সমগ্র বিশ্বজগতে, এমন এক মহান শক্তি আছেন যিনি কোথাও সীমাবদ্ধ নন, যিনি ডলফিন, অজগর, বর্মধারী প্রাণী, মাছ—এমনকি ধূলিকণার আঘাতে যাদের স্পর্শ হয়—সব কিছুর মধ্যেই বিরাজমান। তাঁর জন্য কোনো স্থান দূর নয়, কোনো কিছুই তাঁর দৃষ্টির বাইরে নয়; তিনি পূর্ব ও পশ্চিম সমুদ্র পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীকে একসাথে দেখেন। এই মহান শক্তি হলেন রুদ্র। তাঁর কাছে প্রার্থনা করা হয়—হে রুদ্র, আমাদের ওপর জ্বর, বিষ, বা স্বর্গীয় অগ্নি দিয়ে আঘাত কোরো না, আমাদের ক্ষয় কোরো না। তোমার বজ্র যেন আমাদের থেকে দূরে থাকে, অন্য কোথাও পড়ুক। তিনি স্বর্গে ভবা, পৃথিবীর অধীশ্বর, এবং বিস্তীর্ণ মধ্যলোকেও তিনি পূর্ণ। তিনি যেদিকে গমন করেন, সেই শক্তিকে আমরা নমস্কার জানাই। হে ভবা, রাজাধিরাজ, যিনি পশুর অধিপতি হয়েছ, যিনি যজ্ঞকারীর প্রতি সদয়, তাঁর কাছে প্রার্থনা—যে ব্যক্তি ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখে, বলে ‘দেবতারা আছেন’, তাঁর দ্বিপদ ও চতুষ্পদ সকল প্রাণীর প্রতি তুমি সদয় হও। রুদ্রকে আবার অনুরোধ করা হয়—আমাদের মহানজন, আমাদের সন্তান, গর্ভবতী নারী কিংবা ভবিষ্যতে গর্ভবতী হবে এমন কাউকে, আমাদের পিতা-মাতা, এমনকি আমাদের নিজেদের দেহ—কাউকেই যেন তুমি কোনোভাবে আঘাত না করো, আমাদের প্রতি কোনো অন্যায় যেন না হয়। রুদ্রের যে সমস্ত গর্জনকারী রূপ, যাঁরা উচ্চারিত না হওয়া স্তোত্র ভক্ষণ করেন, যাঁদের মুখ বিশাল, এমনকি কুকুরদেরও, তাঁদের সকলকে আমরা প্রণাম জানাই। যাঁরা শব্দে মুখর, যাঁরা লম্বা চুলের অধিকারী, যাঁদের সম্মান জানানো হয়, যাঁরা একত্রে ভোজন করেন—এই সকল দেবগণ ও তাঁদের সঙ্গীদেরও আমরা প্রণাম করি, যেন আমাদের মঙ্গল ও নিরাপত্তা ঘটে। এবার যজ্ঞের প্রসঙ্গ আসে। সেই যজ্ঞের যে পায়েস বা খিচুড়ি প্রস্তুত হয়, তার শিরোভাগে বিরাজ করেন ব্রিহস্পতি, মুখে ব্রহ্মা। স্বর্গ ও পৃথিবী তার কান, সূর্য ও চন্দ্র তার চোখ, সপ্তঋষি তার শ্বাস-প্রশ্বাস। খুন্তি তার চোখ, ইচ্ছাই তার মুসলা। দিতি হলেন চালনি, অদিতি সেই চালনির ধারক, বায়ু হলেন ফুঁ দানকারী। ঘোড়া হল শস্য, গাভী হল চাল, মশা তার খোসা। কব্রু তার ফালি প্রস্তুতকারক, মেঘ তার তীর। তার মাংস কালো ধাতু, রক্ত লাল। টিন, ছাই, সবুজ রং, পদ্মের সুগন্ধ এতে মিশে আছে। মাড়াইয়ের উঠান, পাত্র, খুন্তি, মাড়াই পাথর, বলদ রাখার স্থান—সবই এতে অন্তর্ভুক্ত। এর অন্ত্র, চোয়াল, গুদ, স্নায়ু—সবই এতে বিদ্যমান। এই পৃথিবীই সেই চাল রান্নার হাঁড়ি, আকাশ তার ঢাকনা। জমি, প্রান্ত, বালি ও দুই সীমারেখা—সবই এতে মিশে যায়। সত্য হল হাত ধোয়া, সেচের জল হল ছিটানো জল। যজ্ঞের স্তোত্র সেই পাত্রে স্থাপিত হয়, যজ্ঞকারীর দ্বারা প্রেরিত হয়। পবিত্র শব্দে জড়িয়ে, স্তোত্র দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়। মহৎ অয়বন, রথান্তর, খুন্তি—সবই এতে ব্যবহৃত হয়। ঋতুগুলো হল রাঁধুনি, ঋতুকর্ম দ্বারা আগুন জ্বলে ওঠে। পাঁচটি মুখবিশিষ্ট যজ্ঞপাত্র, ঘর্ম তার উত্তাপ। এই চালের দ্বারা যজ্ঞের সকল জগত সম্পূর্ণ হয়, যার মধ্যে মহাসাগর, আকাশ, পৃথিবী—উপর ও নিচে—স্থাপিত। এই যজ্ঞের জন্য দেবতারা ছিয়াশি রকমের অবশিষ্টাংশ প্রস্তুত করেন। এই চাল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়—এর মহিমা অপরিসীম। যে এই চালের মহিমা জানে, সে যেন কখনো বলে না ‘এটা অল্প’, ‘এতে জল ছিটানো হয়নি’, বা ‘এটা কী’। যতটুকু দাতা ইচ্ছা করেন, ততটুকুই বলা উচিত, তার বেশি নয়। যারা ব্রহ্মজ্ঞ, তারা বলেন—‘একজন চাল খায় বাইরে মুখ করে, আরেকজন ভিতরে মুখ করে।’ তারা বলেন, ‘তুমি চাল খেয়েছ, চালও তোমাকে খেয়েছে।’ যদি কেউ বাইরে মুখ করে খায়, তাকে বলা হয়—‘তোমার প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে।’ যদি ভিতরে মুখ করে খায়, বলা হয়—‘তোমার শ্বাস-প্রশ্বাস তোমাকে ত্যাগ করবে।’ কিন্তু আমি বলি, ‘আমি চালের ভক্ষণকারী নই, চালও আমার ভক্ষণকারী নয়।’ চালকে কেবল চাল হিসেবেই খেতে হবে। এরপর বলা হয়, তখন তাঁকে আরেকটি মাথা দিয়ে খাওয়ানো হয়; সেই মাথা দিয়ে প্রাচীন ঋষিরাও খেয়েছিলেন। তখন বলা হয়, ‘তোমার সন্তানদের মধ্যে প্রবীণতমই আগে মারা যাবে।’ তখন সে বলে, ‘আমি নিচের দিকে, বাইরে, বা ভিতরে মুখ করে খাইনি, বরং ব্রিহস্পতির মাথা দিয়ে খেয়েছি। সেই মাথা দিয়ে আমি তাকে অর্জন করেছি। এই চাল সমস্ত অঙ্গ, সন্ধি, দেহে পরিপূর্ণ। যে এভাবে জানে, সে-ও সমস্ত অঙ্গ, সন্ধি, দেহে পরিপূর্ণ হয়।’ এরপর তাঁকে আরও দুটি কান দিয়ে খাওয়ানো হয়; সেই কান দিয়ে প্রাচীন ঋষিরাও খেয়েছিলেন। তখন বলা হয়, ‘তুমি বধির হবে।’ তখন সে বলে, ‘আমি নিচের দিকে, বাইরে, বা ভিতরে মুখ করে খাইনি, বরং স্বর্গ ও পৃথিবীর কান দিয়ে খেয়েছি। সেই কান দিয়ে আমি তাকে অর্জন করেছি। এই চাল সমস্ত অঙ্গ, সন্ধি, দেহে পরিপূর্ণ। যে এভাবে জানে, সে-ও সমস্ত অঙ্গ, সন্ধি, দেহে পরিপূর্ণ হয়।’ এভাবেই এই মহাজাগতিক শক্তির সর্বব্যাপীতা, যজ্ঞের গভীর রহস্য, এবং চালের মহিমা এক অপূর্ব ধারায় প্রকাশিত হয়।