প্রাচীন ঋষিদের বর্ণনায়, ব্রহ্মাণ্ডের গভীর রহস্য উদ্ঘাটিত হয় এক অনন্য সত্তার মাধ্যমে, যাঁর নাম ভ্রাত্য। তাঁর অস্তিত্বের প্রতিটি স্তরেই লুকিয়ে রয়েছে সৃষ্টির নানা উপাদান ও মহাজাগতিক নিয়ম। তাঁর সপ্তম পদক্ষেপ—এটাই সকল দানের আধার। ভ্রাত্যের প্রথম নিঃশ্বাসেই জন্ম নেয় এই পৃথিবী। দ্বিতীয় নিঃশ্বাসে সৃষ্টি হয় অন্তরীক্ষ। তৃতীয় নিঃশ্বাসে প্রসারিত হয় আকাশ। চতুর্থ নিঃশ্বাসে উদিত হয় অসংখ্য তারা। পঞ্চম নিঃশ্বাসে আসে ঋতুগুলির আবির্ভাব। ষষ্ঠ নিঃশ্বাসে নির্ধারিত হয় সময়ের বিভিন্ন পর্ব। সপ্তম নিঃশ্বাসে প্রতিষ্ঠিত হয় বছর। দেবতারা সকলেই এক অভিন্ন লক্ষ্যের চারপাশে ঘুরে বেড়ান; ঋতুগুলি বছরের অনুগামী, এবং সেইসাথে ভ্রাত্যেরও। যখন দেবতারা সূর্যে প্রবেশ করেন, অথবা অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময়ে, তখনই তাঁদের অমরত্বের মূল রহস্য প্রকাশিত হয়—তা হলো অর্ঘ্য, বা উৎসর্গ। এই ভ্রাত্যর গঠনও রহস্যে পূর্ণ। তাঁর ডান চোখ সূর্য, বাম চোখ চন্দ্র। ডান কান অগ্নি, আর বাম কান পবমান। তাঁর নাসিকা—দিন ও রাত্রি; করোটির দুই ভাগ—দিতি ও অদিতি; তাঁর মাথা—বছর। দিবসে ভ্রাত্য পশ্চিমমুখী, আর রাত্রে পূর্বমুখী। তাঁকে আন্তরিক প্রণতি জানানো হয়। এরপর ঋষিরা ঘোষণা করেন—জলরাজ্যের বলবান ষাঁড় মুক্ত হয়েছে; মুক্ত হয়েছে দেবতাদের অগ্নিশিখা। এগুলো ভেঙে, ঘিরে, চূর্ণ করে, সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। এক ধ্বংসকারী, মন-হরণকারী, খননকারী, দহনকারী, আত্মনাশী ও দেহনাশী শক্তি প্রবাহিত হয়। এই অন্ধকার আমি ছড়িয়ে দিচ্ছি, কিন্তু সে যেন আমায় আচ্ছন্ন না করে। আমরা এই অন্ধকার পাঠিয়ে দিচ্ছি তার বিরুদ্ধে, যে আমাদের ঘৃণা করে, কিংবা যাকে আমরা ঘৃণা করি। আমি জলের কিনারায় দাঁড়িয়ে, তোমাকে পাঠাচ্ছি মহাসাগরের দিকে। যার জলে অগ্নি আছে, তার বিরুদ্ধে আমি পাঠাচ্ছি ধ্বংসকারী, খননকারী ও দেহনাশী শক্তি। যিনি অগ্নি, তিনিই জলে প্রবেশ করেছেন—তোমাদের মধ্যে যা ভীতিকর, সেটাই এই শক্তি। সে যেন ইন্দ্রের শক্তি নিয়ে ছিটিয়ে দেয়। হে জলো, শত্রুকে আমাদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দাও। আমাদের অপরাধ ও কু-স্বপ্নগুলো দূরে নিয়ে যাও। হে জল, সদয় দৃষ্টিতে আমাদের দিকে চাও; কোমল দেহে আমাদের স্পর্শ করো। আমরা জলে অধিষ্ঠিত কল্যাণময় অগ্নিদের আহ্বান করি; দেবীসকল যেন আমাদের শক্তি ও দীপ্তি দান করেন। তারপর ঋষিরা প্রার্থনা করেন—আমার বাক্য হোক নির্ভয়, প্রাণবন্ত, মধুর। তুমি মধুর হও, আমি যেন মধুর বাক্য উচ্চারণ করি। আমার জন্য রক্ষক ও অভিভাবক আহ্বান করা হয়েছে। আমার শ্রবণশক্তি হোক সুস্থ, আমি যেন মঙ্গলময় শব্দ শুনি, মঙ্গলময় স্তোত্র শুনি। ভালো ও মনোযোগী শ্রবণ যেন কখনো আমাকে ছেড়ে না যায়; ঈগলের মতো তীক্ষ্ণ, দীপ্তিমান দৃষ্টি যেন থাকে। তুমি ঋষিদের বেদী, তোমায় প্রণাম জানাই, হে দেববেদী। আমি যেন ধন-সম্পদের শীর্ষে থাকি, সমকক্ষদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হই। কোনো বিপদ যেন আমার ওপর না আসে, আমার মাথা ও ধর্ম যেন অক্ষত থাকে। প্রশস্ততা ও চামচ যেন আমার থেকে না হারায়, সহায়ক ও সমর্থন যেন হারিয়ে না যায়। মুক্তি ও স্নিগ্ধ পাথর, স্নিগ্ধ দাতা ও মাতারিশ্বান যেন আমার থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। বৃহস্পতি—তিনিই আমার আত্মা, মানুষের মধ্যে যিনি প্রসিদ্ধ, হৃদয়ে আনন্দদায়ক।