কুরুক্ষেত্রের মহারণভূমিতে, বিষণ্ণ ও দ্বিধাগ্রস্ত অর্জুনের প্রতি ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্নেহভরে উপদেশ দিতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, “কুন্তীপুত্র, ইন্দ্রিয় ও বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে শীত-উষ্ণ, সুখ-দুঃখের মতো অনুভূতিগুলো জন্মায় ও চলে যায়—এরা চিরস্থায়ী নয়, ক্ষণস্থায়ী মাত্র। তাই, হে ভারত, তুমি ধৈর্য সহকারে এগুলো সহ্য করো। যে ব্যক্তি সুখ-দুঃখে অচঞ্চল ও বিচলিত হয় না, হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, সেই প্রকৃতপক্ষে অমৃতত্বের যোগ্য। এই জগতের যা অসত্য, তার কোনো অস্তিত্ব নেই, আর যা সত্য, তার কোনো বিলুপ্তি নেই—এই দুইয়ের প্রকৃত সত্য যারা তত্ত্বজ্ঞ, তারা উপলব্ধি করেছেন। জেনে রাখো, যা সমস্ত কিছুতে পরিব্যাপ্ত, তা অবিনাশী; কেউই এই অক্ষয় সত্তার বিনাশ ঘটাতে পারে না। দেহগুলি অবশ্যই নশ্বর, কিন্তু দেহধারী আত্মা চিরন্তন, অবিনাশী ও অপরিমেয়; অতএব, হে ভারত, তুমি যুদ্ধ করো। যে ভাবে ভাবে, ‘আমি হত্যা করি’ বা ‘আমি নিহত হই’, তারা কেউই সত্য বুঝতে পারে না; আত্মা না কাউকে হত্যা করে, না নিজে নিহত হয়। আত্মা কখনো জন্মায় না, কখনো মরে না; একবার অস্তিত্ব লাভ করলে, তা কখনো বিলুপ্ত হয় না। আত্মা অজন্মা, চিরন্তন, অবিনাশী, প্রাচীন—দেহ ধ্বংস হলেও আত্মার কিছু হয় না। হে পার্থ, যে ব্যক্তি আত্মাকে অবিনাশী, চিরন্তন, অজন্মা ও অপরিবর্তনীয় বলে জানে, সে কিভাবে কাউকে হত্যা করতে পারে বা করাতে পারে? যেমন পুরাতন জামা বদলে মানুষ নতুন জামা পরে, তেমনই দেহধারী আত্মা পুরাতন দেহ ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করে। এই আত্মাকে অস্ত্র দ্বারা কাটা যায় না, অগ্নি দ্বারা পোড়ানো যায় না, জল দ্বারা ভেজানো যায় না, বাতাস দ্বারা শুকানো যায় না। এটি অখণ্ডনীয়, অদাহ্য, অজলীয়, অশোষ্য; এটি চিরন্তন, সর্বব্যাপী, স্থিতিশীল, অচল ও প্রাচীন। এই আত্মা অব্যক্ত, অচিন্ত্য ও অপরিবর্তনীয় বলে বিবেচিত; তাই জেনে তুমি শোক করো না। আর যদি ভাবো আত্মা বারবার জন্মায় ও মরে, তবুও, হে মহাবাহু, এভাবে শোক করার কিছু নেই। কারণ, যার জন্ম হয়েছে তার মৃত্যু নিশ্চিত, আর যার মৃত্যু হয়েছে তার জন্মও অবশ্যম্ভাবী; তাই অবধারিতের জন্য শোক করো না। সব প্রাণী জন্মের পূর্বে অব্যক্ত, মাঝে প্রকাশিত, শেষে আবার অব্যক্ত—তাহলে এ নিয়ে দুঃখ কিসের? কেউ কেউ আত্মাকে আশ্চর্য মনে করে দেখে, কেউ আশ্চর্য মনে করে বলে, কেউ শোনে, আবার কেউ শোনার পরও তা বোঝে না। সব জীবের দেহে আত্মা চিরকাল অবিনাশী, হে ভারত; অতএব, কোনো প্রাণীর জন্য শোক করো না। নিজের কর্তব্যের দিক থেকেও তোমার দ্বিধা করা উচিত নয়; একজন ক্ষত্রিয়ের জন্য ধর্মযুদ্ধের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কিছু নেই। হে পার্থ, সৌভাগ্যবান সেই যোদ্ধারা, যারা এমন স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মযুদ্ধ পায়—যা স্বর্গের দ্বার খুলে দেয়। কিন্তু তুমি যদি এই ধর্মযুদ্ধে অংশ না নাও, কর্তব্য ও কীর্তি ত্যাগ করো, তবে পাপের ভাগী হবে। লোকেরা তোমার চিরস্থায়ী কুখ্যাতি নিয়ে আলোচনা করবে, আর সম্মানপ্রাপ্তের জন্য অপমান মৃত্যু অপেক্ষা কঠিন। মহারথীরা ভাববে, তুমি ভয়ে যুদ্ধ পরিত্যাগ করেছ; যারা পূর্বে তোমার অনেক প্রশংসা করেছিল, তাদের কাছে তুমি লজ্জিত হবে। তোমার শত্রুরা তোমার শক্তি নিয়ে নিন্দা করবে, অশোভন কথা বলবে—এ চেয়ে বেদনাদায়ক আর কিছু হতে পারে না। যদি নিহত হও, স্বর্গ লাভ করবে; জয়ী হলে ভোগ করবে পৃথিবী—তাই, হে কুন্তীপুত্র, দৃঢ় সংকল্পে যুদ্ধের জন্য উঠো। সুখ-দুঃখ, লাভ-লোকসান, জয়-পরাজয় সমভাবে গ্রহণ করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও; তবেই পাপ হবে না। এখন পর্যন্ত তোমাকে জ্ঞানতত্ত্বের দিক থেকে বলেছি; এবার শোনো সাধনার দিক থেকে। এই জ্ঞান নিয়ে কর্ম করলেই কর্মবন্ধন থেকে মুক্তি পাবে। এই পথে সামান্য সাধনাও বৃথা যায় না, কোনো অকল্যাণ নেই; সামান্য সাধনাও মহাভয় থেকে রক্ষা করে। হে কৌরব-আনন্দ, এই পথে বুদ্ধি একাগ্র ও দৃঢ় থাকে; কিন্তু অস্থিরচিত্ত মানুষের বুদ্ধি অসংখ্য শাখায় বিভক্ত। যারা অজ্ঞান, তারা বেদের বাহারী কথায় আসক্ত থাকে—তারা মনে করে, এর বাইরে আর কিছু নেই। তারা কামনা ও স্বর্গলাভে আসক্ত, বহু বিধি-বিধানে পূর্ণ, ভোগ ও শক্তি লাভই তাদের লক্ষ্য। এই কামনা ও ভোগে আসক্ত মানুষের বুদ্ধি স্থিত হয় না, তাদের একাগ্রতা জন্মায় না। বেদ তিন গুণের বিষয় নিয়ে আলোচনা করে; তুমি গুণত্রয় ছাড়ো, দ্বন্দ্বাতীত হও, চিত্তে শুদ্ধ, লাভ-ক্ষয় নিয়ে উদাসীন, আত্মস্থিত হও। যে তত্ত্বজ্ঞ, তার কাছে যেমন সর্বত্র জল থাকলে কূপের প্রয়োজন হয় না, তেমনি তার কাছে সমস্ত বেদের কার্য সিদ্ধ। তোমার কর্তব্য কেবল কর্ম করা, ফলের অধিকার তোমার নয়; কর্মফলই যেন তোমার উদ্দেশ্য না হয়, এবং কর্মে অনাসক্তিও যেন না হয়। যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়ে, হে ধনঞ্জয়, আসক্তি ত্যাগ করে, সফলতা-ব্যর্থতায় সমভাবে থেকে কর্ম করো—সমত্বই যোগ। কর্ম অপেক্ষা জ্ঞানযোগ অনেক শ্রেষ্ঠ, হে ধনঞ্জয়; জ্ঞানকে আশ্রয় করো, কারণ ফলের আশায় কর্মীরা দুঃখভোগী হয়। জ্ঞানী ব্যক্তি এই জগতে ভালো-মন্দ কর্ম ত্যাগ করে, তাই যোগে নিযুক্ত হও, কারণ যোগই কর্মের নিপুণতা। জ্ঞানী, যোগে যুক্ত, কর্মফল ত্যাগ করে জন্মবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে চরম শান্তিতে পৌঁছায়। তোমার বুদ্ধি যখন মোহের জঙ্গল অতিক্রম করবে, তখন শোনা ও শোনার অযোগ্য সব বিষয়েই তুমি উদাসীন হবে। যখন তোমার বুদ্ধি, শোনা কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে, স্থির ও একাগ্র হবে, তখনই তুমি যোগ লাভ করবে।” এভাবে শ্রীকৃষ্ণ করুণাময় কণ্ঠে অর্জুনকে তত্ত্ব, কর্তব্য ও যোগের মহান পথ বুঝিয়ে দিলেন।