একদিন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের গভীর রহস্যময়তায় ধানকে কেন্দ্র করে এক মহাসমারোহের সূচনা হয়। এখানে দিতি হলেন চালনির ঝাঁপি, আর অদিতি সেই ঝাঁপির ধারক, যিনি ধানকে ধারণ করেন; বায়ু হলেন সেই শক্তি, যিনি ধানকে ঝাড়েন। ঘোড়া হলো শস্যদানা, গাভী হলো সিদ্ধ ভাত, আর মশা হলো ধানের তুষ। কাব্রুদের বলা হয় ফসলের খোসা প্রস্তুতকারক, আর তীরকে মেঘের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এই ধানের মাংস যেন কৃষ্ণধাতুতে গঠিত, আর তার রক্ত রক্তিমাভ। তামা, ছাই, সবুজ বর্ণ এবং পদ্মের সুবাসে তার গঠন সম্পূর্ণ। মাড়াইয়ের মঞ্চ, পাত্র, মুসল ও ঢেঁকি, আর বলদের স্থান—সবই এখানে উপস্থিত। ধানের অন্ত্র, চোয়াল, গুদা আর স্নায়ু—সবই একত্রিত। এই পৃথিবীই হয়ে ওঠে সিদ্ধ ভাতের হাঁড়ি, আর আকাশ তার ঢাকনা। ক্ষেতের আল, পার্শ্ব, বালি ও দুই সীমানা—সবই এই মহাযজ্ঞের অংশ। সত্যই হাত ধোয়ার জল, আর সেচের নালা জল ছিটানোর প্রতীক। যজ্ঞীয় স্তোত্র সেই হাঁড়ির উপর স্থাপিত হয়, যজ্ঞকার পুরোহিত পাঠ করেন। পবিত্র শব্দে আলিঙ্গিত, স্তোত্রে পরিবেষ্টিত হয় ধান। এখানে আয়াবন, রথান্তর, আর চামচও উপস্থিত। ঋতুগুলো হলেন রাঁধুনি, আর ঋতুচার্য্যই অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করেন। পাঁচ মুখবিশিষ্ট যজ্ঞপাত্রে ঘর্ম উত্তাপ দেয়। এই ভাতের দ্বারা যজ্ঞের সব জগৎ সম্পূর্ণ হয়, যেখানে সমুদ্র, আকাশ ও পৃথিবী—এই তিন—উপর ও নিচে স্থাপিত। এই ধান, যার জন্য দেবতারা ছিয়াশি প্রকারের অবশিষ্ট প্রস্তুত করেন, তার মহিমা অপরিসীম। ধানের এই মহত্ত্ব সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। যে এই মহত্ত্ব জানেন, তিনি জানেন ধানের প্রকৃত স্বরূপ। তিনি যেন কখনো না বলেন—‘এটুকু অল্প’, ‘এটি সিঞ্চিত হয়নি’, কিংবা ‘এটা কী?’ দাতার ইচ্ছামতো যতটুকু দেওয়া হয়, তার বেশি যেন কিছু না বলেন। ব্রহ্মজ্ঞরা বলেন—‘কেউ ভাত খায় মুখ বাইরে রেখে, কেউ মুখ ভেতরে রেখে।’ আবার বলেন—‘তুমি ভাত খেয়েছ, ভাতও তোমাকে খেয়েছে।’ কেউ মুখ বাইরে রেখে খেলে, তাকে বলা হয়—‘তোমার প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে।’ কেউ মুখ ভেতরে রেখে খেলে, তাকে বলা হয়—‘তোমার শ্বাস-প্রশ্বাসও চলে যাবে।’ তাই বলা হয়—‘আমি ভাতের ভক্ষণকারী নই, ভাতও আমার ভক্ষণকারী নয়। ভাতকে ভাত হিসেবেই খেতে হয়।’ এরপর, একদিন, অন্য এক মস্তক দিয়ে তাকে খাওয়ানো হয়; সেই মস্তক দিয়ে প্রাচীন ঋষিরা তাকে ভক্ষণ করেন। বলা হয়—‘তোমার সন্তান বংশধরদের মধ্যে প্রবীণতমরাই আগে মারা যাবে।’ তখন সে বলে—‘আমি নিচের দিকে, বাইরের দিকে বা ভেতরের দিকে মুখী নই; বরং আমি ব্রিহস্পতির মস্তক দিয়ে খাই। এই মস্তক দিয়েই আমি তাকে ভক্ষণ করেছি, এবং তাকে অর্জন করেছি। এই ভাত সমস্ত অঙ্গ, সন্ধি ও দেহে সম্পূর্ণ; যে এভাবে জানে, সে-ও সমস্ত অঙ্গ, সন্ধি ও দেহে সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে।’ তারপর, অন্য দুটি কর্ণ দিয়ে তাকে খাওয়ানো হয়; সেই কর্ণ দিয়ে প্রাচীন ঋষিরা ভক্ষণ করেন। বলা হয়—‘তুমি বধির হয়ে যাবে।’ সে বলে—‘আমি নিচের, বাইরের বা ভেতরের দিকে মুখী নই; আমি স্বর্গ ও পৃথিবীর কর্ণ দিয়ে খাই।’ এভাবেই সে ভাতকে অর্জন করে। পুনরায়, অন্য দুটি চক্ষু দিয়ে খাওয়ানো হয়; তখন বলা হয়—‘তুমি অন্ধ হবে।’ সে বলে—‘আমি সূর্য ও চন্দ্রের চক্ষু দিয়ে খাই।’ এইভাবে, ভাত সব অঙ্গে, সন্ধিতে, দেহে সম্পূর্ণ হয়; যে জানে, সে-ও তেমনই সম্পূর্ণ। এরপর, অন্য একটি মুখ দিয়ে খাওয়ানো হয়; বলা হয়—‘তোমার সন্তান মুখ দিয়ে মরবে।’ সে বলে—‘আমি ব্রহ্মার মুখ দিয়ে খাই।’ এইভাবে সে অর্জন করে ভাতের পূর্ণতা। পুনরায়, অন্য একটি জিহ্বা দিয়ে খাওয়ানো হয়; বলা হয়—‘তোমার জিহ্বা নষ্ট হবে।’ সে বলে—‘আমি অগ্নির জিহ্বা দিয়ে খাই।’ এভাবেই সে ভাতের সম্পূর্ণতা লাভ করে। এরপর, অন্য দাঁত দিয়ে খাওয়ানো হয়; বলা হয়—‘তোমার দাঁত পড়ে যাবে।’ সে বলে—‘আমি ঋতুগুলোর দাঁত দিয়ে খাই।’ এভাবেই সে ভাতের পূর্ণতা অর্জন করে। পুনরায়, অন্য প্রাণবায়ু দিয়ে খাওয়ানো হয়; বলা হয়—‘তোমার প্রাণবায়ু ত্যাগ করবে।’ সে বলে—‘আমি সপ্তঋষিদের প্রাণবায়ু দিয়ে খাই।’ এইভাবে সে ভাতের সম্পূর্ণতা অর্জন করে। এরপর, অন্য তালু দিয়ে খাওয়ানো হয়; বলা হয়—‘তোমার রাজরোগ হবে।’ সে বলে—‘আমি মধ্যকাশের তালু দিয়ে খাই।’ এভাবেই সে ভাতের পূর্ণতা অর্জন করে। পুনরায়, অন্য পৃষ্ঠ দিয়ে খাওয়ানো হয়; বলা হয়—‘তোমার ওপর বজ্রাঘাত হবে।’ সে বলে—‘আমি দিনের পৃষ্ঠ দিয়ে খাই।’ এভাবেই সে ভাতের পূর্ণতা অর্জন করে। এরপর, অন্য অস্থিমজ্জা দিয়ে খাওয়ানো হয়; বলা হয়—‘তুমি ক্ষেতের ফসল খেতে পারবে না।’ সে বলে—‘আমি পৃথিবীর মজ্জা দিয়ে খাই।’ এইভাবে সে ভাতের সম্পূর্ণতা অর্জন করে। পুনরায়, অন্য উদর দিয়ে খাওয়ানো হয়; বলা হয়—‘তোমার পেটে ব্যাধি হবে।’ সে বলে—‘আমি সত্যের উদর দিয়ে খাই।’ এভাবেই সে ভাতের পূর্ণতা অর্জন করে। এরপর, অন্য মূত্রাশয় দিয়ে খাওয়ানো হয়; বলা হয়—‘তুমি জলে মৃত্যুবরণ করবে।’ সে বলে—‘আমি সমুদ্রের মূত্রাশয় দিয়ে খাই।’ এইভাবে সে ভাতের সম্পূর্ণতা অর্জন করে। এইভাবে, যে ব্যক্তি জানেন—ভাত সমস্ত অঙ্গে, সন্ধি ও দেহে সম্পূর্ণ, তিনিও তেমনি সমস্ত অঙ্গে, সন্ধি ও দেহে সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেন। এই ধান ও ভাতের মধ্য দিয়ে সৃষ্টির গভীর রহস্য ও ঐক্য প্রকাশিত হয়।