শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, “হে পার্থ, মানসিক তপস্যা বলতে বোঝায়—মনের শান্তি, কোমলতা, নীরবতা, আত্মসংযম এবং স্বভাবের পবিত্রতা। এই রকম মানসিক, বাচিক ও দেহগত তিন প্রকার তপস্যা, যখন অটল বিশ্বাসে, ফলের প্রতি কোনো আকাঙ্ক্ষা না রেখে, দৃঢ়চিত্ত ব্যক্তি সাধনা করে, তখন সেটিকে সত্ত্বিক তপস্যা বলা হয়। কিন্তু কেউ যদি তপস্যা করে লোকের সম্মান, প্রশংসা বা পূজার আশায়, কিংবা ভণ্ডামি করে, তবে তা রাজসিক—অস্থির ও অসৎ। আবার কেউ ভুল বোঝাবুঝি থেকে, নিজের বা অন্যের ক্ষতি করার জন্য কষ্ট স্বীকার করে তপস্যা করে, সেটি তামসিক বলে গণ্য হয়। দান সম্বন্ধেও শ্রীকৃষ্ণ বললেন, ‘যে দান যথাযোগ্য স্থানে, যথাসময়ে, উপযুক্ত ব্যক্তিকে, শুধু এই ভাবনায় দেওয়া হয় যে—‘এটা দেওয়া উচিত’, এবং কোনো প্রতিদান বা ফলের আশা নেই, সেটিই শুদ্ধ দান। কিন্তু কেউ যদি দান করে প্রতিদান চেয়ে, বা কোনো পুরস্কারের আশায়, কিংবা অনিচ্ছায় দান করে, সেটি রাজসিক দান। আর যদি দান হয় অনুপযুক্ত স্থানে বা সময়ে, অযোগ্য ব্যক্তিকে, কিংবা অবজ্ঞাসূচকভাবে, তাহলে সেটি তামসিক দান। শ্রীকৃষ্ণ আরও বললেন, ‘ওঁ তৎ সৎ’—এই তিনটি শব্দ ব্রহ্মের নির্দেশক। পূর্বে ঋষিরা, ব্রাহ্মণরা, বেদ এবং যজ্ঞ এই শব্দের দ্বারা নির্ধারিত হয়েছিল। তাই যাঁরা ব্রহ্মকে জানেন, তাঁরা যজ্ঞ, দান ও তপস্যা শুরু করেন ‘ওঁ’ উচ্চারণ করে। যারা মুক্তি কামনা করেন, তারা ‘তৎ’ উচ্চারণ করে ফলের আশা না রেখে যজ্ঞ, দান ও তপস্যা করেন। ‘সৎ’ শব্দটি সত্য ও কল্যাণের অর্থে ব্যবহৃত হয়, এবং প্রশংসনীয় কর্মেও ‘সৎ’ বলা হয়। যজ্ঞ, দান, তপস্যায় দৃঢ়তা ও নিষ্ঠা—এগুলোও ‘সৎ’ নামে অভিহিত। কিন্তু কোনো কাজ, দান বা তপস্যা যদি বিশ্বাসহীন হয়, তবে তা ‘অসৎ’—এবং তার কোনো ফল নেই, এই জগতে বা পরজগতে। এ পর্যায়ে অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন, “হে হৃষিকেশ, হে কেশিনিশূদন, আমি জানতে চাই—সংন্যাস ও ত্যাগের প্রকৃত অর্থ কী? এদের মধ্যে পার্থক্য কী?” শ্রীকৃষ্ণ বললেন, “জ্ঞানীরা বলেন, ইচ্ছাকৃত কর্মের পরিত্যাগই সংন্যাস। আর পণ্ডিতেরা বলেন, সকল কর্মের ফল ত্যাগ করাটাই প্রকৃত ত্যাগ। কেউ কেউ বলেন, কর্মই পরিত্যাজ্য, কারণ তা দোষযুক্ত। আবার কেউ বলেন, যজ্ঞ, দান ও তপস্যার মতো কর্ম কখনোই ত্যাগ করা উচিত নয়। শোনো, হে ভারতশ্রেষ্ঠ, ত্যাগও তিন প্রকার। যজ্ঞ, দান, তপস্যা—এগুলো কখনো ত্যাগ করা উচিত নয়, কারণ এগুলো জ্ঞানীদেরও পবিত্র করে। তবে এগুলোও করতে হবে, আসক্তি ও ফলের আশা ত্যাগ করে—এটাই আমার চূড়ান্ত মত। নিয়মিত কর্ম ত্যাগ করা উচিত নয়। কেউ যদি অজ্ঞতায় কর্ম ত্যাগ করে, সেটি তামসিক ত্যাগ। আর কেউ যদি কেবল কষ্ট বা ক্লেশের ভয় থেকে কর্ম ত্যাগ করে, তবে তা রাজসিক ত্যাগ, এতে প্রকৃত ফল পাওয়া যায় না। কিন্তু যে ব্যক্তি কর্তব্যবোধ থেকে, আসক্তি ও ফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে কর্ম করে, সে সত্ত্বিক ত্যাগী। যিনি শুদ্ধ, জ্ঞানী, সন্দেহহীন, তিনি অযোগ্য কর্মকে ঘৃণা করেন না, আবার যোগ্য কর্মে আসক্তও হন না—এমন ত্যাগী সত্ত্বগুণে প্রতিষ্ঠিত। শরীর থাকলে সমস্ত কর্ম পুরোপুরি ত্যাগ করা সম্ভব নয়; কিন্তু যে ব্যক্তি কেবল কর্মের ফল ত্যাগ করে, সে-ই প্রকৃত ত্যাগী। যিনি ত্যাগ করেন না, তাঁর জন্য কর্মের তিন রকম ফল—ইচ্ছিত, অনিচ্ছিত ও মিশ্র—মৃত্যুর পরেও থাকে; কিন্তু ত্যাগীর জন্য তা নেই। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, “হে মহাবাহু, কর্ম সম্পাদনের জন্য পাঁচটি কারণ রয়েছে—তত্ত্বজ্ঞরা তা বলেন। এই পাঁচটি কারণ হলো—শরীর (কর্মক্ষেত্র), কর্তা (কর্মী), বিভিন্ন উপকরণ, নানা প্রকার প্রচেষ্টা এবং পঞ্চমতঃ ঈশ্বর। শরীর, বাক্য বা মনে যে-কোনো কর্মই হোক, ন্যায় বা অন্যায়—এই পাঁচটি কারণেই ঘটে। তাই যে ব্যক্তি কেবল নিজের আত্মাকে কর্তা ভাবে, সে প্রকৃত সত্য দেখতে পারে না এবং তার বুদ্ধি বিকৃত। যে ব্যক্তি অহংকারশূন্য এবং যার বুদ্ধি অপরিষ্কৃত নয়, সে যদি সকলকে হত্যা করেও, সে আসলে হত্যা করে না, এবং কোনো বন্ধনে আবদ্ধ হয় না। কর্মের তিনটি উদ্দীপক—জ্ঞান, জ্ঞানীয় বস্তু এবং জ্ঞানী। আবার কর্মের তিনটি উপাদান—উপকরণ, কর্ম এবং কর্তা। এই জ্ঞান, কর্ম ও কর্তাকে গুণভেদে তিন প্রকারে ভাগ করা হয়েছে। যে-জ্ঞান দ্বারা সর্বত্র অবিভক্ত, অবিনাশী একত্ব দেখা যায়, সেটি সত্ত্বিক জ্ঞান। যে-জ্ঞান দ্বারা বিচিত্র রূপে পৃথক পৃথক সত্তা দেখা হয়, সেটি রাজসিক জ্ঞান। আর যে-জ্ঞান কেবল একটি ক্ষুদ্র বিষয়ের মধ্যে সর্বস্ব দেখে, যুক্তিহীন, অসত্য ও তুচ্ছ—সেটি তামসিক জ্ঞান। যে-কর্ম শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী, আসক্তি ও ফলের আকাঙ্ক্ষা ছাড়াই করা হয়, সেটি সত্ত্বিক কর্ম। যে-কর্ম ফলের আশা বা অহংকার নিয়ে, প্রচুর কষ্ট সহ্য করে করা হয়, সেটি রাজসিক কর্ম। আর যে-কর্ম অজ্ঞতা থেকে, পরিণাম, ক্ষতি, অপরের অনিষ্ট বা নিজের সামর্থ্য বিচার না করে করা হয়, সেটি তামসিক কর্ম। যিনি কর্ম করেন আসক্তি ছাড়াই, ‘আমি কর্তা’—এই ভাবনা ছাড়াই, দৃঢ়তা ও উৎসাহে, সাফল্য-ব্যর্থতায় অচঞ্চল থেকে, তিনি সত্ত্বিক কর্তা। আর যিনি ফলের প্রতি লোভী, হিংস্র, অপবিত্র, আনন্দ ও দুঃখে অস্থির—তিনি রাজসিক কর্তা।” এভাবে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কর্ম, জ্ঞান, ত্যাগ ও দানের প্রকৃত স্বরূপ, তাদের গুণভেদ, এবং কিভাবে শুদ্ধচিত্তে কর্তব্য পালন করতে হয়, তা শ্রদ্ধাভরে বুঝিয়ে দিলেন।