একদিন এক গৃহস্থের ঘরে এক অতিথি এলেন, যিনি বেদে সুপণ্ডিত। গৃহস্থ জানতেন, অতিথি উপস্থিত থাকলে তাঁর আগে কিছু খাওয়া উচিত নয়। কারণ, অতিথিকে আগে আহার করানোই যজ্ঞের শুদ্ধতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষার ব্রত। তাই গৃহস্থ অতিথিকে যত্ন করে খেতে দিলেন, নিজে পরে আহার করলেন। তবে গৃহস্থ জানতেন, যেগুলো বিশেষ সুস্বাদু—যেমন দই, দুধ বা মাংস—সেগুলো অতিথির আগে নিজে খাওয়া অনুচিত। তিনি ব্রত পালনে সতর্ক ছিলেন। এভাবে যিনি জানেন এবং দুধ ঢেলে অর্ঘ্য দেন, তিনি যেমন বিপুল ঐশ্বর্যে অগ্নিষ্টোম যজ্ঞ করে ফল পান, তেমনই ঐশ্বর্য লাভ করেন। যিনি ঘি ঢেলে অর্ঘ্য দেন, তিনি যেমন অতিরাত্র যজ্ঞের মহাফল পান, তেমনই লাভ করেন। আবার, যিনি মধু ঢেলে অর্ঘ্য দেন, তিনি সত্রসত্য যজ্ঞের মতোই সমৃদ্ধি অর্জন করেন। যিনি মাংস ঢেলে অর্ঘ্য দেন, তিনি দ্বাদশাহ যজ্ঞের মতোই ফল পান। আর যিনি জল ঢেলে অর্ঘ্য দেন, তিনি সন্তানের ধারাবাহিকতা, দৃঢ় ভিত্তি ও লোকপ্রিয়তা লাভ করেন। এভাবে জ্ঞানে যিনি অর্ঘ্য দেন, তাঁর যজ্ঞ পূর্ণতা পায়। এদিকে, ঊষা ‘হিং’ ধ্বনি দেন, সবিতৃ প্রশংসা করেন, বৃহস্পতি শক্তির জন্য গীত গেয়ে ওঠেন, ত্বষ্টা পুষ্টির জন্য সৃষ্টি করেন, আর সকল দেবতা বিশ্রামের স্থান প্রস্তুত করেন। এইভাবে যিনি জানেন, তাঁর বিশ্রামের স্থান হয়ে ওঠে ঐশ্বর্য, সন্তান ও পশুসম্পদের আধার। সূর্যোদয়ে সূর্য ‘হিং’ ধ্বনি দেন, প্রভাতে প্রশংসা করেন, মধ্যাহ্নে গান করেন, অপরাহ্নে সৃষ্টি করেন, সন্ধ্যায় বিশ্রামের স্থান প্রস্তুত করেন। যিনি এভাবে জানেন, তাঁর বিশ্রামের স্থান হয় ঐশ্বর্য, সন্তান ও পশুসম্পদের আধার। মেঘও তেমনি—‘হিং’ ধ্বনি দেয়, গর্জনে প্রশংসা, বিদ্যুতে সৃষ্টি, বৃষ্টিতে গান, ঝরাতে বিশ্রামস্থল গড়ে তোলে। যিনি জানেন, তাঁর জন্য বিশ্রামের স্থান হয়ে ওঠে ঐশ্বর্য, সন্তান ও পশুসম্পদের আধার। গৃহস্থ অতিথির দিকে তাকিয়ে ‘হিং’ ধ্বনি দেন, অভিনন্দন জানান, প্রশংসা করেন, জল চান, গান করেন, অর্ঘ্য দেন, সৃষ্টি করেন, আর অবশিষ্টাংশ হয় বিশ্রামের স্থান। এটি জানলে বিশ্রামের স্থান হয় ঐশ্বর্য, সন্তান ও পশুসম্পদের আধার। এভাবে এই বিশ্বরূপের কথা বলা হয়—প্রজাপতি ও পরমেষ্ঠী শৃঙ্গ, ইন্দ্র মস্তক, অগ্নি কপাল, যম পশ্চাৎদেশ। সোম রাজা মস্তিষ্ক, স্বর্গ ঊর্ধ্ব চিবুক, পৃথিবী নিম্ন চিবুক। বিদ্যুৎ জিহ্বা, মরুতেরা দাঁত, রেবতী তারা গলা, কৃত্তিকা কাঁধ, তাপ পিঠ। সর্বব্যাপী বায়ু দেহ, স্বর্গীয় পৃথিবী কালো দাগ ভিত্তি। বাজপাখি কুঁজ, মধ্যবর্তী স্থান অস্থিমজ্জা, বৃহস্পতি কাঁধের পেছন, বৃহতি ও কীকসা ছন্দ গলার চামড়া। দেবতাদের স্ত্রীরা পিঠ, উপসদরা পাশে, পাঁজর। মিত্র-বরুণ, ত্বষ্টা-অর্যমান কাঁধ, দোষণী ও মহাদেব বাহু। ইন্দ্রাণী ছাই, বায়ু লেজ, পবমান পায়ের পেশি। ব্রহ্ম ও ক্ষত্র নিতম্ব, বল উরু। ধাতা ও সবিতা পায়ের পেশি, গন্ধর্ব, অপ্সরা, কুষ্ঠিক, অদিতি খুর। চেতনা হৃদয়, যকৃত বুদ্ধি, ব্রত বক্ষ। ক্ষুধা পেট, ইরা অন্ত্র, পর্বত পাঁজর। ক্রোধ বৃক্ক, রোষ শুক্র, সন্তান জননেন্দ্রিয়। নদী শিরা, বর্ষার দেবতা স্তন, বজ্র স্তন্য। সর্বব্যাপী চামড়া, উদ্ভিদ লোম, তারা রূপ। দেবতা গুদ, মানব অন্ত্র, এখানে পাকস্থলী। রাক্ষস রক্ত, অন্য প্রাণী চর্বি। মেঘ অস্থিমজ্জা, পানীয় সমাপ্তি। অগ্নি উপবিষ্ট, অশ্বিনীদ্বয় উদিত। ইন্দ্র পূবে, দক্ষিণায় দক্ষিণে, যম। প্রত্যঙ্গ পশ্চিমে, ধাতা উত্তরে, সবিতা। সোম রাজা কুশ ঘাসে অধিষ্ঠিত। মিত্র পর্যবেক্ষণ করেন, আনন্দে মুখ ফিরিয়ে নেন। বৈশ্বদেব যুপ্ত, প্রজাপতি মুক্ত, সমস্তই একত্রিত। এই-ই সর্বব্যাপী রূপ, সমস্তের রূপ, গরুর রূপ। যিনি জানেন, তাঁর কাছে গরুগুলি আসে, পাশে দাঁড়ায়। অবশেষে, মাথাব্যথা, মস্তক রোগ, কানের যন্ত্রণা, রক্তপাত—তোমার মাথার সমস্ত রোগ আমরা তাড়িয়ে দিই। এইভাবেই ঋষিরা যজ্ঞ, অতিথিসেবা, বিশ্বরূপ ও রোগনাশের গভীর অর্থ ও ফলাফল বর্ণনা করেন।