কুরুক্ষেত্রের সেই মহারণভূমিতে, দ্বিধাগ্রস্ত অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাপন্ন হয়ে বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “হে কেশব, যাঁর চিত্ত স্থির, যিনি অন্তরে একাগ্র, তাঁকে কিভাবে চেনা যায়? স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষ কেমন কথা বলেন, কেমন বসেন, বা কেমন চলেন?” তখন ভগবান মধুসূদন স্নেহভরে বললেন, “হে পার্থ, যখন মন থেকে সমস্ত কামনা-বাসনা ত্যাগ করে, এবং আত্মাতেই আত্মসন্তুষ্ট থাকে, তখন তাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয়। যে ব্যক্তি দুঃখে বিচলিত হয় না, সুখে আসক্তি হারিয়েছে, এবং মমতা, ভয়, ক্রোধ থেকে মুক্ত—তাকেই স্থিতপ্রজ্ঞ মুনি বলা হয়। যে সর্বত্র অনাসক্ত, শুভ বা অশুভ কিছু লাভ করলেও আনন্দিত বা বিরক্ত হয় না, তার জ্ঞান সুপ্রতিষ্ঠিত। যখন কেউ কচ্ছপের মতো ইন্দ্রিয়গুলিকে বিষয়বস্তুর থেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারে, তখনই তার জ্ঞান স্থিত। ইন্দ্রিয়বিষয়ে আসক্তি থেকে সরে গেলেও, আস্বাদ থেকে মুক্তি পেতে হলে পরমেশ্বর দর্শন প্রয়োজন। কিন্তু হে কুন্তিপুত্র, চঞ্চল ইন্দ্রিয়গণ সাধক মুনিদের মনও বহুবার টেনে নিয়ে যায়। তাই, যে ব্যক্তি সমস্ত ইন্দ্রিয় সংযত করে, আমাকে চিত্তে স্থাপন করে স্থির হয়ে বসে, তারই জ্ঞান সুপ্রতিষ্ঠিত। কারণ, যখন কেউ ইন্দ্রিয়বিষয়ে আসক্ত হয়, তখন আসক্তি জন্ম নেয়; আসক্তি থেকে কামনা, কামনা থেকে ক্রোধ; ক্রোধ থেকে মূঢ়তা, মূঢ়তা থেকে স্মৃতিভ্রংশ, স্মৃতিভ্রংশ থেকে বুদ্ধিনাশ, আর বুদ্ধিনাশ হলে সে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু যে ব্যক্তি সংযমিত ইন্দ্রিয় নিয়ে, আসক্তি ও দ্বেষমুক্তভাবে, আত্মসংযমে চলাফেরা করে, সে প্রশান্তি লাভ করে। প্রশান্ত মনে সমস্ত দুঃখ দূরীভূত হয় এবং তার চিত্ত দ্রুত স্থির হয়। যাঁর মন স্থির নয়, তাঁর জ্ঞান নেই; যাঁর ধ্যান নেই, তাঁর শান্তি নেই; আর শান্তি ছাড়া কখনোই সুখ আসতে পারে না। যখন মন চঞ্চল ইন্দ্রিয়ের পেছনে ছুটে, তখন তা জলপথে নৌকাকে বাতাস যেভাবে টেনে নিয়ে যায়, সেভাবে চিত্তকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তাই, হে মহাবাহু, যিনি ইন্দ্রিয়কে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছেন, তাঁরই জ্ঞান সুপ্রতিষ্ঠিত। যা সমস্ত প্রাণীর জন্য রাত্রি, তা সংযমী সাধকের জন্য জাগরণ; আর যাহাতে সমস্ত প্রাণী জাগ্রত, তা জ্ঞানীর কাছে রাত্রি। যেমন নানা নদী ও জলধারা সমুদ্রের মধ্যে প্রবেশ করলেও সমুদ্র অচঞ্চল ও সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে, তেমনি নানা কামনা স্থিরচিত্ত পুরুষের মধ্যে প্রবেশ করলেও সে বিচলিত হয় না; শান্তি সে-ই পায়, যে কামনার পিছনে ছোটে না। যে সব কামনা ত্যাগ করেছে, আকাঙ্ক্ষাহীন, মমত্ব ও অহংকারশূন্য, সে-ই প্রকৃত শান্তি লাভ করে। হে পার্থ, এটাই ব্রহ্মস্থিতি—এ অবস্থায় পৌঁছে কেউ আর মোহগ্রস্ত হয় না; এবং জীবনের অন্তিম মুহূর্তেও এতে প্রতিষ্ঠিত থাকলে ব্রহ্মনির্বাণ লাভ হয়। এ পর্যায়ে অর্জুন আবার প্রশ্ন করেন, “হে জনার্দন, আপনি যদি কর্মের চেয়ে জ্ঞানকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন, তবে কেন আমাকে এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধে প্রবৃত্ত করছেন, হে কেশব? আপনার বাক্য আমার বুদ্ধিকে যেন বিভ্রান্ত করছে; আপনি স্পষ্টভাবে বলুন, কোন পথে আমি শ্রেষ্ঠ কল্যাণ লাভ করতে পারি।” ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তখন বললেন, “হে নিষ্পাপ, এই পৃথিবীতে আমি পূর্বেও দুই প্রকার পথ বলেছি—সংখ্যদের জন্য জ্ঞানযোগ এবং যোগীদের জন্য কর্মযোগ। শুধু কর্মবর্জন করলেই কর্মফল থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না, এবং শুধু ত্যাগ করলেই সিদ্ধি আসে না। প্রকৃতির গুণে বাধ্য হয়ে কেউই এক মুহূর্তও কর্ম ছাড়া থাকতে পারে না। যে ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে কর্মসংযমী, কিন্তু মনে মনে ইন্দ্রিয়বিষয়ে আসক্ত, সে মিথ্যাচারী। কিন্তু যে ব্যক্তি মন দিয়ে ইন্দ্রিয় সংযম করে, অনাসক্তভাবে কর্মে প্রবৃত্ত হয়, সে-ই শ্রেষ্ঠ। তাই, হে অর্জুন, নির্ধারিত কর্ম পালন করো, কারণ কর্ম অক্রিয়া অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এমনকি দেহধারণও কর্ম ছাড়া সম্ভব নয়। এ জগতে যেসব কর্ম যজ্ঞের জন্য নয়, তা বন্ধন সৃষ্টি করে; অতএব, হে কুন্তিপুত্র, আসক্তিহীনভাবে যজ্ঞার্থে কর্ম করো। সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টির সূচনায় যজ্ঞসহ প্রাণীদের সৃষ্টি করে বলেছিলেন—‘এ দ্বারা তোমরা বৃদ্ধি পাবে, এ-ই তোমাদের কামনা পূর্ণ করবে।’ যজ্ঞ দ্বারা দেবতাদের পুষ্ট করো, দেবতারা তোমাদের পুষ্ট করবে; একে অপরকে পুষ্ট করে তোমরা শ্রেষ্ঠ কল্যাণ লাভ করবে। যজ্ঞে সন্তুষ্ট দেবতারা তোমাদের আকাঙ্ক্ষিত ভোগ দান করবেন; কিন্তু যারা তাদের ভাগ না দিয়ে শুধু ভোগ করে, তারা চোর। যজ্ঞের অবশিষ্ট গ্রহণকারীরা পাপমুক্ত হয়; কিন্তু যারা শুধু নিজের জন্য রান্না করে, তারা পাপই খায়। সমস্ত প্রাণী খাদ্য থেকে জন্মায়, খাদ্য বৃষ্টি থেকে, বৃষ্টি যজ্ঞ থেকে, যজ্ঞ কর্ম থেকে, কর্ম বেদ থেকে, আর বেদ অব্যয় ব্রহ্ম থেকে। অতএব, সর্বব্যাপী বেদ সর্বদা যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিত। যে ব্যক্তি এই চক্র অনুসরণ করে না, এবং ইন্দ্রিয়সুখে ডুবে থাকে, সে বৃথা জীবন কাটায়, পাপাচারে লিপ্ত হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি আত্মাতেই আনন্দিত, আত্মাতেই তৃপ্ত এবং আত্মাতেই সম্পূর্ণ, তার আর কিছু করার নেই। তার জন্য কর্ম বা অকর্মে কিছুই লাভ বা ক্ষতি নেই; সে কারও ওপর নির্ভরশীলও নয়। তাই, সর্বদা কর্তব্য কর্ম অনাসক্তভাবে পালন করো; কারণ অনাসক্তভাবে কর্ম করলেই শ্রেষ্ঠ সিদ্ধি লাভ হয়। অতীতের জনক প্রভৃতি রাজারা কর্মের দ্বারাই সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। এমনকি জগতের কল্যাণের জন্যও তোমার কর্ম করা উচিত। কারণ, যে ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ, তার আচরণ অন্যেরা অনুসরণ করে; সে যা আদর্শ স্থাপন করে, সারা বিশ্ব তাই গ্রহণ করে।