ভীমসেন তখন হিডিম্বীর প্রস্তাবে শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘‘এ আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, যিনি সর্বাধিক সম্মান ও শ্রদ্ধার যোগ্য; তিনি যখন উপস্থিত, তখন তাঁর সম্মুখে আমি কখনো শিষ্টাচার বিরুদ্ধ কিছু করতে পারি না। হে শক্তিশালী রাক্ষসী, আজকের দিনে কে-ই বা মাতা, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, কনিষ্ঠ ভ্রাতা কিংবা অন্য স্বজনদের পরিত্যাগ করতে পারে? কামনায় আবিষ্ট হয়ে, কে-ই বা আমার মতো ঘুমন্ত ভ্রাতাদের রাক্ষসের খাদ্য হতে ফেলে রেখে, মাকেও ত্যাগ করবে? শত্রুদলনকারী, আমি কেবল তোমাকে ও আমার মাকে রক্ষা করব—ভ্রাতাদের ছেড়ে দিও না, আমার ঊরুতে উঠে বসো।’’ ভীম আবার বললেন, ‘‘ভ্রাতাদের ত্যাগ করে আমি বাঁচার আশা করি না, হে রাক্ষসী। তুমি যা খুশি তাই করো, কারণ তোমার কথা আমার কাছে অপ্রিয়। তুমি যা চাও, তাই আমি করব; সবাইকে জাগিয়ে দাও, আমি নিশ্চয়ই তাদের রাক্ষসের হাত থেকে উদ্ধার করব।’’ তবু ভীম দৃঢ়ভাবে বললেন, ‘‘হে রাক্ষসী, তোমার কুটিলপ্রাণ ভ্রাতার ভয়ে আমি ঘুমন্ত ভ্রাতাদের ও মাকে জাগাব না। হে ভীতু সুন্দরী, রাক্ষস, মানুষ, গন্ধর্ব বা যক্ষ—কেউই আমার শক্তির সামনে টিকতে পারবে না। তুমি চাও গেলে যাও, না-চাইলে থাকো, কিংবা তোমার সেই মানুষখেকো ভ্রাতাকে পাঠাও।’’ এদিকে, হিডিম্বা রাক্ষসরাজ বুঝতে পারল তার বোন অনেকক্ষণ ধরে ফেরেনি। সে গাছ থেকে নেমে দ্রুত পাণ্ডবদের দিকে এগিয়ে এল। তার চোখ রক্তবর্ণ, বাহু বলশালী, চুল খাড়া, মুখ বিশাল, মেঘের মতো দেহ, ধারালো দাঁত আর ভয়ংকর রূপ। সে হাততালি দিতে দিতে, বাহু ঘুরাতে ঘুরাতে, রাগে চোখ উল্টে দাঁত কিড়মিড় করছিল। সে গর্জে উঠল, ‘‘আজ কে এই মূর্খ যে আমার আহারের পথে বাধা দিচ্ছে? হিডিম্বী তো ভয় পায় না, তবু কেন সে ফেরে না?’’ হিডিম্বার এই ভয়ংকর আগমন দেখে হিডিম্বী আতঙ্কিত হয়ে ভীমকে বলল, ‘‘সে আসছে, রাগে উন্মত্ত, মানুষখেকো; তাই, তুমি ও তোমার ভাইদের নিয়ে আমার কথা মতো করো। আমি ইচ্ছামতো চলতে পারি, তুমি আমার ঊরুতে ওঠো, আমি তোমাদের আকাশপথে নিয়ে যাব। ঘুমন্ত ভাইদের ও মাকেও জাগিয়ে দাও, আমি সবাইকে নিয়ে আকাশপথে চলে যাব।’’ ভীম শান্তভাবে বললেন, ‘‘ভয় পেয়ো না, হে সুন্দরী; আমি থাকতে সে কিছুই করতে পারবে না। আমি তোমার সামনেই তাকে বধ করব। এই রাক্ষস, এমনকি সকল রাক্ষস মিলেও আমার শক্তির সামনে টিকতে পারবে না। দেখো আমার বাহু—হাতির গজার মতো; ঊরু—লোহার গদার মতো; বক্ষও সুবৃহৎ। আজ তুমি আমার ইন্দ্রসম বীর্য দেখবে; আমাকে সাধারণ মানুষ ভেবে অবজ্ঞা কোরো না।’’ হিডিম্বী বিনীতভাবে বলল, ‘‘পুরুষশ্রেষ্ঠ, আমি তোমাকে অবজ্ঞা করি না; তুমি দেবতুল্য। কিন্তু মানুষের মধ্যে এই রাক্ষসের শক্তিও আমি দেখেছি।’’ এদিকে, ভীম যখন এসব বলছিলেন, তখন রাগে উন্মত্ত মানুষখেকো রাক্ষস হিডিম্বা তাদের কথা শুনল। সে দেখল, তার বোন হিডিম্বী মানবী রূপে, কেশে মালা ও অলঙ্কারে সজ্জিত, চন্দ্রবদনা হয়ে দাঁড়িয়ে। তার ভ্রু, নাসিকা, চক্ষু, কেশ, নখ, ত্বক—সবই সুন্দর; সর্বাঙ্গে অলঙ্কার, শরীরে মসৃণ বস্ত্র। বোনকে এই আকর্ষণীয় মানবী রূপে দেখে, এবং মনে সন্দেহ জাগল যে সে কোনো পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে; এতে হিডিম্বা প্রবল ক্রোধে ফেটে পড়ল। রাক্ষস হিডিম্বা বড় বড় চোখ মেলে চিৎকার করে বলল, ‘‘কে এই দুষ্টচরিত্র, যে আমার আহারের পথে বাধা দিচ্ছে? তুমি কি ভয় পাও না, হিডিম্বী? আমার রোষে কি তোমার বুদ্ধি লোপ পেয়েছে? ধিক তোমাকে, চরিত্রহীনা, যে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পুরুষের কামনা করছো; তুমি রাক্ষসরাজদের কুলকলঙ্ক। আজ তুমি আমার বিরোধিতা করে, এদের আশ্রয় নিয়ে অপরাধ করেছো—তোমাদের সবাইকে আজ হত্যা করব।’’ এ কথা বলে রক্তবর্ণ চোখে হিডিম্বা বোনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল, তাকে মারার জন্য দাঁত কিড়মিড় করতে লাগল। তার এই গর্জন শুনে ভীমসেন, শত্রুনাশক, ভাই ও মায়ের জাগরণে নজর রাখলেন। হিডিম্বার ছুটে আসা দেখে ভীম বলীয়ান কণ্ঠে ধমক দিলেন, ‘‘থামো, থামো!’’ ভীমসেন তখন হেসে হেসে রাগান্বিতা হিডিম্বীকে বললেন, ‘‘হিডিম্বা, এরা সবাই ঘুমিয়ে শান্তিতে আছে—তোমার কি দরকার? আমাকে আক্রমণ করো, হে দুষ্টপ্রাণ মানুষখেকো, সমস্ত শক্তি নিয়ে। আমাকে একলা আক্রমণ করো; কোনো নারীকে, বিশেষত নিরপরাধকে আঘাত করা উচিত নয়, অপরাধ যদি অন্য কারও হয়। এই তরুণী নিজের ইচ্ছায় কিছু করছে না, আজ সে আমাকে চায় না; কামদেব শরীরে প্রবেশ করে তাকে বাধ্য করেছে। তোমার বোন, হে কুকর্মী, রাক্ষসদের কলঙ্ক; তোমার আদেশে ও আমার রূপ দেখে সে এখন আমাকে চায়। সে ভীত হয়েও আমাকে কামনা করছে—এ তার দোষ নয়, দোষ কামদেবের; তুমি তাকে দোষ দিও না। যতক্ষণ আমি আছি, তুমি কোনো নারীকে আঘাত করবে না। এসো, মানুষখেকো, একা আমার সঙ্গে যুদ্ধ করো।’’ এভাবেই ভীমসেন রাক্ষস হিডিম্বার সামনে দৃঢ়চিত্তে দাঁড়িয়ে গেলেন, আর হিডিম্বী তার পাশে ভয়ে ও প্রেমে কাতর হয়ে রইল।