এ এক গভীর, অলৌকিক কাহিনি—সাপের বিষ, তার ভয়, এবং দেবতাদের আশীর্বাদে মুক্তির কথা। প্রাচীন কালে, মানুষের জীবনে সাপের বিষ ছিল এক ভয়ানক বিপদ। তখন এই দুষ্ট সাপের হাত থেকে রক্ষার জন্য এক মহৌষধ আবিষ্কৃত হয়েছিল, যা দেশীয় ও বিদেশী, সকল প্রকার সাপের জন্যই কার্যকর। ইন্দ্র স্বয়ং সাপের শক্তি হরণ করেছিলেন, আর পৈদ্ব নামক ঋষি তাকে নিরীহ করে তুলেছিলেন। মানুষেরা সেই পৈদ্বকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করত, যিনি নিজের আশ্রমে দৃঢ় ও অটল ছিলেন। বিষধর সাপেরা, যারা ধ্বংসকারী, তারা যেন দূরে, দীপ্তিমান হয়ে বসে থাকত। তাদের প্রাণ ও বিষ, উভয়ই ইন্দ্রের বজ্রাঘাতে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। শুধু ইন্দ্র নন, মানুষেরাও সেই সাপদের দমন করেছিল। বিষধর, দীর্ঘজীবী, ধ্বংসকারী সকল সাপ নিহত হয়েছিল, চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছিল তাদের শক্তি। কালো সাপকে ঘৃতপাত্র দিয়ে, আর সাদা সাপকে দুর্বাঘাস দিয়ে আঘাত করা হতো। পাহাড়ের ঢালে, কিরাত জাতির এক কন্যা তার সঙ্গিনীদের নিয়ে সোনার কোদাল দিয়ে সেই মহৌষধ খনন করত। তখন এক তরুণ বৈদ্য, চিহ্নিত ও অজেয়, উপস্থিত হতেন। তিনি দেশীয়-বিদেশী, এমনকি উভয় প্রকার বিচ্ছুদেরও অক্ষম করে তুলতেন। ইন্দ্রের মতো মিত্র, বরুণ, বায়ু ও পার্জন্যও সাপের শক্তি হরণ করেছিলেন। ইন্দ্র বারবার সাপ, ধ্বংসকারী, দেশীয়, বিষধর, কালো ও দশফণা বিশিষ্ট সাপকে অক্ষম করেছিলেন। ইন্দ্র প্রথম মহাপ্রজাপতিকে আঘাত করেছিলেন। যারা তৃষ্ণার্ত ছিল, তাদের মধ্যে কে ছিল সারবত্তাযুক্ত, কে ছিল শুষ্ক—তাও তিনি জানতেন। তিনি সব সাপের মাথা একত্রে ধরেছিলেন, যেন ফলের গুচ্ছ। নদীর মাঝখানে গিয়ে, তিনি সাপের বিষকে বহিষ্কার করেছিলেন। তখন প্রার্থনা করা হয়েছিল—সব নদী যেন সমস্ত সাপের বিষ, নিহত, পরাজিত, চূর্ণ ও ছিন্ন সাপদের বিষ বহন করে নিয়ে যায়। উদ্ভিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠটি বাছাই করা হয়, যেমন উর্বর ক্ষেত্র বেছে নেওয়া হয়; দক্ষ রথীর যেমন ঘোড়া চালান, তেমনি বিষও যেন চলে যায়। আগুন, সূর্য, পৃথিবী কিংবা উদ্ভিদের মধ্যে যে বিষ আছে, কাণ্ডা ও কনকনক নামক বিষ—সবই যেন দূরীভূত হয়। আগুন, উদ্ভিদ, সাপ, জল কিংবা বিদ্যুৎ থেকে উৎপন্ন সকল মহান ও বিচিত্র সাপকে আমরা শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে প্রণাম করি। তুমি তৌদী নামে পরিচিত, তুমি ঘৃতাচী নামে পরিচিত; আমি তোমার পদ স্থাপন করেছি বিষনাশক রূপে। অঙ্গ থেকে অঙ্গে, হৃদয় থেকে, সর্বত্র থেকে বিষকে দূর করো; বিষের নিম্নগতি যেন তোমার থেকে চলে যায়। বিষ বহু দূরে চলে গেছে, পূর্বদিকে পালিয়েছে। অগ্নি সাপের বিষ দগ্ধ করেছে, সোম তাকে বহন করেছে; বিষ দন্তের সঙ্গে অমরতায় চলে গেছে। এবার, ইন্দ্রের শক্তি, বল, ক্ষমতা ও বীর্য নিয়ে তোমাকে আহ্বান করা হয়—জয়ের জন্য, একতাবদ্ধতার জন্য, প্রার্থনার গাঁথুনিতে তোমাকে যুক্ত করছি। আবার ইন্দ্রের শক্তি নিয়ে, রাজশক্তির গাঁথুনিতে, ইন্দ্রের গাঁথুনিতে, সোমের গাঁথুনিতে, জলের গাঁথুনিতে তোমাকে আহ্বান করছি। সব প্রাণী ও জল যেন তোমার সঙ্গে যুক্ত হয় জয়ের জন্য। তুমি অগ্নির অংশ, জলের দীপ্তি; হে দেবজল, আমাদের দীপ্তি দাও। প্রজাপতির বিধানে, আমি তাকে এই জগতে প্রতিষ্ঠা করি। তুমি ইন্দ্র, সোম, বরুণ, মিত্র-বরুণ, যম, পিতৃপুরুষ, সবিতার অংশ; সকলেই জলের বিশুদ্ধ সার। হে দেবজল, আমাদের ওপর তোমাদের দীপ্তি বর্ষাও। প্রজাপতির বিধানে, তোমরা এখানে প্রতিষ্ঠিত হও। জলে যার অংশ, তরঙ্গ, বাছুর, বলদ, হিরণ্যগর্ভ, পাথর, চিহ্নিত, স্বর্গীয়, অগ্নি—সকলেই জলে পূজার যোগ্য। তাদের প্রতি আমাদের প্রার্থনা নিবেদন করছি, কিছু গোপন রাখছি না। এই প্রার্থনা ও কর্মে, যারা আমাদের ঘৃণা করে বা যাদের আমরা ঘৃণা করি, তাদের আমরা অতিক্রম করি, পরাস্ত করি। জলের মধ্যে যদি কোনো মিথ্যা বা পাপ করে থাকি, জেনে বা না জেনে, হে জল, আমাদের সমস্ত অকল্যাণ ও পাপ থেকে রক্ষা করো। শেষে, আমি তোমাকে মহাসাগরে প্রেরণ করছি; হে জল, নিজের উৎসে ফিরে যাও। তুমি অক্ষত থেকো, সকল অকল্যাণ থেকে মুক্ত থেকো; আমাদের কিছুই যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এভাবেই দেবতাদের কৃপা, উদ্ভিদের ঔষধ, নদীর প্রবাহ ও মানুষের প্রার্থনায়, বিষের ভয় থেকে মুক্তি আসে, শান্তি ও দীপ্তি ফিরে আসে পৃথিবীতে।