একদিন, এক মহৌষধি ছিল, যার প্রলেপ শরীরের এক অঙ্গ থেকে আরেক অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ত, কঠিনের ওপর কঠিনে ছুঁয়ে যেত। সেই শক্তিশালী প্রলেপ থেকে যেন রুদ্রর মতো তীব্র রোগ দূরীভূত হয়—যেমন মধ্য দাঁত কঠিন কিছু ছিন্ন করে দেয়। যে এই প্রলেপ ধারণ করে, তার কাছে কোনো অভিশাপ, কোনো জাদু, কোনো বিলাপ পৌঁছায় না; ছড়িয়ে পড়া বিষও তাকে স্পর্শ করতে পারে না। হে মহৌষধি, তুমি আমাদের রক্ষা করো—কু-উচ্চারণ, দুঃস্বপ্ন, কুকর্ম, অশুচিতা, আর চোখের তীব্র যন্ত্রণা থেকে। এই মহৌষধি সম্পর্কে সত্য জানি বলে আমি সত্য কথা বলি, মিথ্যা নয়—তুমি যেন আমার ঘোড়া, গরু, নিজেকে এবং তোমার মানুষকে রক্ষা করো। এই প্রলেপের তিন সেবক—জ্বর, যক্ষ্মা আর দহন; পাহাড়দের মধ্যে প্রবীণ, ত্রিককুদ, তার পিতা। যখন এই প্রলেপ ত্রিককুদ থেকে উৎপন্ন হয়ে হিমালয়ের ওপারে উঠল, তখন সে সমস্ত জাদুকর ও জাদুর শক্তিকে দমন করল। তুমি যদি ত্রিককুদের হও, কিংবা যমুনার নামে পরিচিত হও—তোমার এই দুই শুভ নামেই আমাদের রক্ষা করো, হে মহৌষধি। অন্য দিকে, এক স্বর্ণজন্মা শঙ্খের কথা বলা হয়—যে জন্মেছিল বায়ু, মধ্যাকাশ, বিদ্যুৎ ও আলো থেকে। সেই সরু, শুভ্র শঙ্খ যেন আমাদের অকল্যাণ থেকে রক্ষা করে। এই শঙ্খ, দেবতাদের আগেও, সমুদ্র থেকে জন্ম নিয়েছিল; তার দ্বারা অসুরদের পরাজিত করে আমরা সমস্ত বাধা অতিক্রম করি। শঙ্খ দিয়ে আমরা রোগ, অমঙ্গল এবং চিরশত্রুদের দূর করি; এই শঙ্খ সর্বজনীন ঔষধ—সে আমাদের রক্ষা করুক। শঙ্খ স্বর্গে জন্মেছিল, সমুদ্র থেকে উদ্ভূত, নদীতে ভেসে আসা; জীবনের পারাপারের রত্ন, সে আমাদের রক্ষা করুক। এই রত্ন সমুদ্র থেকে জন্ম নিয়েছে, সূর্য—অর্থাৎ বৃত্রনাশক থেকে জন্ম নিয়েছে; সে যেন আমাদের সর্বত্র দেব-অসুরের অস্ত্র থেকে রক্ষা করে। তুমি স্বর্ণের মধ্যে অনন্য, সোম থেকে জন্মানো; রথে দৃশ্যমান, তূণে দীপ্তিমান; তুমি যেন আমাদের দীর্ঘজীবনের পারাপার করো। দেবতাদের সরু অস্থি এভাবে জলে বিচরণ করে; আমি তোমাকে বেঁধে রাখি জীবন, দীপ্তি, শক্তি, দীর্ঘায়ু ও শত শরৎকালের জন্য—তুমি আমাদের রক্ষা করো। এবার, বলশালী বল পৃথিবী ও আকাশকে ধারণ করেছে; সে বিস্তৃত মধ্যাকাশ, ছয় দিক এবং সমস্ত জগতে প্রবেশ করেছে। ইন্দ্রই সেই বল, তিনি পশুর রক্ষা করেন; ত্রিচক্র পথ নির্ধারণ করে, অতীত-ভবিষ্যৎ ও জগতের দুধ দোহন করেন, দেবতাদের সমস্ত ব্রত পালন করেন। ইন্দ্র, মানুষের মধ্যে জন্ম নিয়ে, অন্তরে গরম ঘর্মের মতো বিচরণ করেন—তিনি যেন উত্তম সন্তানসমৃদ্ধ ঘর ত্যাগ না করেন, না আহার করেন, না অণডুহাকে দোহন করেন, জ্ঞানী হয়ে। অণডুহা, যাকে দোহন করা যায় না, সে সুকর্মের ফল দেয়; শুদ্ধকারী সামনের দিক থেকে পূর্ণ করেন; বৃষ্টি তার ধারা, মরুত তার স্তন, যজ্ঞ তার দুধ, দক্ষিণা তার দোহন। যার প্রভু যজ্ঞের অধিকারী নয়, যার যজ্ঞ নিজের নয়, যার দাতা বা গ্রহীতা নেই—যে সকলকে জয় করে, সকলকে ধারণ করে, সমস্ত কর্ম করে—তাকে বলো, সে ঘর্মা চতুষ্পদ হোক বা দ্বিপদ। যার দ্বারা দেবতারা শরীর ত্যাগ করে স্বর্গে গিয়েছিল, অমরত্বের নাভিতে পৌঁছেছিল—আমরা সেই বিখ্যাত ঘর্মার ব্রত ও তপস্যায় সুকর্মের জগৎ লাভ করি। ইন্দ্র রূপে, অগ্নি বাহক হয়ে, প্রজাপতি শ্রেষ্ঠ, বিরাট—সবাই বিশ্বাগ্নিতে, বৈশ্বানরে, অণডুহায় প্রবেশ করেছে; তিনিই স্থাপন করেছেন, তিনিই ধারণ করেছেন। এটাই অণডুহার মধ্যভাগ, যেখানে বাহক স্থাপিত; পূর্বে যতদূর, পশ্চিমেও ততদূর। যে অণডুহার সাত দোহনস্থান জানে ও ক্রম অনুসরণ করে, সে সন্তান ও জগৎ পায়—সপ্তর্ষিরা এভাবেই জানতেন। তারা পায়ে চেপে, পিণ্ডিতে খনন করে অন্ন বের করেছেন; শ্রমে অণডুহা ও চাষি উভয়ে রসের কাছে পৌঁছায়। এই বারো রাত্রি প্রজাপতির ব্রত; যে ব্রহ্ম জানে, সেটাই অণডুহার ব্রত। এটি সন্ধ্যায়, সকালে, মধ্যাহ্নে সর্বত্র দোহন হয়; যে দোহনের সময় জানে ও ক্রমানুসারে অনুসরণ করে, সে জানে। এবার, ওষধির উদ্দেশ্যে বলা হয়—তুমি চিকিৎসক, ভাঙা-চূর্ণ-বিভক্ত সব সারাও; সত্যিকার নিরাময়কারী যেন নিরাময় ঘটান। তোমার দেহে যা ভেঙেছে, ছিঁড়েছে, চূর্ণ হয়েছে, স্রষ্টা শুভলগ্নে আবার একত্রিত করুন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জোড়া লাগান। তোমার মজ্জা মজ্জার সঙ্গে, সন্ধি সন্ধির সঙ্গে যুক্ত হোক; যা মাংস থেকে পড়ে গেছে, হাড়সহ আবার বৃদ্ধি পাক। মজ্জা-মজ্জা, চামড়া-চামড়া, রক্তে হাড়, মাংসে মাংস যুক্ত হোক। চুলের সঙ্গে চুল, চামড়ার সঙ্গে চামড়া; হে ওষধি, হাড় রক্তে বৃদ্ধি পাক, কাটা অংশ জোড়া লাগাও। উঠে দাঁড়াও, এগিয়ে চলো, দৌড়াও, রথটি সু-চক্র, সু-যুক্ত, সু-নাভিযুক্ত; সোজা হয়ে দাঁড়াও। যদি অক্ষ থেকে পড়ে ভেঙে যায়, কিংবা পাথরে আঘাতে চূর্ণ হয়, তাহলে রিভুগণ যেন রথের মতো সন্ধি সন্ধিতে যুক্ত করেন। দেবতারা স্থাপন করেছেন, দেবতারা আবার উত্তোলন করেছেন; দেবতারা সম্পূর্ণ করেছেন, পুনরায় জীবিত করেছেন। এই দুই বায়ু, হে বায়ু, নদীর দূর তীর থেকে আসে; একটিতে দক্ষতা আসুক, অন্যটি অকল্যাণ দূর করুক। হে বায়ু, নিরাময় আনো; হে বায়ু, অকল্যাণ দূর করো; তুমি সর্বজনীন চিকিৎসক, দেবতাদের দূত হয়ে চলো। দেবতারা যেন এই মানুষকে রক্ষা করেন, মরুতগণ যেন রক্ষা করেন; সমস্ত প্রাণী যেন রক্ষা করে, যাতে সে অকল্যাণ থেকে মুক্ত থাকে। আমি তোমার কাছে আশীর্বাদ ও নিরাপত্তার উপায় নিয়ে এসেছি; তোমাকে শক্তি, তীব্রতা ও বল দিচ্ছি; তোমার থেকে রোগ দূর করি। আমার এই হাত শুভ, তার চেয়ে অধিক শুভ; এ-ই সর্বজনীন চিকিৎসক, এ-ই মঙ্গলস্পর্শ। দুই হাতে, দশ আঙুলে, বাক্যনেত্রী জিহ্বায়, আরোগ্যদায়িনী হাতে—এইসব দিয়ে আমরা তোমাকে স্পর্শ করি। এভাবেই, ঔষধি, শঙ্খ, বল, অণডুহা, ওষধি ও বায়ুর আশীর্বাদ ও শক্তিতে, দেবতা ও ঋষিদের জ্ঞান ও ব্রত পালনে, মানবজীবন সুরক্ষিত, সুস্থ ও কল্যাণময় হয়ে ওঠে।