একদিনের কথা, গাভী নিয়ে নানা রহস্য ও বিধান বর্ণিত হল। বলা হয়, গাভী সেই ব্যক্তিকে নিঃসন্তান ও স্বল্প গবাদিপশুর অধিকারী করে তোলে, যে গাভীর যথাযথ মান রাখে না; আর যখন ব্রাহ্মণেরা তার কাছে কিছু চায়, তখন সে গাভী তার কাছে প্রিয় থাকে না। ব্রাহ্মণেরা নানা কামনার জন্য অগ্নি, সোম, মিত্র ও বরুণকে উদ্দেশ্য করে কিছু চায়; তাদের মধ্যে যে দান করে, সে-ই সমৃদ্ধ হয়। যে ব্যক্তি গবাদিপশুর মালিক, সে যতক্ষণ না এই মন্ত্র শোনে, ততক্ষণ সে গাভীগুলোর মধ্যে ঘুরে বেড়াক; কিন্তু একবার শুনে নিলে, তার আর গৃহে বাস করা উচিত নয়। আর যে শুনেও গাভীগুলোর মধ্যে ঘুরে বেড়ায়, দেবতারা তার জীবন ও সমৃদ্ধি কেড়ে নেন। গাভী নানা পথে ঘুরে বেড়ায়, সে দেবতাদের জন্য রাখা এক অমূল্য সম্পদ; যখন মালিক তাকে হত্যা করতে চায়, তখন সে তার প্রকৃতি প্রকাশ করে। যখন মালিক হত্যার ইচ্ছা করে, তখন গাভী নিজেকে প্রকাশ করে এবং ব্রাহ্মণদের কাছে কিছু চাইবার জন্য মনোনিবেশ করে। মালিক মনে মনে সে-ইচ্ছা গড়ে তোলে, তখন সে দেবী-গাভীকে লাভ করে; তখন ব্রাহ্মণেরা তার কাছে দান চাইতে আসে। পিতৃযজ্ঞ, দেবতাদের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ ও দান—এসব দ্বারা ক্ষত্রিয় গাভীর শক্তির কাছে পৌঁছায়; তবু সে কখনো মায়ের নিন্দা পায় না। গাভী হল ক্ষত্রিয়ের মা, তাই সে প্রথম জন্ম নেয়; গাভী থেকে ব্রাহ্মণদের যা দেয়া হয়, তা কখনো গোপন করা উচিত নয় বলে বলা হয়। যেমন ঘৃত নিয়ে অগ্নিতে আহুতি দেয়া হয়, তেমনি গাভী ব্রাহ্মণদের জন্য দান করলে, অগ্নিগণ তাকে গ্রহণ করেন। যজ্ঞের পিষ্টকের মতো গাভী এই পৃথিবীতে দুধ দানকারিণী; সে মালিকের সব কামনা পূর্ণ করে। যমলোকে সব কামনা গাভী পূর্ণ করে; কিন্তু যে চাওয়া সত্ত্বেও গাভী withheld করে, তার জন্য নরকীয় গতি স্থির হয়। গাভীকে তাড়িয়ে দিলে, সে রাগে মালিকের জন্য ঘুরে বেড়ায়, মনে মনে ভাবে—যে আমাকে তাড়ায়, সে মৃত্যুর ফাঁসে আবদ্ধ হোক। আর যে মনে করে গাভীকে তাড়াচ্ছে, গাভীকে হত্যা করে বা রান্না করে, ব্রহস্পতি নিজে তার সন্তান-নাতিদের চেয়ে নিতে পারেন। গাভীর মধ্যে প্রবল তেজ আছে, সে গাভীগুলোর মধ্যে ঘুরে বেড়ালেও সে সত্যিই গাভী; তাই গাভীর মালিকের জন্য গাভী থেকে বিষ দোহন করা হয়। ব্রাহ্মণদের যা দেয়া হয়, তা গবাদিপশুর কাছে প্রিয় হয়; আর গাভীর জন্য প্রিয় হল, যা দেবতাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। দেবতারা যজ্ঞ থেকে উৎপন্ন গাভীগুলো প্রস্তুত করেছিলেন; নারদ তাদের মধ্যে থেকে ভয়ংকর মলয় তৈল তৈরি করেছিলেন। দেবতারা চিন্তা করলেন—এই গাভী ভোগ্য কি না? নারদ বললেন, তিনি গাভীদের মধ্যে সবচেয়ে ভোগ্য। তারপর জিজ্ঞাসা করা হল, ‘হে নারদ, মানুষের মধ্যে জন্মানো কত গাভী তুমি চেনো? আমি জানতে চাই, কোন গাভী ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কেউ খেতে পারবে না?’ ব্রহস্পতির কাছে বলা হল—মলয়-গাভী ও রথচালকের গাভী, যদি কেউ সমৃদ্ধি চায়, তবে ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কেউ তা খাবে না। নারদকে প্রণাম জানিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করা হল—তাদের মধ্যে কোনটি সবচেয়ে ভয়ংকর, যাকে দান করলে সর্বনাশ হয়? আবারও বলা হল—মলয়-গাভী ও রথচালকের গাভী, ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কেউ খেলে সে সমৃদ্ধি হারাবে। তিন ধরনের গাভী আছে: মলয়-গাভী, রথচালকের গাভী এবং সাধারণ গাভী; এগুলো ব্রাহ্মণদের দান করা উচিত—তাহলে প্রজাপতির যজ্ঞ থেকে কেউ বঞ্চিত হয় না। ‘এটাই হোক তোমাদের আহুতি, হে ব্রাহ্মণগণ’—এই ভাবনা নিয়ে চাওয়া হলে, গৃহের সবচেয়ে ভয়ংকর গাভীটি দান করা উচিত। দেবতারা সমৃদ্ধির গাভীকে ঘিরে রাখলেন, আমাদের দেননি, যদিও আমরা স্তব করলাম; এই স্তোত্রে তারা গাভী ভেঙে দিলেন এবং সে পরাজিত হল। কিন্তু ভেঙে ফেলা ব্যক্তি, ইন্দ্রকে প্রার্থনা করেও, সমৃদ্ধির গাভী পেল না; তাই দেবতারা তাকে কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করলেন, আমিও পরে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হলাম। যারা সমৃদ্ধির গাভী দান করতে চায় বলে চাটুকারিতা করে, তাদের ওপর ইন্দ্রের ক্রোধ জালের মতো নেমে আসে। যারা বলে, ‘গাভালার গাভী দিও না, তাকে তাড়িয়ে দাও’, তাদের ওপর রুদ্রের অস্ত্র ঘিরে থাকুক। কেউ যদি সমৃদ্ধির গাভী রান্না করে বা নিজে খায়, সে কুটিল আচরণে দেবতা, পুরোহিত ও যজ্ঞকারীদের তাদের জগত থেকে বিতাড়িত করে। এই গাভী সৃষ্টি হয়েছে সাধনা ও তপস্যা দিয়ে, ব্রহ্মার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, সে জ্ঞানে অটল। সে সত্যে আবৃত, জ্যোতিতে মোড়া, মহিমায় পরিবেষ্টিত। আত্মশাসনে স্থিত, শ্রদ্ধায় পরিবেষ্টিত, দীক্ষায় সুরক্ষিত, যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিত—সে এই জগতের ভিত্তি। ব্রাহ্মণই তার পথ, ব্রাহ্মণই তার অধিপতি। যে ব্রাহ্মণ থেকে ব্রাহ্মণের গাভী ছিনিয়ে নেয়, সে ক্ষত্রিয়কে জয় করে বটে, কিন্তু সত্য, শক্তি, ধর্ম ও সৌভাগ্য তার থেকে বিদায় নেয়। তার কাছ থেকে শক্তি, তেজ, বল, বাক্য, ইন্দ্রিয়, সমৃদ্ধি ও ধর্ম চলে যায়। ব্রাহ্ম্য, রাজত্ব, প্রজা, দীপ্তি, খ্যাতি, ঐশ্বর্য ও সম্পদ চলে যায়। জীবন, রূপ, নাম, যশ, শ্বাস-প্রশ্বাস, দৃষ্টি, শ্রবণ চলে যায়। দুধ, স্বাদ, আহার, সত্য, কর্ম, দান, সন্তান ও গবাদিপশু—সবই চলে যায় তার কাছ থেকে, যে ব্রাহ্মণ থেকে ব্রাহ্মণের গাভী নিয়ে ক্ষত্রিয়কে জয় করতে চায়। এভাবেই গাভীর মাহাত্ম্য ও তার সঠিক আচরণের বিধান এই শ্রুতিতে বর্ণিত হয়েছে, যাতে সবাই সতর্ক হয় এবং গাভীর যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করে।