবো। হে জাঠবেদা, তোমার যা ঠিক মনে হয়, তাই সত্য কথা বলো।’’ এই কথা শুনে সপ্তজিহ্বা অগ্নি দুঃখিত হলেন। তিনি ভাবলেন, ‘‘আমি যদি সত্য বলি, তবে ব্রহ্মজ্ঞ ভৃগুর অভিশাপে পড়তে পারি। আর যদি মিথ্যা বলি, তবে অবশ্যই নরকে পড়তে হবে।’’ এই দুই ভয়ে তিনি শান্তভাবে বললেন, ‘‘তিনি ভৃগুরই পত্নী।’’ অগ্নি তখন বললেন, ‘‘হে দানবপুত্র, তুমি অবশ্যই পূর্বে পুলোমার কন্যাকে বেছে নিয়েছিলে, কিন্তু নিয়মমাফিক বিধি ও মন্ত্রে কি তাঁকে গ্রহণ করেছিলে? পুলোমার কন্যাকে তাঁর পিতা মহর্ষি ভৃগুকে দিয়েছিলেন, তোমাকে দেননি; কারণ তিনি ভালো পাত্র ভেবে ভৃগুকে বরণ করেছিলেন।’’ ‘‘পরে বৈদিক নিয়মে, যথাযথ আচার-অনুষ্ঠান করে ভৃগু ঋষি তাঁকে পত্নীরূপে গ্রহণ করেন, আর আমি অগ্নি—সেই ঘটনার সাক্ষী ছিলাম। এটাই আমি জানি সত্য; আমি মিথ্যা বলার শক্তি পাই না, কারণ এই জগতে সর্বদা সত্যই শ্রেষ্ঠ।’’ অগ্নির এই কথা শুনে সেই রাক্ষসী ভৃগুপত্নীকে ছেড়ে দিল। সে ব্রাহ্মণের রূপ ধারণ করে, চিন্তার ও বায়ুর গতিতে সেখান থেকে চলে গেল। তখন ভৃগুর পত্নী পুলোমার গর্ভে যে সন্তান ছিল, সে ক্রোধে মাতার গর্ভ থেকে পড়ে গেল; এই জন্য তার নাম হয় চ্যবন। চ্যবন, সূর্যের মতো দীপ্তিমান, মাতার গর্ভ থেকে পতিত হতে দেখে সেই রাক্ষস ভস্মীভূত হয়ে পড়ল এবং পুলোমা মুক্তি পেলেন। পুলোমা, শোকাকুল হয়ে, তার পুত্র চ্যবনকে তুলে নিয়ে পালিয়ে গেলেন। তখন স্বয়ং ব্রহ্মা, সর্বজগতের পিতামহ, ভৃগুর নিষ্পাপ পত্নীকে কাঁদতে দেখে তাঁর কাছে এলেন। তার দু’চোখ অশ্রুতে ভরা। পিতামহ ব্রহ্মা তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন, আর তার অশ্রু থেকে এক মহানদী উৎপন্ন হলো। ভৃগুপত্নীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেই নদী প্রবাহিত হতে লাগল। তার এই গতিপথ দেখে সেই নদী স্থায়ী হয়ে গেল। তখন ব্রহ্মা সেই নদীর নাম রাখলেন ‘বধূসরা’, কারণ সে চ্যবনের আশ্রমের দিকে প্রবাহিত হচ্ছিল। এইভাবে ভৃগুর মহাপুত্র চ্যবনের জন্ম হলো। পরে ভৃগু সেখানে এসে তার পুত্র চ্যবন এবং দীপ্তিমান পত্নীকে দেখলেন। ভৃগু ক্রুদ্ধ হয়ে তার পত্নী পুলোমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কোন ব্যক্তি তোমাকে সেই রাক্ষসের কাছে প্রকাশ করল, যে তোমাকে হরণ করতে চেয়েছিল? সে তো জানত না তুমি আমার পত্নী। আজ আমি তাকে অভিশাপ দিতে চাই, তাই সত্য কথা বলো—কার দ্বারা এই অন্যায় ঘটেছে?’’ পুলোমা বললেন, ‘‘হে ভৃগু, আমাকে সেই রাক্ষসের কাছে প্রকাশ করেছিলেন অগ্নিদেব। তারপর সেই রাক্ষস আমাকে কাঁদতে কাঁদতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তোমার পুত্রের দীপ্তিতে সে ভস্মীভূত হয়ে পড়ে, আমায় মুক্তি দেয়।’’ পুলোমার এই কথা শুনে ভৃগু প্রবল ক্রোধে অগ্নিকে অভিশাপ দিলেন—‘‘তুমি সর্বগ্রাসী হয়ে উঠবে!’’ ভৃগুর অভিশাপে অগ্নি ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, ‘‘হে ব্রাহ্মণ, কেন তুমি আমার ওপর এই অন্যায় করেছ? আমি তো ধর্মমতে চলি, সর্বদা সত্য বলি; আমাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, আমি সত্যই বলেছি—এতে আমার দোষ কোথায়? ‘‘যে সাক্ষী সত্য জেনে মিথ্যা বলে, সে তার সাত পুরুষ এবং সাত উত্তরপুরুষকে নষ্ট করে ফেলে। আর যে সত্য জানে, কিন্তু ন্যায়ের জন্য মুখ খোলে না, সেও সেই পাপের ভাগী—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’’ ‘‘আমি চাইলে তোমাকেও অভিশাপ দিতে পারি, কিন্তু ব্রাহ্মণদের আমি সম্মান করি। তাই, হে মহর্ষি, আমি যা জানি, তা-ই বলছি—শোনো।’’ ‘‘যোগবলেই আমি নানা রূপ ধারণ করি; আমি অগ্নিহোত্র, যজ্ঞ, এবং নানা আচার-অনুষ্ঠানে বিরাজমান। বৈদিক নিয়মে, আমার মধ্যে যা কিছু আহুতি দেওয়া হয়, দেবতা ও পিতরগণ তাতে তৃপ্ত হন।’’ ‘‘জল—এটাই দেবতাদের আধার, আবার জলই পিতরদের আধার; দর্শ ও পূর্ণিমা যজ্ঞে দেবতা ও পিতর উভয়েরই পূজা হয়। এইভাবে দেবতা ও পিতর, কখনো একত্রে, কখনো পৃথকভাবে, নির্দিষ্ট সময়ে পূজিত হন।’’ ‘‘যা কিছু আমার মধ্যে আহুতি দেওয়া হয়, দেবতা ও পিতর উভয়েই তা গ্রহণ করেন; আমিই তাঁদের মুখ বলে বিবেচিত। অমাবস্যায় পিতরগণ, পূর্ণিমায় দেবতারা আমার মুখ দিয়ে আহুতি গ্রহণ করেন।’’ ‘‘এখন বলো, আমি যদি সর্বগ্রাসী হয়ে যাই, তবে কিভাবে দেবতা ও পিতরদের মুখ হবো?’’ ‘‘দ্বিজদের অগ্নিহোত্র ও যজ্ঞ-অনুষ্ঠানে, যদি ‘ওম’, ‘বষট’, ‘স্বাহা’, ‘স্বধা’ না উচ্চারিত হয়, আর অগ্নি না থাকে, তবে সকল প্রাণী অত্যন্ত কষ্টে পড়ে। তখন ঋষিরা দুঃখিত হয়ে দেবতাদের কাছে গিয়ে বললেন...