শ্বেতকেতুর মাতার কথা বলতে গিয়ে তিনি স্মরণ করেন, তাঁর মা ছিলেন সংযমশীলা, স্বামীর প্রতি নিবেদিতা, তপস্যায় বলবান এবং সদ্গুণে ভূষিতা। শ্বেতকেতু ব্রাহ্মণকে অনুরোধ করেন, “হে ব্রাহ্মণ, দয়া করে আমার মাকে মুক্তি দিন; তিনি আপনারও মা-সম।” বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও, ব্রাহ্মণ নম্রভাবে উত্তর দেন, “শ্বেতকেতু, আমি বৃদ্ধ, দুর্বল, সন্তানের আকাঙ্ক্ষী; তুমি তোমার পিতার ঋণ শোধ করেছো, কিন্তু আমি এখনো ঋণমুক্ত হইনি। আমার কোনো কন্যা নেই, কে আমাকে কুমারী কন্যা দেবে? তাই, এই গুণবতী স্ত্রীকে আমাকে সন্তানলাভের জন্য দাও; একটি সন্তান পেলেই আমি তোমার মাকে ফেরত দেবো।” এ কথা শুনে শ্বেতকেতু লজ্জায় ক্রোধ সংবরণ করেন। তখন তাঁর পিতা বলেন, “পুত্র, ক্রোধ করো না; এটাই চিরন্তন ধর্ম। পৃথিবীতে নারীরা একসময় অবাধ ছিল। যেমন গাভীগুলো একত্রে থাকে, নারীরাও পরিবারে তেমনি থাকত, কিন্তু তারা কখনো অবহেলা করত না। ঋতুমতী হলে তারা স্বামীকে ছাড়ত না।” কিন্তু শ্বেতকেতু এই নিয়ম গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি মানুষের মধ্যে, অন্য প্রাণীদের মধ্যে নয়, পুরুষ ও নারীর জন্য এক সীমা স্থাপন করেন। তখন থেকেই শোনা যায়, স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে গেলে তা পাপ; ভ্রূণহত্যার মতোই ভয়ংকর ও নিরানন্দ পাপ। আজও কাম-ক্রোধহীন সাধুরাও এই নিয়ম মানেন। কুরুদের উত্তরাঞ্চলে এই প্রাচীন নিয়ম মান্য হয় এবং মহর্ষিরা তা পালন করেন। চরিত্রবান, সতী কুমারী স্ত্রীর সঙ্গে কেউ সংসর্গ করলে, সেটাও পাপ বলে গণ্য হয়। আবার, সন্তানলাভের জন্য স্বামী কর্তৃক নিযুক্ত স্ত্রী সে কর্তব্য না করলে, তিনিও দোষী হন। এইভাবে শ্বেতকেতু ও সৌদাসা সন্তানলাভের বিষয়ে এই নিয়ম স্থাপন করেন। যেমন মদয়ন্তী ঋষি বসিষ্ঠের কাছে গিয়ে অশ্মক নামে পুত্র লাভ করেন, স্বামীকে সন্তুষ্ট করতে। কুন্তীর জন্মও এমনই ছিল। কুরু বংশ বৃদ্ধির জন্য কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন থেকেও এমনই সন্তান জন্মেছে। তাই, এইসব কারণ বিবেচনা করে, ধর্মমতে স্বামীর আদেশ পালন করা উচিত; ঋতুকালে স্বামীই স্ত্রীর অধিপতি। ধর্মজ্ঞরা বলেন, এই নিয়ম অতিক্রম করা উচিত নয়; অন্য সময়ে নারীর স্বাধীনতা থাকতে পারে। প্রাচীনকালে এই নিয়ম প্রচলিত ছিল—ধর্ম-অধর্ম যাই হোক, স্ত্রীর উচিত স্বামীর আদেশ পালন করা। বিশেষত, স্বামী যদি পুত্র কামনা করেন অথচ নিজে সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম হন, তবে স্ত্রীর উচিত তাঁর ইচ্ছা পালন করা—এটাই বৈদিক বিধান। যেমন আমি, কুন্তী, তোমাকে সন্তুষ্ট করতে চাই; আমার এই প্রার্থনায়, ব্রাহ্মণের তপস্যাশক্তিতে, তুমি গুণবান পুত্র লাভ করো—এই কামনা করি। পাণ্ডুর এই অনুরোধে, কুন্তী, স্বামীর কল্যাণে নিবেদিতা, উত্তর দেন, “হে ভরতশ্রেষ্ঠ, নারীদের জন্য এ এক বড় অন্যায়—একবার সন্তুষ্ট স্বামীকে বারবার সন্তুষ্ট করতে হয়। শুনো, তোমার আনন্দের জন্য বলি—শৈশবে, পিতৃগৃহে অতিথি সেবার জন্য আমাকে নিয়োজিত করা হয়েছিল। সেখানে আমি দুর্বাসা মুনিকে পূর্ণ মনোযোগে সেবা করি। তিনি তুষ্ট হয়ে আমাকে এক বিশেষ মন্ত্র ও বর দেন—এই মন্ত্রে যাকে আহ্বান করব, সে দেবতা আমার অধীন হবে। তাঁর কৃপায় আমি পুত্র লাভ করব। ব্রাহ্মণের বচন সত্য; এখন সময় এসেছে। তোমার অনুমতি নিয়ে আমি দেবতাকে আহ্বান করব। সেই জ্ঞান তিনি আমাকে দিয়েছিলেন—যে দেবতাকে আহ্বান করব, তিনি দেবসম পুত্র দেবেন এবং তোমার নিঃসন্তানতার দুঃখ দূর করবেন।” এদিকে, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের কথা বলা হয়েছে—ঋষির কৃপায় তাঁর একশো পুত্র জন্মেছিল, কিন্তু কন্যার কথা উল্লেখ করা হয়নি। যুযুৎসু, বৈশ্য স্ত্রীর গর্ভজাত, এবং আরও একজন কন্যা—অর্থাৎ একশোর বেশি সন্তান। গান্ধারের রাজকন্যা, যিনি ‘শতপুত্রী’ নামে পরিচিত, তিনিও কন্যা। মহর্ষি ব্যাসদেব একশো ভাগ করেছিলেন, তার বেশি সন্তান জন্মানোর কথা নয়—তাহলে সৌবালীর কন্যার জন্ম কীভাবে হলো? এই প্রশ্নও উত্থাপিত হয়। এভাবেই, শ্বেতকেতুর মাতার ধর্ম, শ্বেতকেতুর প্রতিক্রিয়া, সন্তানলাভের বিধান, কুন্তীর মন্ত্রলাভ, এবং কৌরবদের জন্মের কাহিনি পরম্পরায় বর্ণিত হয়।