একদিন এক জ্ঞানী সাধক তাঁর অন্তরের গভীর উপলব্ধি ভাগ করে নিতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, ‘‘যেমন একটি হাঁড়ি ভেঙে গেলে তার ভেতরের আকাশ সহজেই বাইরের আকাশে মিশে যায়, কোনো বিভাজন থাকে না—তেমনই, শুদ্ধচিত্ত যখন শিবে নিবিষ্ট হয়, তখন আমি আর কোনো ভেদ দেখি না।’’ ‘‘এখানে কোনো হাঁড়ি নেই, হাঁড়ির আকাশ নেই, কোনো পৃথক আত্মা নেই, আত্মার শরীর নেই; সর্বত্র কেবল ব্রহ্ম, চেতন—যেখানে জ্ঞানী ও জানার বিষয় বলে কিছু নেই, কেবল সেই একমাত্র সত্য। সর্বত্র, সর্বদা, সমস্ত কিছুতেই কেবল আত্মা—চিরন্তন, অপরিবর্তনীয়। সবই শূন্য, আবার শূন্যও নয়—এটাই আমার নিঃসংশয় উপলব্ধি।’’ ‘‘এখানে কোনো বেদ নেই, কোনো লোক নেই, দেবতা নেই, যজ্ঞ নেই, কোনো বর্ণ বা আশ্রম নেই, পরিবার বা জন্ম নেই; ধূমপথ বা অর্কপথও নেই—পরম সত্য কেবল একরূপ ব্রহ্ম। তুমি যদি পরিপূর্ণতা লাভ করো, তবে তুমি সর্বত্র এক, এখানে পরিব্যাপক বা পরিব্যাপ্ত বলে কিছু নেই; তখন তুমি কি আত্মাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে ভাবতে পারো?’’ ‘‘কেউ অদ্বৈত চায়, কেউ দ্বৈত চায়; কিন্তু প্রকৃত সত্য—যা দ্বৈত ও অদ্বৈত উভয় থেকেই মুক্ত—তারা উপলব্ধি করতে পারে না। সত্য তো কোনো রঙ নেই, সাদা বা অন্য কোনো রঙ নয়, শব্দ বা অন্য কোনো গুণ নেই, মন ও বাক্যের নাগালের বাইরে—তবে তারা কীভাবে সেই সত্য নিয়ে কথা বলবে?’’ ‘‘যখন শরীর-মন প্রভৃতি সবকিছু মিথ্যা বলে জানবে, যেমন আকাশের মতো, তখন সত্যিই ব্রহ্মকে জানা যায়; তখন তোমার জন্য দ্বৈততার কোনো ধারাবাহিকতা থাকে না। এমনকি স্বাভাবিক আত্মা, পরম, আমার কাছে ভিন্ন বলে মনে হয় না; যেমন আকাশ এক, তেমনি এখানে ধ্যানী, ধ্যান বা ধ্যানের বিষয় বলে কিছু নেই।’’ ‘‘আমি যা করি, যা খাই, যা দান করি বা উৎসর্গ করি—কিছুই আমার নয়; আমি নির্মল, অজন্মা, অবিনশ্বর। এই সমগ্র জগৎকে নিরাকার বলে জানো, পরিবর্তনহীন বলে জানো, পবিত্রতার দেহ বলে জানো, শিবের একরূপ বলে জানো।’’ ‘‘তুমি সত্য, এতে কোনো সন্দেহ নেই; আবার কী জানবে? আত্মাকে, যা জানার বিষয় নয়, কীভাবে জানার বিষয় হিসেবে ভাববে? প্রিয়, এখানে মায়া বা অমায়া কিছু নেই; ছায়া বা অছায়া নেই। সবই একমাত্র সত্য, আকাশের মতো নিরাকার ও নির্মল।’’ ‘‘আমি আদিতে, মধ্যে, শেষে বাঁধা নই; কোনো কালে আমি আবদ্ধ ছিলাম না। আমি স্বভাবতই নির্দোষ ও বিশুদ্ধ—এটাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এই জগৎ, মহত্তত্ত্ব থেকে শুরু করে, আমার কাছে কিছুই নয়; কেবল ব্রহ্মই সব—তাহলে এখানে কোনো বর্ণ বা আশ্রমের স্থান কোথায়?’’ ‘‘আমি জানি, সকল দিক থেকে, আমি এক ও অবিচ্ছিন্ন; কোনো নির্ভরতা নেই, আমি শূন্য নই, আবার পঞ্চশূন্য (আকাশ প্রভৃতি) হয়েও নই। আমি না পুরুষ, না নারী, না ক্লীব; না জ্ঞান, না কল্পনা। আত্মাকে কীভাবে আনন্দময় বা নিরানন্দ ভাববে?’’ ‘‘ষড়ঙ্গযোগ বা মন-নাশনেও পবিত্রতা আসে না; গুরু-উপদেশেও নয়—সত্য কেবল আত্মার দ্বারা, আত্মার জন্য উপলব্ধি হয়। এই দেহ পাঁচ উপাদান দিয়ে গঠিত নয়, আবার এগুলো ছাড়াও নেই; আত্মাই সব—তবে চতুর্থ বা অন্য তিনটি অবস্থার স্থান কোথায়?’’ ‘‘আমি আবদ্ধ নই, মুক্তও নই; ব্রহ্ম থেকে পৃথকও নই। আমি কর্তা নই, ভোক্তা নই; পরিব্যাপক বা পরিব্যাপ্তও নই। যেমন জলে জল মিশে যায়, কোনো ভেদ থাকে না, তেমনি প্রকৃতি ও পুরুষ আমার কাছে ভিন্ন বলে মনে হয় না।’’ ‘‘তুমি মুক্ত না হলেও, কোনোদিন আবদ্ধ নও; আত্মাকে রূপবান বা নিরাকার বলে ভাবা যায় না। আমি তোমার পরম রূপকে প্রত্যক্ষভাবে জানি, আকাশের মতো; যেমন সেই পরম রূপ জলে মরীচিকার মতো। আমার জন্য কোনো গুরু, উপদেশ, সীমা বা কর্ম নেই; আমি স্বভাবতই বিশুদ্ধ, দেহহীন, আকাশের মতো।’’ ‘‘তুমি বলো, তোমার দেহ পবিত্র, মন সেরা, তুমি নিজেই পরম আত্মা—তবু তুমি লজ্জিত হও না এমন কথা বলতে। ও মন, কেন কাঁদছো? আত্মার দ্বারা আত্মা হও, আত্মার মধ্যে। প্রিয়, অদ্বৈতের চিরন্তন অমৃত পান করো।’’ ‘‘এখানে জ্ঞান নেই, অজ্ঞান নেই, দু’টো একসঙ্গে নেই; যার চেতনা এমন, তার চেতনা কখনো অন্যরকম হয় না। জ্ঞান যুক্তি নয়, ধ্যানও নয়; স্থান, কাল বা গুরু-উপদেশও নয়। আমি সেই সত্য, স্বভাবতই সচেতন, আকাশের মতো, স্বতঃসিদ্ধ, চিরন্তন।’’ ‘‘আমি জন্মাই না, মরিও না; আমার কোনো পুণ্য বা পাপ নেই। আমি বিশুদ্ধ, নির্গুণ, ব্রহ্ম—তবে আমার জন্য বন্ধন বা মুক্তি কোথায়? যদি সর্বব্যাপী, অচল, পূর্ণ ও অবিচ্ছিন্ন হয় ঈশ্বর, আমি কোনো ভেদ দেখি না—তাহলে ভিতর-বাইরের স্থান কোথায়?’’ ‘‘সমগ্র জগৎ অবিচ্ছিন্নভাবে দীপ্তিমান। আহা, কী মহামায়ার বিভ্রম—এই দ্বৈত ও অদ্বৈতের দোলাচল! রূপযুক্ত ও নিরাকার, সদা ‘নেতি নেতি’—ভেদ ও অবেদ উভয় থেকে মুক্ত, কেবল সেই এক শিবই অবশিষ্ট থাকেন।’’ ‘‘তোমার মা নেই, বাবা নেই, কোনো আত্মীয় নেই; স্ত্রী, পুত্র, বন্ধু নেই। তুমি পক্ষপাতী নও, বিরোধীও নও—তবে মন দুঃখিত হয় কেন? তোমার জন্য দিন-রাত নেই, উদয়-অস্ত নেই। দেহহীনের জন্য জ্ঞানী কীভাবে দেহধারণ কল্পনা করবে?’’ ‘‘তুমি অবিভক্তও নও, বিভক্তও নও; সুখ-দুঃখ, সব-কিছু বা কিছুই নয়—আত্মাকে অবিনশ্বর বলে জানো। আমি কর্তা নই, ভোক্তা নই; কোনো কর্ম নেই, অতীত বা বর্তমান। আমার কোনো দেহ নেই, দেহী বা নির্দেহী—তাহলে ‘আমার’ বা ‘তোমার’ কী?’’ ‘‘আমার কোনো কাম বা দুঃখ নেই; আমাকে আকাশের মতো একমাত্র আত্মা বলে জানো। ও বন্ধু মন, এত কথা কী কাজে? সবই তো কল্পনা। যা জানা দরকার, বলেছি—তুমি সত্য, আকাশের মতো বিশাল।’’ ‘‘যেভাবেই হোক, যেখানেই হোক, এমনকি মৃত্যুর সময়ও, যোগীরা সেখানে মিশে যায়, যেমন হাঁড়ির আকাশ আকাশে মিশে যায়। পবিত্র স্থানে হোক বা চণ্ডালের ঘরে, এমনকি মৃত্যুর সময় স্মৃতি হারালেও, যে সেই মুহূর্তে দেহ ত্যাগ করে, সে সর্বব্যাপী মুক্তিতে লীন হয়।’’ এইভাবে, সেই জ্ঞানী তাঁর উপলব্ধি বিনা দ্বিধায়, বিনয়ভরে, সরল ভাষায় প্রকাশ করলেন—সবকিছুতে কেবল একমাত্র ব্রহ্ম, একমাত্র শিব, চিরন্তন, নিরাকার, অপরিবর্তনীয়, নির্মল।