রাজা দুষ্মন্তাকে সেই নারীর কথা ও স্মরণ করিয়ে দিলেও, রাজা শান্ত স্বরে বললেন, ‘‘হে ভদ্রময়ী, আমি আমাদের মিলনের কথা কিছুই মনে করতে পারছি না।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘অকারণে আমি কারো সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে চাই না—এটাই আমার দৃঢ় সংকল্প। হে কল্যাণময়ী, তোমার সঙ্গে কোনো মিলনের কথা আমি স্মরণ করতে পারছি না।’’ রাজা বললেন, ‘‘ধর্ম, অর্থ কিংবা কাম—এই তিন বিষয়ে তোমার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল বলে আমি মনে করতে পারছি না। তুমি চাও তো চলে যেতে পারো, বা এখানে থাকতে পারো, অথবা তোমার ইচ্ছেমতো অন্য কিছু করতে পারো।’’ এই কথা শুনে সেই নারীর চোখ ক্রোধ ও অপমানে লাল হয়ে উঠল, তাঁর ঠোঁট কাঁপছিল। তিনি তির্যক দৃষ্টিতে রাজার দিকে তাকালেন, যেন দৃষ্টির আগুনে তাঁকে দগ্ধ করছেন। তবে নিজের মুখাবয়ব ও ক্রোধের আলোড়ন গোপন করলেন তিনি, তপস্যার দ্বারা অর্জিত শক্তি সংবরণ করলেন। একটু চিন্তা করে, শোক ও অপমানে পূর্ণ হয়ে, স্বামীকে যথাযথভাবে সম্বোধন করে তিনি বললেন, ‘‘হে মহারাজ, তুমি সব জেনেও কেন এমন কথা বলছ? বিনা দ্বিধায় তুমি বলছ তুমি জানো না—যেমন সাধারণ মানুষ বলে।’’ ‘‘তোমার হৃদয় সত্য-মিথ্যা দুটোই জানে। হায়, তুমি নিজের সেই অন্তর্যামী স্বাক্ষীকে অবহেলা করছ, হে পূণ্যবান।’’ ‘‘যে ব্যক্তি এক রকম অথচ আচরণ করে অন্যরকম, সে চোরের মতো নিজের আত্মাকেই চুরি করে—সে আর কী পাপ করেনি?’’ ‘‘তুমি ভাবছ তুমি একা, কিন্তু তোমার হৃদয়ে সেই প্রাচীন ঋষি আছেন, যিনি সব পাপকর্ম জানেন; তাঁর উপস্থিতিতেই তুমি অন্যায় করছ।’’ ‘‘কারণ ধর্মই সকল সাধুদের কল্যাণের মূল, সর্বদা মিথ্যাবর্জিত, এবং তা কখনো দুঃখ ডেকে আনে না।’’ ‘‘কেউ মনে করে, ‘আমি পাপ করেছি, কেউ জানে না’; কিন্তু দেবতারা জানেন, আর জানেন হৃদয়ের অন্তর্যামী।’’ ‘‘সূর্য, চন্দ্র, বায়ু, অগ্নি; আকাশ, পৃথিবী, জল, হৃদয়, এবং যম; দিন-রাত্রি, দুই সন্ধ্যা, এবং ধর্ম—সবাই মানুষের আচরণ জানেন।’’ ‘‘যম, বিবস্বতের পুত্র, মানুষের পাপের জন্য শাস্তি দেন; আর হৃদয়ে অধিষ্ঠিত ক্ষেত্রজ্ঞ, কর্মের সাক্ষী, তিনি ধার্মিকদের প্রতি প্রসন্ন থাকেন।’’ ‘‘কিন্তু যদি এই অন্তর্যামী সাক্ষী পাপীর প্রতি প্রসন্ন না থাকেন, তবে যম সেই দুষ্টকে তার কুকর্মের জন্য নিন্দা করেন।’’ ‘‘যে ব্যক্তি নিজের আত্মাকে অবজ্ঞা করে অন্যরকম আচরণ করে—তার জন্য, যার নিজের আত্মাও কারণ হয় না, দেবতাদের আশীর্বাদ লাভ হয় না।’’ ‘‘আমাকে সহজলভ্য ভাবো না, কিংবা তোমার পত্নীকে তুচ্ছ কোরো না; আমি পূজার যোগ্য, অথচ তুমি আমাকে সম্মান দাও না, আমি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।’’ ‘‘এই সভায় আমাকে সাধারণ নারীর মতো কেন দেখছ? নিশ্চয়ই আমি এই কথা বৃথা বলছি না—তুমি কেন আমার কথা শুনছ না?’’ ‘‘আমি যেসব কথা বলছি, হে দুষ্মন্ত, যদি তুমি তা পালন না করো, তবে আজই তোমার মস্তক শতখণ্ডে বিভক্ত হবে।’’ ‘‘যখন স্বামী পত্নীর সঙ্গে মিলিত হন এবং তাঁর গর্ভে সন্তান জন্মায়, তখন সেই সন্তানই প্রকৃত অর্থে তাঁর সন্তান—প্রাচীন ঋষিরা এটাই বলেছেন।’’ ‘‘যে ব্যক্তি ধর্মমতে জীবনযাপন করে, তার ঘরে যখন সন্তান জন্মায়, সেই সন্তান তার পিতৃপুরুষদের উদ্ধার করে।’’ ‘‘সন্তান তার পিতাকে ‘পুত’ নামক নরক থেকে উদ্ধার করে, তাই তার নাম ‘পুত্র’—এই কথা স্বয়ম্ভূ বহু পূর্বে বলেছিলেন।’’ ‘‘সন্তানের দ্বারা মানুষ স্বর্গ জয় করে; পৌত্রের দ্বারা তারা অনন্তত্ব লাভ করে; প্রপৌত্রের দ্বারা মহাপিতামহগণ আনন্দ পান।’’ ‘‘যিনি গৃহকর্মে নিপুণ, যিনি সন্তানপ্রসূতি, যিনি স্বামীর সেবায় জীবন উৎসর্গ করেন, যিনি অনুগতা—তিনিই প্রকৃত স্ত্রী।’’ ‘‘স্ত্রী-ই পুরুষের অর্ধেক; স্ত্রী-ই তার শ্রেষ্ঠ বন্ধু; স্ত্রী-ই ধর্ম, অর্থ, কাম—এই তিনের মূল; যার স্ত্রী আছে, সে-ই প্রকৃত অর্থে সংযুক্ত।’’ ‘‘স্ত্রীসহ গৃহস্থরা ধর্ম পালন করেন; স্ত্রীর সঙ্গে থাকলে আনন্দ লাভ হয়; স্ত্রীর সঙ্গে থাকলে ঐশ্বর্যও আসে।’’ ‘‘একাকিত্বে স্ত্রী সুখসঙ্গিনী; ধর্মকর্মে তিনি পিতার মতো; দুঃখে তিনি মাতার মতো।’’ ‘‘কে-ই বা অরণ্যে ভ্রমণে শান্তি পায়? যার স্ত্রী আছে, সেই-ই বিশ্বাসযোগ্য; তাই স্ত্রী-ই সর্বোচ্চ আশ্রয়।’’ ‘‘কঠিন বিপদে, দুর্দশায়, কেবল অনুগতা স্ত্রী-ই সবসময় স্বামীর সঙ্গে থাকেন।’’ ‘‘স্ত্রী আগে চলে গেলে, মৃত্যুর পরে স্বামীর জন্য প্রতীক্ষা করেন; আর স্বামী আগে মারা গেলে, স্ত্রীও তাঁর অনুসরণ করেন।’’ ‘‘এই কারণেই, হে রাজন, বিবাহ অনুমোদিত; স্বামী যা অর্জন করেন, স্ত্রীও তা ভাগ করে নেন, এ জন্মে ও পরজন্মে।’’ ‘‘দেহের পুষ্টির জন্য স্বর্গেও উপকরণ লাগে; নিজের গর্ভজাত সন্তানকেই জ্ঞানীরা ‘আত্মা’ বলেন।’’ ‘‘তাই স্বামীর উচিত স্ত্রীর প্রতি মাতৃভাব রাখা, এবং পুত্রের জননীর প্রতি; কারণ সকলের অন্তর্যামী চিরকাল ‘পুত্র’ নামে অভিহিত হন।’’ ‘‘পিতার মধ্যে যেসব গতি, রূপ, কর্ম, স্বভাব ও চিহ্ন থাকে, তা-ই পুত্রের মধ্যেও দেখা যায়।’’ ‘‘স্বভাব, গুণ, আচরণ—সব, শুভ-অশুভ স্পর্শে, স্ত্রীর গর্ভজাত পুত্রের মধ্যে প্রতিবিম্বিত হয়, যেমন আয়নায় নিজের মুখ।’’ ‘‘পিতা পুত্রকে দেখে যেমন আনন্দ পান, ধার্মিক ব্যক্তি যেমন স্বর্গ লাভে আনন্দ পান; কিন্তু যারা পত্নীর রূপ নিয়ে অন্যের বীজ গ্রহণ করেন—’’ ‘‘তারা স্বামীর বংশ নষ্ট করে, ভয়ঙ্কর নরকে যান; অন্যের ইচ্ছায় স্ত্রীর গর্ভে জন্মানো সন্তান—’’ ‘‘তাদের ‘আমার সন্তান’ মনে হলেও, তারা আসলে শত্রু; তারা ঘৃণা করে, বিরোধিতা করে, তথাকথিত পিতার কথা মানে না।’’ ‘‘পিতাও তাদের ঘৃণা করেন, কিন্তু নিজের বীজের সন্তানকে নয়, হে রাজন; পুত্র কখনো পিতাকে বা তার প্রকৃত জন্মদাতাকে ঘৃণা করে না।’’ ‘‘জন্মদাতা-ও তার পুত্রকে ঘৃণা করেন না; তাই পুত্রই প্রকৃত আত্মা। এমনকি মানসিক দুঃখ ও কঠিন রোগে কষ্ট পেলেও, মানুষ...