একদিন, এক পবিত্র যজ্ঞের সময়, ঋষিরা গভীর শ্রদ্ধাভরে নানা স্তোত্র ও মন্ত্রের উদ্দেশ্যে আহুতি নিবেদন করলেন। প্রথমে চৌদ্দ-পদ্য স্তোত্রের উদ্দেশ্যে আহুতি নিবেদন করা হলো—স্বাহা। তারপর পনেরো-পদ্য স্তোত্র, ষোলো-পদ্য স্তোত্র, সতেরো-পদ্য স্তোত্র, এবং অষ্টাদশ-পদ্য স্তোত্রের উদ্দেশ্যে একে একে আহুতি অর্পণ করা হলো—প্রতিটিতেই স্বাহা উচ্চারিত হলো। এরপর ঋষিরা উনিশ, বিশ এবং মহাবিভাগের স্তোত্রের উদ্দেশ্যে আহুতি দিলেন, প্রতিটিতে স্বাহা উচ্চারিত হলো। তারা তিন-পদ্য স্তোত্র, এক-পদ্য স্তোত্র, ক্ষুদ্র স্তোত্র, এমনকি এক-পদ্য কম স্তোত্রের প্রতিও আহুতি নিবেদন করলেন। লালবর্ণ স্তোত্র, দুই সূর্য, ব্রাত্য, প্রজাপতি, বিষাসাহ্য, মঙ্গলিক, এবং ব্রহ্মার উদ্দেশ্যেও আহুতি নিবেদন করা হলো—প্রতিটিতে স্বাহা। এইভাবে, সকল স্তোত্র ও দেবতাদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আহুতি নিবেদন চলতে থাকল। ঋষিরা স্মরণ করলেন—সমস্ত শক্তি ব্রহ্মাতেই প্রাচীনতম, ব্রহ্মা প্রথমে সর্বোচ্চ স্বর্গ বিস্তার করেছিলেন। জীবের মাঝে ব্রহ্মাই প্রথম জন্মগ্রহণ করেন; তাহলে ব্রহ্মার সমকক্ষ আর কে হতে পারে? এরপর ঋষিরা ব্রহ্মণস্পতিকে আহ্বান করে বললেন, “হে ব্রহ্মণস্পতি, দেবতারা যেই শক্তির দ্বারা সavitā দেবতাকে ধারণ করেছিলেন, সেই শক্তি দ্বারা তুমি যেন এই জনকে রাজ্য ও সর্বাধিকার দাও।” তাঁরা ইন্দ্রের দীর্ঘায়ু ও মহাশক্তির জন্য আশীর্বাদ চাইলেন—যাতে বার্ধক্য তাঁকে পরাজিত করতে না পারে, তিনি চিরকাল তাঁর রাজ্য রক্ষা করতে পারেন। তাঁরা ইন্দ্রের শ্রবণের শক্তি ও দীর্ঘায়ুর জন্যও প্রার্থনা করলেন, যেন বার্ধক্য তাঁকে কখনোই ক্লান্ত না করে। ঋষিরা বললেন, “আমাদের দীপ্তি দিয়ে পরিবেষ্টন করো, বার্ধক্য ও মৃত্যুকে দূর করো, দীর্ঘ জীবন দাও। ব্রিহস্পতি এই বস্ত্র দান করেছেন; রাজা সোম এই বস্ত্রে পরিবেষ্টিত হোন।” তাঁরা বার্ধক্যকে বললেন, “দূরে যাও, এই বস্ত্র পরিধান করো; গৃহের অভিশাপ থেকে রক্ষা করো; শত শরৎ বেঁচে থাকো, প্রচুর ঐশ্বর্যে আবৃত হও।” আবার বললেন, “তুমি এই বস্ত্র কল্যাণের জন্য পরেছো; তুমি এখন জলরাশির অভিশাপ থেকে রক্ষাকারী; শত শরৎ বেঁচে থাকো, সুন্দর ধন-সম্পদ ভাগ করে নাও।” তাঁরা প্রতিটি মিলন, শক্তির প্রতিযোগিতা কিংবা পুরস্কারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইন্দ্রকে বন্ধু হিসেবে ডাকলেন—সহায়তার জন্য। তাঁরা বললেন, “স্বর্ণবর্ণ, অবিনশ্বর, সুসন্তানসম্পন্ন, বার্ধক্য ও মৃত্যুকে জয় করো সন্তানদের দ্বারা।” আগ্নি, সোম, ব্রিহস্পতি, সাভিতার ও ইন্দ্র—এভাবেই নির্দেশ দিলেন। এরপর একজন ঋষি বললেন, “আমি অক্লান্ত মনে তোমাদের যুথিবদ্ধ করি, তোমরা সর্বোচ্চে পৌঁছানোর বাহক হও, দোহনকারী এগিয়ে যাক।” অগ্নি থেকে জন্ম নেওয়া স্বর্ণ যখন মানুষের মাঝে অমর হিসেবে স্থাপিত হয়, তখন যিনি এই জ্ঞান জানেন, তিনিই তার যোগ্য; যিনি তা ধারণ করেন, তিনি বার্ধক্য ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বে ওঠেন। সেই স্বর্ণ, সূর্যের মতো দীপ্তিমান, যা প্রাচীন মনু সন্তানদের নিয়ে চেয়েছিলেন—তাকে চন্দ্র দেবতা জ্যোতি দিয়ে পাঠান; যিনি তা ধারণ করেন, তিনি দীর্ঘায়ু হন। এই স্বর্ণ দীর্ঘ জীবন, দীপ্তি, বল ও শক্তির জন্য; যিনি তা ধারণ করেন, তিনি মানুষের মাঝে স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল হন। রাজা বরুণ, দেবতা ব্রিহস্পতি, এবং বৃত্রনাশক ইন্দ্র—যা জানেন, তাই তোমার দীর্ঘায়ু ও দীপ্তি হোক। ঋষিরা আবার আশীর্বাদ করলেন—বৃষ তোমাকে গাভী দ্বারা রক্ষা করুক; মহাবল তোমাকে অশ্ব দ্বারা রক্ষা করুক; বায়ু তোমাকে মন্ত্র দ্বারা রক্ষা করুক; ইন্দ্র তাঁর শক্তি দিয়ে তোমাকে রক্ষা করুক। সোম তোমাকে ঔষধি দ্বারা রক্ষা করুক; সূর্য তোমাকে নক্ষত্র দ্বারা রক্ষা করুক; চন্দ্র, বৃত্রনাশক, তোমাকে জল থেকে রক্ষা করুক; বায়ু শ্বাস দ্বারা তোমাকে রক্ষা করুক। তিনটি স্বর্গ, তিনটি পৃথিবী, তিনটি মধ্যভূমি, চারটি মহাসমুদ্র—ত্রৈতন স্তোত্র, ত্রৈতন জল—তারা এই তিনগুণ শক্তি দিয়ে তোমাকে রক্ষা করুক। তিনটি স্বর্গ, তিনটি সমুদ্র, তিনটি উজ্জ্বল, তিনটি আনন্দলোক, তিনটি মাতারিশ্বান, তিনটি সূর্য—তারা তোমার রক্ষক হোক। তাঁরা অগ্নিকে ঘৃত দিয়ে অভিষিক্ত করলেন, স্পষ্ট মাখলেন—যাতে অগ্নি, চন্দ্র, সূর্য বা শ্বাস কোনো ছলনাকারী দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তাঁরা বললেন, “তোমার শ্বাস, নিম্নশ্বাস, প্রাণ যেন ছলনাকারী দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়; দীপ্তিমান, সর্বজ্ঞ দেবতারা, তোমরা দেবগতি নিয়ে অগ্রসর হও।” শেষে বলা হলো, “শ্বাসের সঙ্গে অগ্নি যুক্ত; বায়ু শ্বাসের সঙ্গে যুক্ত; শ্বাসের দ্বারাই দেবতারা সূর্যকে সৃষ্টি করেছেন—যিনি সর্বদিকের মুখ।” এইভাবে, একে একে আহুতি, আশীর্বাদ, ও দেবতাদের কীর্তন ও স্মরণে যজ্ঞ সম্পন্ন হলো—সমস্ত শক্তি, দীপ্তি ও কল্যাণের জন্য।