উচ্চত্যের ছোট ভাই, দেবতাদের পুরোহিত এবং অতুল্য তেজস্বী বृहস্পতি একসময় মমতা নামে এক নারীর প্রতি আকৃষ্ট হলেন। মমতা ছিলেন তাঁরই ভ্রাতৃবধূ ও উচ্চত্যের পত্নী। বুদ্ধিমান মমতা তখন বৃষস্পতিকে বললেন, ‘‘হে দেবতুল্য, আমি গর্ভবতী, ইতিমধ্যে আপনার দাদা উচ্চত্যের সঙ্গে আমার মিলন হয়েছে। তাঁর সন্তান আমার গর্ভে আছে এবং সে এখানেই বেদ ও বেদাঙ্গের শিক্ষা নিচ্ছে।’’ মমতা আরও বললেন, ‘‘আপনার বীজ অক্ষয়, এবং একই গর্ভে দুইজনের সন্তান সম্ভব নয়। তাই, এই পরিস্থিতিতে আপনাকে বিরত থাকা উচিত।’’ কিন্তু বৃষ্পতি, যদিও তিনি সুজ্ঞানী ও মহৎ, কামনায় অন্ধ হয়ে নিজেকে সংবরণ করতে পারলেন না। তিনি মমতার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর সঙ্গে মিলিত হলেন। এই সময়ে, মমতার গর্ভে যে শিশু ছিল, সে কথা বলে উঠল, ‘‘হে পূজনীয়, কামনাবশে এই কাজ করবেন না। এখানে দুইজনের সন্তান ধারণ সম্ভব নয়। স্থান সংকীর্ণ, আমি এখানে আগে এসেছি। আপনার বীজ অক্ষয়, আপনি যেন কোনো অনিষ্ট না করেন।’’ কিন্তু বৃষ্পতি সেই গর্ভস্থ শিশুর কথা উপেক্ষা করলেন এবং মমতার সঙ্গে মিলিত হলেন। তখন গর্ভস্থ ঋষি, বৃষ্পতির বীজ প্রবেশ করতে দেখে, পায়ের দ্বারা তার পথ রোধ করল। ফলে বৃষ্পতির বীজ গন্তব্য না পেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এই দৃশ্য দেখে বৃষ্পতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে গর্ভস্থ শিশুকে অভিশাপ দিলেন। বৃষ্পতি বললেন, ‘‘সব প্রাণী যেখানে আমাকে কামনা করে, সেখানে তুমি আমার বিরোধিতা করলে। এই কারণে, তুমি দীর্ঘকাল অন্ধকারে থাকবে।’’ এই অভিশাপের ফলে সেই ঋষি জন্মগ্রহণ করলেন দীর্ঘতম নামে, এবং তিনি জন্ম থেকেই অন্ধ ছিলেন। তবুও দীর্ঘতম ছিলেন বেদজ্ঞ, বুদ্ধিমান এবং বৃষ্পতির মতোই মহিমামণ্ডিত। তাঁর জ্ঞানের দ্বারা তিনি এক সুন্দরী ব্রাহ্মণ কন্যা, প্রদ্বেষী-কে বিবাহ করেন। দীর্ঘতম ও প্রদ্বেষীর সন্তানদের মধ্যে গৌতম প্রমুখ বিখ্যাত হয়। এভাবেই উচ্চত্যের বংশবৃদ্ধির জন্য এই ধার্মিক, মহাত্মা, বেদ ও বেদাঙ্গবিশারদ ঋষির জন্ম হয়। তিনি গাভীসম্পর্কিত ধর্ম ও সৌরভেয় প্রদত্ত শিক্ষাগুলি নিষ্ঠার সঙ্গে আয়ত্ত করেন এবং তা অনুশীলন করতে থাকেন। কিন্তু, আশ্রমবাসী অন্যান্য ঋষিরা তাঁর কোনো আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে রাগ ও মোহে বিভ্রান্ত হয়ে উঠলেন। তাঁরা বললেন, ‘‘এ ব্যক্তি আচরণবিধি ভঙ্গ করেছে, সে আর আশ্রমে বাসযোগ্য নয়। চল, আমরা সকলে এই পাপীকে পরিত্যাগ করি।’’ এদিকে, প্রদ্বেষীও স্বামীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন, যদিও তাঁর একটি সন্তান জন্মেছিল। তখন দীর্ঘতম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘তুমি কেন আমাকে ঘৃণা কর?’’ প্রদ্বেষী বললেন, ‘‘আমি তোমার মতো মহাতপস্বী ও অন্ধ পুত্রকে নিয়ে সংসার চালাতে পারছি না। সর্বদা দুঃখ ও কষ্টে জর্জরিত, আর সহ্য করতে পারছি না।’’ স্ত্রীর এই কথায় দীর্ঘতম রাগে উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘‘তুমি যে ধন দিয়েছ, তার প্রয়োজন নেই, কারণ সেটাই দুঃখের কারণ। তুমি ইচ্ছেমতো করো, আমি আর আগের মতো তোমার উপর নির্ভর করব না।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘স্ত্রীর একমাত্র আশ্রয় তাঁর স্বামী; তিনি বেঁচে থাকুন বা মৃত, অন্য পুরুষের কাছে যাওয়া উচিত নয়। যদি কেউ যায়, তবে সে অপর পুরুষের পত্নী হবে। আজ থেকে স্বামীহীনা নারীদের জন্য এটি মহাপাপ হবে। তাদের সমস্ত ঐশ্বর্য থাকলেও, সে ভোগ বৃথা হবে, সর্বদা লাঞ্ছনা ও নিন্দা তাদের ভাগ্যে জুটবে।’’ এই কথা শুনে প্রদ্বেষী প্রবল ক্রোধে বললেন, ‘‘এই ছেলেকে গঙ্গায় ফেলে দাও!’’ লোভ ও মোহে অন্ধ হয়ে, গৌতম-সহ তাঁর ছেলেরা দীর্ঘতমকে বেঁধে, ভেলায় তুলে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিল। ‘‘আমরা কেন এই অন্ধ ও বৃদ্ধকে পালন করব?’’—এমন ভাবনা নিয়ে তারা নিষ্ঠুরভাবে বাড়ি ফিরে গেল। অন্ধ দীর্ঘতম গঙ্গার স্রোতে ভাসতে ভাসতে বহু দেশে ঘুরে বেড়ালেন। একসময়, ধর্মজ্ঞ ও পরাক্রান্ত রাজা বলি তাঁকে জলে ভাসতে দেখে উদ্ধার করলেন এবং তাঁর কাহিনি শুনে তাঁকে পুত্রার্থে বর দিলেন। রাজা বলি ঋষিকে স্নেহ ও সন্মান দিয়ে বললেন, ‘‘হে ভাগ্যবান, আমার ধর্ম ও অর্থে নিপুণ পত্নীদের গর্ভে আপনি সন্তান উৎপাদন করুন।’’ ঋষি সম্মতি দিলে, রাজা তাঁর রানি সুদেশনাকে ঋষির কাছে পাঠালেন। কিন্তু সুদেশনা দীর্ঘতমের অন্ধত্ব ও বার্ধক্য দেখে তাঁকে অবজ্ঞা করে নিজের শূদ্র দাসীকে পাঠালেন। সেই শূদ্রার গর্ভে দীর্ঘতম এগারো পুত্র উৎপাদন করলেন, যাদের মধ্যে কাক্ষীবৎ প্রমুখ বিখ্যাত। রাজা বলি সেই সব সন্তানদের দেখে ঋষিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘এরা কি আমার?’’ দীর্ঘতম বললেন, ‘‘না, কাক্ষীবৎ ও অন্যান্যরা আমারই পুত্র, শূদ্রার গর্ভে জন্মেছে। কারণ, আপনার রানি আমাকে অবজ্ঞা করে তাঁর শূদ্র দাসীকে পাঠিয়েছিলেন।’’ এভাবেই দীর্ঘতমের জীবন নানা সংকট, অভিশাপ, ত্যাগ, এবং আশীর্বাদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, কিন্তু তাঁর জ্ঞান ও ঋষিতেজ কখনও ক্ষয় হয়নি।