একদিন এক সাধক গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করতে শুরু করলেন। তিনি তাঁর সামনে স্থাপন করলেন সেই দেবী-প্রেরণাকে—শুভ ও করুণাময়ী, যিনি চিন্তার জননী। তিনি চাইলেন, এই প্রেরণা যেন তাঁর প্রতি সদয় হন, তাঁর ইচ্ছিত প্রেরণা যেন তাঁরই হয়, এবং সেই প্রেরণা যেন তাঁর মনে প্রবেশ করে, যেমন তিনি চান। এরপর তিনি ব্রিহস্পতি দেবতাকে আহ্বান করলেন—‘‘হে ব্রিহস্পতি, প্রেরণার দ্বারা, প্রেরণার দ্বারাই আমাদের কাছে এসো। আমাদের সৌভাগ্যের অংশ দান করো এবং আমাদের প্রতি সদয় হও।’’ তিনি আবার প্রার্থনা করলেন, ‘‘আঙ্গিরস বংশীয় ব্রিহস্পতি যেন আমার এই বাক্য স্বীকার করেন। তাঁরই দিকনির্দেশনায় দেবত্বরা দেবতাত্ব লাভ করেছিলেন—তাঁর অনুগ্রহে সুচারু অভিলাষ যেন আমাদের অনুসরণ করে।’’ এরপর সাধক স্মরণ করলেন ইন্দ্রকে—‘‘ইন্দ্রই সকল চলমান প্রাণী ও এই বিচিত্র পৃথিবীর রাজা। তিনি তাঁর ভক্তদের ধন দান করেন এবং স্তুতিপ্রাপ্ত হয়ে দূর থেকেও সেই ধন কাছে আনেন।’’ এরপর সাধকের চেতনা প্রসারিত হয়ে গেল মহাপুরুষের দিকে। তিনি অনুভব করলেন, সেই পুরুষের সহস্র বাহু, সহস্র চোখ, সহস্র পদ; তিনি সমস্ত দিক থেকে পৃথিবীকে পরিব্যাপ্ত করেছেন এবং দশ আঙুল পরিমাণ আরও অতিক্রম করেছেন। তিন পা ফেলে তিনি স্বর্গে আরোহণ করেন, চতুর্থ পা রেখে আবার এখানে অবস্থান করেন; এভাবে তিনি সর্বত্র বিস্তৃত, যাহা ভক্ষণ করে ও যাহা ভক্ষণ করে না, উভয়ের মধ্যে। সাধক উপলব্ধি করলেন, পুরুষের এই মহিমা অপরিসীম, তবুও তিনি আরও মহৎ। তাঁর এক-চতুর্থাংশ সমস্ত প্রাণী, আর তিন-চতুর্থাংশ স্বর্গে অমর রূপে বিরাজমান। তিনিই এই সবকিছু—যা ছিল, যা হবে; তিনিই অমরত্বের অধীশ্বর, যাহারা তাঁর সঙ্গে বিকশিত হয়। এই পুরুষকে যখন বিভক্ত করা হয়েছিল, তখন কত অংশে ভাগ হয়েছিল? তাঁর মুখ কী হয়েছিল, বাহু কী হয়েছিল, তাঁর উরু ও পদ কী নামে পরিচিত হলো? তখন তাঁর মুখ থেকে ব্রাহ্মণ জন্মালেন, বাহু থেকে রাজন্য, মধ্যাংশ থেকে বৈশ্য, আর পদ থেকে শূদ্রের উৎপত্তি হলো। তাঁর মন থেকে চন্দ্র, চোখ থেকে সূর্য, মুখ থেকে ইন্দ্র ও অগ্নি, শ্বাস থেকে বায়ুর জন্ম হলো। তাঁর নাভি থেকে মধ্যলোক, মাথা থেকে স্বর্গ, পদ থেকে পৃথিবী, কর্ণ থেকে দিক—এভাবে দেবতারা জগতের বিন্যাস করলেন। আদি কালে বিরাট জন্মালেন, বিরাট থেকে পুরুষ; জন্মের পরে তিনি পৃথিবীর পেছনে ও সামনে বিস্তৃত হলেন। দেবতারা যখন পুরুষকে আহুতি করে যজ্ঞ করলেন, তখন বসন্ত ছিল ঘৃত, গ্রীষ্ম ছিল সমিধ, শরৎ ছিল আহুতি। বৃষ্টিধারায় তারা সেই যজ্ঞ, সেই আদিপুরুষকে অভিষিক্ত করলেন; এই যজ্ঞে দেবতা, সাধ্য ও বসুগণ অংশ নিলেন। সম্পূর্ণ নিবেদিত সেই যজ্ঞ থেকে জন্ম নিল ঘোড়া ও দুই সারি দাঁতযুক্ত প্রাণী; গরু, ছাগল, ভেড়ারও উৎপত্তি হলো। সেই যজ্ঞ থেকে জন্ম নিল ঋক ও সাম, ছন্দোবৃত্ত, এবং যজুঃ। সেই যজ্ঞ থেকে সংগৃহীত হল মিশ্র ঘৃত; তিনি সৃষ্টি করলেন আকাশচারী, অরণ্যচারী ও গ্রাম্য প্রাণী। সাতটি ছিল বেষ্টনী, তিনবার সাতটি ছিল সমিধ; দেবতারা যজ্ঞে পুরুষকে পশুরূপে বেঁধে দিলেন। মহাদেবের মস্তক থেকে, রাজা সোম থেকে, পুরুষ সৃষ্টির পরে সাতাত্তর ভাগ উৎপন্ন হলো। এরপর সাধক তাঁর বাক্য দিয়ে আকাশের দীপ্তিমান নক্ষত্র, পৃথিবীর চলমান প্রাণী, এবং উৎকৃষ্ট বুদ্ধির আকাঙ্ক্ষায় স্বর্গীয় তুর্মিশার বন্দনা করলেন। তিনি অগ্নি, কৃত্তিকা, রোহিণী, মৃগশিরা, আর্দ্র, পুনর্বসু, পুষ্যা, আশ্লেষা, সংক্রান্তি ও মঘার অনুকূলতা কামনা করলেন। তিনি পূর্ব ও উত্তর ফল্গুনী, হস্ত, চিত্রা, স্বাতী, রাধা, বিশাখা, অনুরাধা, জ্যেষ্ঠা, মূলা—এই শুভ নক্ষত্রদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করলেন। পূর্বাষা যেন অন্ন দেয়, উত্তরাষা যেন শক্তি দেয়, অভিজিৎ যেন পুণ্য দেয়, শ্রবণা ও শ্রবিষ্ঠা যেন পুষ্টি দেয়। শতমুখী শতমিশা, উভয় প্রোথপদা, রেবতী, অশ্বয়ুজা, ভরণী—সবাই যেন সৌভাগ্য ও সম্পদ প্রদান করেন। এরপর সাধক প্রার্থনা করলেন, ‘‘যত নক্ষত্র আকাশে, মধ্যলোকে, জলে, পৃথিবীতে, পর্বতে ও দিকগুলোতে আছে, যাদের চন্দ্র পরিচালনা করেন—সব যেন আমার জন্য মঙ্গলময় হয়।’’ তিনি চাইলেন, ‘‘আটাশটি মঙ্গলময় ও কল্যাণকর তারা যেন আমার সঙ্গে একাত্ম হয়; আমি একতা ও মঙ্গল কামনা করি, দিন ও রাত্রিকে প্রণাম জানাই।’’ তিনি প্রার্থনা করলেন, ‘‘সকাল, সন্ধ্যা ও দিনভর শুভলক্ষণ ও সৌভাগ্যসহ আমার মঙ্গল হোক; হে অগ্নি, সহজে আহ্বানযোগ্য, তুমি আমাদের মঙ্গল দাও এবং বাইরে গিয়েও আনন্দসহ ফিরে এসো।’’ তিনি চাইলেন, ‘‘সমস্ত বিদ্বেষ, নিন্দা, অপবাদ দূর হোক; হে সবিতৃ, আমার থেকে শূন্য পাত্র দূর করো। আমরা যেন শুধু পবিত্র ও মঙ্গলময় বস্তু গ্রহণ করি, দোষ ও অপবাদ মুক্ত হই; হে শুভ, তোমার নাসিকা যেন দোষমুক্ত হয় এবং পুণ্য আমার দিকে প্রবাহিত হোক।’’ ব্রহ্মণস্পতি ও ইন্দ্রের কাছে তিনি প্রার্থনা করলেন, ‘‘বিভিন্ন দিকে প্রবাহিত হওয়া বায়ুগুলোকে আমার জন্য অনুকূল করো, সর্বোচ্চ মঙ্গল দাও।’’ তিনি কামনা করলেন, ‘‘আমাদের মঙ্গল হোক, আমরা যেন নির্ভয় হই; দিন ও রাত্রিকে প্রণাম জানাই।’’ অবশেষে সাধক সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জন্য শান্তি কামনা করলেন। ‘‘আকাশ শান্ত হোক, পৃথিবী শান্ত হোক, এই বিস্তৃত মধ্যলোক শান্ত হোক; প্রবাহমান জল, উদ্ভিদ—সবই আমাদের জন্য শান্ত হোক। অতীতের রূপ, আমাদের কর্ম—কৃত ও অকৃত—সব শান্ত হোক; অতীত-ভবিষ্যৎ, সমস্ত কিছু আমাদের জন্য শান্ত হোক।’’ তিনি বাক্যদেবী ও চেতনার জন্য শান্তি চাইলেন, যাদের দ্বারা ভয়ের সৃষ্টি হয়েছিল, তারা যেন শান্তি দান করেন। তিনি চাইলেন, ‘‘আমার পঞ্চেন্দ্রিয় ও মন, যেগুলো ব্রহ্মা আমার হৃদয়ে স্থাপন করেছেন, যাদের দ্বারা ভয়ের সৃষ্টি হয়েছিল—তারা যেন শান্তি দেয়।’’ তিনি মিত্র, বরুণ, বিষ্ণু, প্রজাপতি, ইন্দ্র, ব্রিহস্পতি, অর্যমান—সব দেবতার কাছে শান্তি প্রার্থনা করলেন। তিনি চাইলেন, ‘‘মিত্র, বরুণ, বিবস্বান, অমন্তক, পৃথিবী-আকাশের লক্ষণ, নক্ষত্র—সব যেন শান্তি দেয়।’’ তিনি বললেন, ‘‘কম্পমান পৃথিবীও যেন শান্তি দেয়, উল্কা ও পতিত বস্তু, লাল দুধের গাভী, পৃথিবী ও তার সব পথ—সবই আমাদের শান্তি দিক।’’ এভাবেই সাধক দেবতাদের প্রতি গভীর ভক্তি, প্রেরণা, কল্যাণ ও শান্তির জন্য একাগ্রচিত্তে প্রার্থনা করলেন, এবং তাঁর অন্তর শান্তিতে পূর্ণ হয়ে উঠল।