ভগবান বললেন, “আমি সেই ভিত্তি, যেখান থেকে ব্রহ্ম, অমরত্ব, অবিনাশী ও চিরন্তন ধর্ম এবং পরম আনন্দের উৎপত্তি। আমার ওপরই সবকিছুর ভিত্তি। শোনো, পাণ্ডব! এই সংসারে এক অদ্ভুত অশ্বত্থ বৃক্ষের কথা বলা হয়ে থাকে—যার মূল উপরে, শাখা-প্রশাখা নিচে ছড়িয়ে আছে, আর তার পাতাগুলো হলো বেদের মন্ত্রসমূহ। যে এই বৃক্ষকে সত্যভাবে জানে, সে-ই প্রকৃত বেদজ্ঞ। এই অশ্বত্থ বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা উপরে-নিচে বিস্তৃত, গুণসমূহ দ্বারা পুষ্ট, ইন্দ্রিয়বিষয়গুলিই তার কুঁড়ি। এর মূল নিচের দিকে প্রসারিত হয়ে মানুষের জগৎকে কর্মের মাধ্যমে বেঁধে রাখে। এই বৃক্ষের প্রকৃত রূপ, তার শুরু, শেষ, কিংবা ভিত্তি—এখানে কেউ স্পষ্টভাবে দেখতে পায় না। কিন্তু, যে ব্যক্তি বৈরাগ্যের শক্ত কুঠার দ্বারা এই গভীরমূল অশ্বত্থ বৃক্ষকে ছেদন করে, সে তখন সেই পথ অনুসন্ধান করে, যেখানে একবার পৌঁছে গেলে আর ফিরে আসতে হয় না। সেই প্রাচীন পুরুষের আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়, যাঁর থেকে চিরন্তন কর্মধারা প্রবাহিত হয়েছে। যারা অহংকার ও মোহ থেকে মুক্ত, আসক্তির দোষ জয় করেছে, সর্বদা আত্মনিষ্ঠ, সকল কামনা-বাসনা ত্যাগ করেছে, সুখ-দুঃখের দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত, তারা-ই সেই অবিনাশী অবস্থায় পৌঁছে যায়। সেখানে সূর্য, চন্দ্র কিংবা অগ্নি কোনো আলো দিতে পারে না; যারা সেখানে পৌঁছায়, তারা আর কখনও ফিরে আসে না—ওটাই আমার পরম ধাম। জেনে রাখো, জীবজগতে যে সকল জীবের আত্মা, তারা আমারই চিরন্তন অংশ, প্রকৃতিতে অবস্থান করে ইন্দ্রিয় ও মনকে আকর্ষণ করে। যখন পরমাত্মা শরীর ধারণ করেন বা ত্যাগ করেন, তখন তিনি ইন্দ্রিয় ও মনকে সঙ্গে নিয়ে যান, যেমন বাতাস সুগন্ধি স্থান থেকে সুবাস নিয়ে চলে যায়। এই পরমাত্মা কর্ণ, চক্ষু, স্পর্শ, জিহ্বা, নাসিকা ও মন—সবকিছুর অধিষ্ঠাতা হয়ে ইন্দ্রিয়বিষয়গুলি অনুভব করেন। মূঢ়রা তাঁকে দেখতে পায় না—তিনি কখন শরীর ত্যাগ করেন, থাকেন বা ভোগ করেন—কিন্তু জ্ঞানদৃষ্টিসম্পন্নরা তাঁকে প্রত্যক্ষ করে। সাধনায় ব্রতী যোগীরা তাঁকে নিজেদের অন্তরে দেখতে পান, কিন্তু অশুদ্ধচিত্ত, অজ্ঞরা চেষ্টা করেও তাঁকে দেখতে পারেন না। সূর্যের মধ্যে যে দীপ্তি, যা সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করে, চন্দ্র ও অগ্নির মধ্যেও যে জ্যোতি রয়েছে—জেনে রাখো, ওগুলো আমারই প্রকাশ। আমি পৃথিবীতে প্রবেশ করে আমার শক্তিতে সমস্ত প্রাণীকে ধারণ করি; আমি পুষ্টিকর চন্দ্র হয়ে সমস্ত উদ্ভিদকে রস দিয়ে পুষ্ট করি। আমি জীবদেহে অগ্নিরূপে অবস্থান করি, প্রশ্বাস-নিঃশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চতুর্বিধ আহারকে পাচন করি। আমি সর্বপ্রাণীর হৃদয়ে বিরাজমান; আমার থেকেই স্মৃতি, জ্ঞান ও বিস্মৃতি উদিত হয়। আমিই সকল বেদে জানবার যোগ্য, আমিই বেদান্তের রচয়িতা ও বেদজ্ঞ। এই সংসারে দুই প্রকার জীব আছে—ক্ষর ও অক্ষর। সমস্ত প্রাণী ক্ষর, আর অপরিবর্তনীয়কে অক্ষর বলা হয়। কিন্তু, এদের ঊর্ধ্বে রয়েছে এক পরম পুরুষ, যিনি তিন জগতে প্রবিষ্ট হয়ে তাদের ধারণ করেন—তিনি অব্যয় ঈশ্বর। আমি ক্ষরের ঊর্ধ্বে, অক্ষরেরও ঊর্ধ্বে; তাই জগৎ ও বেদে আমাকে পরম পুরুষ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। যে ব্যক্তি মোহমুক্ত হয়ে আমাকে এইভাবে পরম পুরুষরূপে জানে, সে-ই সমস্ত কিছু জানে এবং আমাকে সর্বান্তঃকরণে ভজনা করে। পুণ্যবান, এই হলো আমার সর্বোচ্চ গোপন উপদেশ। একে বুঝে যে ব্যক্তি কর্মে সিদ্ধ, সে-ই প্রকৃত জ্ঞানী ও কর্তব্যে নিপুণ হয়। এরপর ভগবান বললেন, “ভয়হীনতা, মনঃশুদ্ধি, জ্ঞান ও যোগে স্থিতি, দান, আত্মসংযম, যজ্ঞ, শাস্ত্রপাঠ, তপস্যা ও সরলতা—এসব গুণ; অহিংসা, সত্যনিষ্ঠা, ক্রোধহীনতা, ত্যাগ, প্রশান্তি, দোষদর্শনে অনাগ্রহ, প্রাণীদের প্রতি করুণা, লোভশূন্যতা, কোমলতা, লজ্জাবোধ, চঞ্চলতাহীনতা, উদ্যম, ক্ষমা, দৃঢ়তা, পবিত্রতা, শত্রুভাবহীনতা ও অহংকারশূন্যতা—এসব হলো দেবতুল্য স্বভাবের লক্ষণ, হে ভারত! অপরদিকে, ভণ্ডামি, ঔদ্ধত্য, অহংকার, ক্রোধ, কঠোরতা ও অজ্ঞতা—এই সব অসুরস্বভাবের লক্ষণ, হে পার্থ! দেবগুণ মুক্তির দিকে নিয়ে যায়, আর অসুরগুণ বন্ধনের দিকে ঠেলে দেয়। তুমি দুঃখ কোরো না, পাণ্ডব, কারণ তোমার মধ্যে দেবগুণের জন্ম হয়েছে। এই জগতে দুই প্রকার জীব সৃষ্টি হয়েছে—দৈব এবং অসুর। দৈব স্বভাবের কথা আমি বিশদে বলেছি, এখন অসুর স্বভাবের কথা শোনো। অসুর প্রকৃতির মানুষেরা কর্ম বা ত্যাগের পথ জানে না; তাদের মধ্যে নেই পবিত্রতা, শিষ্টাচার বা সত্য। তারা বলে, ‘এই জগৎ মিথ্যা, ভিত্তিহীন, ঈশ্বরবিহীন; কেবল কামনা থেকেই এর উৎপত্তি, আর কিছু নয়।’ এইরূপ ধারণায় তারা আত্মবিনাশী, অল্পবুদ্ধি, নির্মমকর্মপরায়ণ হয়ে জগতের বিনাশ ও অকল্যাণের জন্য উঠে দাঁড়ায়। তাদের কামনা অশেষ, ভণ্ডামি, অহংকার, দম্ভে পূর্ণ, মিথ্যা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শুচিতাহীন আচরণে লিপ্ত হয়। অসীম উদ্বেগে জর্জরিত, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কামনাসুখেই মগ্ন থাকে, এইটুকুই জীবনের অর্থ বলে মনে করে। শত শত আশার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে কামনা ও ক্রোধের দাসত্বে পড়ে, অন্যায় পথে সম্পদ সঞ্চয়ের জন্য চেষ্টা করে। তারা ভাবে, ‘আজ আমি এটা পেয়েছি, কাল ওটা পাব; এটা আমার, আরও হবে; ওই শত্রুকে আমি মেরেছি, আরও মারব; আমিই প্রভু, আমিই ভোগী, আমি শক্তিশালী, সুখী, ধনী, উচ্চকুলজাত, আমার সমকক্ষ কে আছে? আমি যজ্ঞ করব, দান করব, আনন্দ করব।’ এভাবে অজ্ঞানতার মোহজালে আবদ্ধ, বহু চিন্তায় বিভ্রান্ত, কামনাসুখে আসক্ত হয়ে তারা অপবিত্র নরকে পতিত হয়। নিজেকে বড় মনে করে, জেদি, অহংকার ও অর্থের দম্ভে অন্ধ, তারা নামমাত্র যজ্ঞ করে, নিয়মবিরুদ্ধভাবে, ভণ্ডামি ও অহংকারে পূর্ণ হয়ে। অহংকার, শক্তি, দম্ভ, কামনা ও ক্রোধকে আশ্রয় করে, নিজের ও অন্যের দেহে ঈশ্বরকে ঘৃণা করে, তারা হিংস্র হয়ে ওঠে। এইরূপ ঘৃণাপরায়ণ, নিষ্ঠুর, মানবজাতির অধমদের আমি বারবার অসুরযোনিতে নিক্ষেপ করি, তারা জন্মান্তরে দুঃখভোগ করে। এভাবেই ভগবান তাঁর গোপনতম জ্ঞান, জীব ও সংসারের প্রকৃতি, মুক্তি ও বন্ধনের পথ, দেব ও অসুর স্বভাবের স্পষ্ট পার্থক্য অত্যন্ত মমতায় ও বিশদভাবে প্রকাশ করলেন।