ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, “হে পার্থ, যে ভক্ত যেভাবে আমাকে বা অন্য কোনো দেবতাকে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পূজা করতে চায়, আমি তার সেই বিশ্বাসকে দৃঢ় করি। সেই বিশ্বাস নিয়ে সে ভক্ত যখন যে রূপে পূজা করে, তখন তার মনোবাসনা পূর্ণ হয়—কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, সেই ফল আমি-ই দিই। তবে, যারা সীমিত বুদ্ধিসম্পন্ন, তারা এইভাবে দেবতাদের পূজা করে যে ফল লাভ করে, তা ক্ষণস্থায়ী; দেবতাপূজকরা দেবলোকেই যায়, কিন্তু আমার ভক্তরা আমার কাছেই আসে। অনেকে অজ্ঞানতাবশত মনে করে, আমি—অব্যক্ত, নিরাকার—কখনো প্রকাশিত হয়ে উঠেছি; তারা আমার শ্রেষ্ঠ, অবিনাশী, চিরন্তন স্বরূপ জানে না। আমি সকলের কাছে প্রকাশিত নই, কারণ আমার যোগমায়া দ্বারা আমি আচ্ছন্ন; এই মোহগ্রস্ত পৃথিবী আমাকে চেনে না—আমি অব্যক্ত, অজন্মা, অবিনাশী। হে অর্জুন, আমি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল প্রাণীকে জানি, কিন্তু কেউ আমাকে সম্পূর্ণভাবে জানতে পারে না। জন্মের সময় সকল প্রাণী মোহগ্রস্ত হয়ে যায়, কারণ তাদের মনে দ্বন্দ্ব—রাগ ও আসক্তি থেকে উৎপন্ন হয়। তবে যারা পাপমুক্ত, সৎকর্মে নিয়োজিত, দ্বন্দ্বমুক্ত, তারা দৃঢ় সংকল্পে আমাকে পূজা করে। যারা বার্ধক্য ও মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে চায় এবং আমার আশ্রয় নেয়, তারা ব্রহ্ম, আত্মা, এবং কর্মের প্রকৃত স্বরূপ জানতে পারে। যারা আমাকে সত্তা, দেবতা ও যজ্ঞের সর্বোচ্চ স্বরূপ জানে, এবং মনোযোগী থাকে, তারা মৃত্যুর সময়ও আমাকে চিনতে পারে। এমন সময় অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন, “হে পুরুষোত্তম, ব্রহ্ম কী? আত্মা কী? কর্ম কী? সত্তা ও দেবতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কী? এবং শরীরের মধ্যে যজ্ঞের সর্বোচ্চ কে? মৃত্যু মুহূর্তে আপনাকে কীভাবে জানবে সংযমী ব্যক্তি?” ভগবান বললেন, “অক্ষর—অবিনাশী—তাই সর্বোচ্চ ব্রহ্ম; নিজের স্বভাবই আত্মা; প্রাণীদের সৃষ্টির জন্য যে শক্তি কাজ করে, তা-ই কর্ম। প্রাণীর ক্ষেত্রে ক্ষয়শীল দিকটাই সর্বোচ্চ, দেবতার ক্ষেত্রে পুরুষই সর্বোচ্চ, আর শরীরের মধ্যে যজ্ঞের সর্বোচ্চ আমি-ই। আর যে ব্যক্তি মৃত্যুসময়ে আমাকে স্মরণ করে দেহত্যাগ করে, সে আমার অবস্থায় পৌঁছে যায়—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যে যেই অবস্থায় মৃত্যুকালে স্মরণ করে, সে সেই অবস্থায়ই পৌঁছায়। তাই, হে অর্জুন, সর্বদা আমাকে স্মরণ করে যুদ্ধে লিপ্ত হও; মন ও বুদ্ধি আমাকে নিবেদন করলে, তুমি নিশ্চয়ই আমার কাছে পৌঁছাবে। যোগাভ্যাসে নিয়ন্ত্রিত মন দিয়ে, সর্বদা সর্বোচ্চ দেবতাকে স্মরণ করলে, সে-ই আমাকে লাভ করে। যে ব্যক্তি প্রাচীন, সর্বজ্ঞ, সূক্ষ্মের চেয়েও সূক্ষ্ম, সর্বপালক, অবর্ণনীয় রূপ, সূর্যের মতো উজ্জ্বল এবং অন্ধকারের ঊর্ধ্বে—এই স্বরূপকে স্মরণ করে, সে-ই আমাকে পায়। মৃত্যুসময়ে, অনড় মনে, ভক্তি ও যোগের শক্তিতে, প্রাণকে ভ্রূমধ্যস্থলে স্থাপন করে, সে সেই সর্বোচ্চ দেবতাকে লাভ করে। যে অবিনাশী অবস্থাকে বৈদিক জ্ঞানীরা জানে, যে অবস্থায় আসক্তিমুক্ত তপস্বীরা প্রবেশ করে, এবং যার জন্য ব্রহ্মচর্য্য পালন করে—সে লক্ষ্যের কথা সংক্ষেপে বলি। ইন্দ্রিয়দ্বারসমূহ সংযত করে, মনকে হৃদয়ে আবদ্ধ করে, প্রাণকে মস্তকের শীর্ষে স্থাপন করে, যোগে স্থির থেকে, ওম্—এই একমাত্র অক্ষর উচ্চারণ করে, আমায় স্মরণ করে যে দেহত্যাগ করে, সে সর্বোচ্চ গন্তব্যে পৌঁছায়। হে পার্থ, যে যোগী সর্বদা আমাকে স্মরণ করে, বিভ্রান্তিহীন মনে, সে সহজেই আমাকে লাভ করে। যারা আমার কাছে পৌঁছায়, তারা আর এই দুঃখময়, অনিত্য জগতে ফিরে আসে না। ব্রহ্মার লোক পর্যন্তও পুনর্জন্মের শৃঙ্খল আছে, কিন্তু আমার অবস্থায় এলে আর পুনর্জন্ম নেই। যারা জানে ব্রহ্মার একদিন সহস্র যুগের সমান এবং একরাত্রিও সহস্র যুগের সমান, তারাই প্রকৃতভাবে দিন-রাত্রির স্বরূপ বোঝে। অব্যক্ত থেকে দিবাসময়ে সমস্ত প্রাণী প্রকাশিত হয়, আর রাত্রি হলে তারা আবার অব্যক্তে লীন হয়। প্রকৃতির নিয়মে এই সৃষ্টি বারবার প্রকাশিত হয় ও লয় হয়। তবে সেই অব্যক্তের ঊর্ধ্বে আরেকটি চিরন্তন অব্যক্ত আছে, যা সমস্ত প্রাণী বিনষ্ট হলেও বিনষ্ট হয় না। একে-ই অক্ষর বলে, একেই সর্বোচ্চ গন্তব্য বলে, যা একবার লাভ করলে আর ফিরে আসতে হয় না—এটাই আমার সর্বোচ্চ ধাম। একনিষ্ঠ ভক্তি দ্বারা এই সর্বোচ্চ পুরুষকে লাভ করা যায়; সমস্ত কিছুই তার মধ্যে অবস্থিত, এবং তিনি সর্বত্র ব্যাপ্ত। হে শ্রেষ্ঠ ভরতবংশীয়, কখন যোগীরা দেহত্যাগ করলে আর ফিরে আসে না, আর কখন ফিরে আসে—তাও বলি। অগ্নি, আলো, দিন, শুক্লপক্ষ ও উত্তরায়ণের ছয় মাস—এই সময় যাঁরা দেহত্যাগ করেন, তাঁরা ব্রহ্মকে জেনে ব্রহ্মলোকে যায় ও আর ফিরে আসেন না। ধোঁয়া, রাত্রি, কৃষ্ণপক্ষ ও দক্ষিণায়ণের ছয় মাস—এই পথে যাঁরা যায়, তাঁরা চন্দ্রলোকে গিয়ে ফিরে আসে। এই দুটি পথ—উজ্জ্বল ও অন্ধকার—চিরন্তন; এক পথে গেলে আর ফেরা নেই, অন্য পথে গেলে আবার জন্ম হয়। এই পথ দুটি জানলে কোনো যোগীর মোহ হয় না; তাই সর্বদা যোগে স্থিত হও, হে অর্জুন। এইসব জানলে, যোগী বেদ, যজ্ঞ, তপস্যা ও দানের সমস্ত ফল ছাড়িয়ে, সেই আদ্যন্ত ধামে পৌঁছে যায়। এবার ভগবান বললেন, “হে অর্জুন, তুমি নিরাসক্ত ও নির্দ্বন্দ্ব বলে তোমাকে আমি এই গুহ্যতম জ্ঞান ও প্রত্যক্ষ উপলব্ধির কথা বলছি; এটি জানলে তুমি সমস্ত অশুভ থেকে মুক্ত হবে। এই জ্ঞান রাজবিদ্যা, রাজগুহ্য, অতি পবিত্র, সরাসরি উপলব্ধিযোগ্য, ধর্মসম্মত, সহজে পালনীয় এবং অবিনাশী।