প্রাচীন কালের এক মহৎ সময়ে ঋষিরা দেবতাদের স্মরণ করে এক মহাযজ্ঞে প্রবৃত্ত হলেন। তাঁরা ব্রহ্মণস্পতিকে আহ্বান জানালেন, যেন সেই শক্তি দ্বারা, যেই শক্তি দিয়ে দেবতারা স্বয়ং সব্যিতৃ দেবতাকে স্থাপন করেছিলেন, সেই শক্তিতেই যেন এই যজ্ঞের অধিকারীকে সর্বশক্তিমান ও রাজ্যভোগী করে তোলেন। তারা প্রার্থনা করলেন, যেন ইন্দ্রকে দীর্ঘায়ু ও মহাশক্তি প্রদান করা হয়, যেন বার্ধক্য কখনও তাঁকে পরাস্ত করতে না পারে, এবং তিনি সর্বদা তাঁর রাজ্য ও কর্তব্যে সদা জাগ্রত থাকেন। তাঁরা আবার প্রার্থনা করলেন, যেন ইন্দ্র দীর্ঘায়ু ও মহাশ্রবণশক্তি লাভ করেন, বার্ধক্য তাঁকে যেন কখনও দুর্বল না করে তোলে, তিনি যেন চিরকাল তাঁর শ্রবণে জাগ্রত থাকেন। ঋষিরা আরও বললেন, “হে দেবগণ, আমাদের উজ্জ্বলতায় পরিবেষ্টিত করো, বার্ধক্য ও মৃত্যুকে দূরে সরাও, দীর্ঘ জীবন দাও। ব্রিহস্পতি আমাদের এই বস্ত্র দিয়েছেন, এবং সোমরাজকে এই বস্ত্রে আবৃত করা হবে।” তাঁরা বার্ধক্যকে বললেন, “দূরে যাও, এই বস্ত্র ধারণ করো; অভিশাপ থেকে গৃহের রক্ষা করো, শত শরৎকাল বেঁচে থাকো, খ্যাতিতে প্রসারিত হও, ও অপার ঐশ্বর্যে নিজেকে আচ্ছাদিত করো।” তাঁরা বললেন, “তুমি এই বস্ত্র পরেছ মঙ্গলার্থে, তুমি এখন অভিশাপ থেকে জলসমূহের রক্ষক। শত শরৎকাল বাঁচো, খ্যাতিতে প্রসারিত হও, ও সুন্দর সম্পদ ভোগ করো।” প্রতিটি মিলন, শক্তির প্রতিযোগিতা, পুরস্কারের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাঁরা ইন্দ্রকে বন্ধু হিসেবে আহ্বান করলেন। ঋষিরা উচ্চারণ করলেন, “সোনালি আভাসম্পন্ন, অবিনশ্বর, শুভসন্তানসম্পন্ন, সন্তানাদির মাধ্যমে বার্ধক্য ও মৃত্যু জয় করো। এ কথা অগ্নি, সোম, ব্রিহস্পতি, সব্যিতৃ ও ইন্দ্র বলেন।” এবার, তাঁরা বললেন, “অবিরত চিত্তে তোমায় যোজনা করি, তুমি সর্বোচ্চ হও, উপকূলে নিয়ে যাও, দোহনকারী এগিয়ে যাক।” অগ্নি থেকে উৎপন্ন সোনার কথা স্মরণ করলেন, যা মানুষের মধ্যে অমরত্বের প্রতীক; যিনি তা জানেন, তিনিই তার যোগ্য, এবং যিনি তা ধারণ করেন তিনি বার্ধক্য ও মৃত্যু থেকে মুক্ত হন। ঐ সোনা, যা সূর্যের মতো দীপ্তিমান, প্রাচীন মনু ও তাঁর সন্তানরা যা চেয়েছিলেন—চন্দ্র তা দীপ্তিতে পাঠান; যিনি তা ধারণ করেন, তিনি দীর্ঘজীবী হন। এই সোনা দীর্ঘায়ু, দীপ্তি, বল ও বিক্রমের জন্য; মানুষের মাঝে সোনালি আভায় তুমি দীপ্ত হও। রাজা বরুণ, দেবতা ব্রিহস্পতি, এবং বৃত্রনাশক ইন্দ্র—যা জানেন, তাই হোক তোমার দীর্ঘায়ু ও দীপ্তির উৎস। ষাঁড় গরু দ্বারা, মহাশক্তিমান অশ্ব দ্বারা, বায়ু মন্ত্র দ্বারা, ইন্দ্র তাঁর শক্তি দ্বারা তোমায় রক্ষা করুন। সোম তৃণ দ্বারা, সূর্য নক্ষত্র দ্বারা, চন্দ্র জল থেকে, বায়ু শ্বাস দ্বারা তোমায় রক্ষা করুন। তিনটি স্বর্গ, তিনটি পৃথিবী, তিনটি মধ্যবর্তী স্থল, চারটি সমুদ্র, ত্রৈপদী স্তোত্র ও জল—এই ত্রিগুণ শক্তিতে তোমায় রক্ষা করুক। তিন স্বর্গ, তিন সমুদ্র, তিন দীপ্তিমান, তিন আনন্দলোক, তিন মাতরিশ্বান, তিন সূর্য—এইসবকে তোমার রক্ষক নিযুক্ত করলাম। ঘৃত দ্বারা অগ্নিকে অভিষেক করলাম, স্পষ্ট মাখন দিয়ে তাঁকে বৃদ্ধি করলাম; যেন অগ্নি, চন্দ্র, সূর্য বা প্রাণ প্রতারকদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তোমার শ্বাস, অপান, প্রাণ যেন প্রতারকদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়; দীপ্তিমান, সর্বজ্ঞ দেবতারা দেবগতি নিয়ে ছুটে আসুন। শ্বাসে অগ্নি সংযুক্ত, বায়ু শ্বাসে যুক্ত, দেবতারা শ্বাস দ্বারা সূর্য সৃষ্টি করেছিলেন, যিনি সর্বদিকের মুখী। দীর্ঘায়ুবান জীবন নিয়ে বাঁচো, মরো না। শ্বাস, আত্মা নিয়ে বাঁচো, মৃত্যুর অধীনে পড়ো না। দেবতারা যে গুপ্ত ধন রেখেছিলেন, ইন্দ্র দেবপথে তা আবিষ্কার করেছিলেন—জল ত্রিগুণ রক্ষায় সোনাকে রক্ষা করেছিল; এই ত্রিগুণ শক্তিতে তোমায় রক্ষা করুক। তেত্রিশ দেবতা ও তিন শক্তি, প্রিয়, জলে সংরক্ষিত; এই অমুল্য সোনায় বীরত্বপূর্ণ কর্ম করো। স্বর্গে যে এগারো দেবতা, তাঁরা যেন এই আহুতি গ্রহণ করেন। মধ্যলোকে এগারো দেবতা, তাঁরাও গ্রহণ করুন। পৃথিবীতে এগারো দেবতা, তাঁরাও গ্রহণ করুন। শত্রুদের সামনে ও পেছনে থেকে মুক্ত করো; ডান দিকে সব্যিতৃ, বাম দিকে শক্তিশালী অধিপতি রক্ষা করুন। আকাশ থেকে আদিত্যরা, পৃথিবী থেকে অগ্নিগণ রক্ষা করুন; সামনে ইন্দ্র ও অগ্নি, চারদিকে অশ্বিনীকুমাররা আশ্রয় দিন; দূর থেকে জাতবেদা রক্ষা করুন, সকল সৃষ্টিকর্তা চারিদিকে আমাদের বর্ম হোন। তাঁরা বললেন, “দীর্ঘায়ু ও দীপ্তির জন্য তোমার গলায় এই রত্নবন্দন পরালাম; এই কুশ তৃণ শত্রুদের পরাজয়ের জন্য, শত্রুহৃদয়ে দহন ঘটানোর জন্য।” যেন এই কুশ তৃণ শত্রুদের হৃদয়ে দহন জাগায়, শত্রুমনে দহন সৃষ্টি করে; তুমি দুর্জয়, তাপের মতো তাদের দগ্ধ করো। তাঁরা কুশ তৃণকে বললেন, “শত্রুদের জ্বালিয়ে দাও, গরম ঘর্মের মতো দহন করো, হে রত্ন, তাদের হৃদয় ভেঙে দাও, যেমন ইন্দ্র শত্রুদের শক্তি ভেঙেছিলেন।” আবার বললেন, “হে কুশ, আমার প্রতিদ্বন্দ্বীদের হৃদয় ভেঙে দাও, হে রত্ন; যেমন পৃথিবী থেকে চামড়া উঠে আসে, তাদের মস্তক নত করো।” তাঁরা পুনরায় বললেন, “হে কুশ, আমার শত্রুদের ভেঙে দাও; যারা যুদ্ধে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের ভেঙে দাও; যারা দুর্জয়, তাদের ভেঙে দাও; হে রত্ন, আমার শত্রুদের ভেঙে দাও।” তাঁরা বললেন, “হে কুশ, কাটো আমার শত্রুদের; যুদ্ধে যারা প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের কাটো; যারা দুর্জয়, তাদের কাটো; হে রত্ন, আমার শত্রুদের কাটো।” তাঁরা বললেন, “হে কুশ, বিচ্ছিন্ন করো আমার শত্রুদের; যুদ্ধে যারা প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের বিচ্ছিন্ন করো; যারা দুর্জয়, তাদের বিচ্ছিন্ন করো; হে রত্ন, আমার শত্রুদের বিচ্ছিন্ন করো।” তাঁরা বললেন, “হে কুশ, চিরে দাও আমার শত্রুদের; যুদ্ধে যারা প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের চিরে দাও; যারা দুর্জয়, তাদের চিরে দাও; হে রত্ন, আমার শত্রুদের চিরে দাও।” তাঁরা বললেন, “হে কুশ, চূর্ণ করো আমার শত্রুদের; যুদ্ধে যারা প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের চূর্ণ করো; যারা দুর্জয়, তাদের চূর্ণ করো; হে রত্ন, আমার শত্রুদের চূর্ণ করো।” তাঁরা বললেন, “হে কুশ, বিদ্ধ করো আমার শত্রুদের; যুদ্ধে যারা প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের বিদ্ধ করো; যারা দুর্জয়, তাদের বিদ্ধ করো; হে রত্ন, আমার শত্রুদের বিদ্ধ করো।” অবশেষে, তাঁরা বললেন, “হে কুশ, আঘাত করো আমার শত্রুদের; যুদ্ধে যারা প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের আঘাত করো; যারা দুর্জয়, তাদের আঘাত করো; হে রত্ন, আমার শত্রুদের আঘাত করো।” তাঁরা বললেন, “হে কুশ, চূর্ণ-বিচূর্ণ করো আমার শত্রুদের; যুদ্ধে যারা প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের চূর্ণ-বিচূর্ণ করো; যারা দুর্জয়, তাদের চূর্ণ-বিচূর্ণ করো; হে রত্ন, আমার শত্রুদের চূর্ণ-বিচূর্ণ করো।” এইভাবে, দেবতাদের আহ্বান, আশীর্বাদ, এবং কুশ তৃণের শক্তি দিয়ে ঋষিরা যজ্ঞ সম্পন্ন করলেন, দীর্ঘায়ু, দীপ্তি, বিজয় ও কল্যাণের জন্য ঐশ্বরিক শক্তির আশ্রয় নিলেন।