একদিন এক পবিত্র যজ্ঞের প্রাঙ্গণে, ঋষিরা ঘোড়ার গতি ও শক্তি নিয়ে গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। তাঁরা বললেন, “হে অশ্ব, তোমার দ্রুতগতি গোপনে লুকিয়ে আছে—সে ঈগলের মধ্যে হোক, বাতাসে হোক, কিংবা তোমার চতুর্দিকে ঘুরে বেড়ানোয়। ওই শক্তি নিয়ে তুমি প্রতিযোগিতায় জয়ী হও, প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে যাও।” তাঁরা আরও প্রার্থনা করলেন, “হে অশ্ব, তোমার স্বরূপ তোমার দেহকে পরিচালিত করুক; আমাদের প্রতি সৌভাগ্য আসুক, আর তোমার জন্য আসুক সুরক্ষা। দেবতা যেন ধীরে ধীরে তোমার জন্য মহান সহায়তা নিরূপণ করেন, যেমন আকাশের আলো নিজেকে নিরূপণ করে।” এরপর ঋষিরা দেবতাদের স্মরণ করলেন—যম, মৃত্যুর দেবতা; অঘমারা, নিরৃতি, বভ্রু, শর্বর, অষ্টা ও নীলশিখণ্ড—এই সব দেবতাগণ উদিত হয়েছেন, তাঁরা যেন আমাদের বীরদের সর্বপ্রকার অমঙ্গল থেকে রক্ষা করেন। তাঁরা মন, আহুতি ও ঘৃত দিয়ে শর্বর, অষ্ট্র ও রাজা ভবকে পূজা করলেন, তাঁদের নমস্কার জানালেন, এবং প্রার্থনা করলেন, “তাঁরা যেন অমঙ্গল-আনয়নকারীদের আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে দেন।” ঋষিরা সমবেতভাবে বললেন, “হে দেবগণ, হে মারুৎগণ, সর্বজ্ঞানী, তোমরা আমাদের অমঙ্গল ও হত্যার হাত থেকে রক্ষা করো। অগ্নি ও সোম, দক্ষতার অধিকারী বরুণ, বায়ু ও পার্জন্য আমাদের প্রতি সদয় থাকুন।” তাঁরা আরও বললেন, “তোমাদের মন, সংকল্প ও উদ্দেশ্য যেন এক হয়; যারা বিচ্ছিন্ন, তাদেরও আমরা ঐক্য দান করি। আমার মন দিয়ে আমি তোমাদের মনকে ধারণ করি, আমার ভাবনা তোমাদের ভাবনায় প্রবেশ করুক। তোমাদের হৃদয় আমার অধীন হোক; তোমরা আমার পথ অনুসরণ করো।” ঋষি অনুভব করলেন, স্বর্গ ও পৃথিবী, দেবী সরস্বতী, ইন্দ্র ও অগ্নি—সবই তাঁর মধ্যে গাঁথা। তিনি সরস্বতীর কাছে প্রার্থনা করলেন, “এই কাজে আমাকে সফলতা দাও।” এরপর তাঁরা বললেন, “পবিত্র অশ্বত্থ বৃক্ষ দেবতাদের বাসস্থান, অসীম আকাশের তৃতীয় স্তরে; সেখানেই দেবতারা অমরত্বদায়ী কুষ্ঠা উদ্ভিদ খুঁজে পেয়েছিলেন।” তাঁরা দেখলেন, আকাশে এক সোনার নৌকা ভাসছে, সোনায় আবদ্ধ; সেখানেই দেবতারা অমরত্বের ফুল, কুষ্ঠা, লাভ করেছিলেন। এই কুষ্ঠা উদ্ভিদ—উদ্ভিদের ভ্রূণ, বরফাচ্ছাদিত পর্বতের ভ্রূণ, সমস্ত সৃষ্টির ভ্রূণ—ঋষিরা তা থেকে ওষধি তৈরি করলেন। তাঁরা বললেন, “হে ওষধিগণ, সোমের রাণী, বহুপ্রভা, বৃহস্পতির কন্যা, তোমরা আমাদের অমঙ্গল থেকে মুক্ত করো। অভিশাপ থেকে, বরুণের বন্ধন থেকে, যমের শৃঙ্খল থেকে, এবং সকল দেবতাপ্রদত্ত অপরাধ থেকে তোমরা আমাদের মুক্ত করো।” তাঁরা আরও প্রার্থনা করলেন, “চোখ, মন বা বাক্য দিয়ে, জাগ্রত বা নিদ্রিত অবস্থায় আমরা যা কিছু করেছি, সোম নিজ শক্তিতে তা সবই পরিশুদ্ধ করুক।” ঋষিরা উচ্চারণ করলেন, “যজ্ঞ বিজয়ী, অগ্নি বিজয়ী, সোম বিজয়ী, ইন্দ্র বিজয়ী; যেন আমরা সকল সংগ্রামে জয়লাভ করি। আমরা অগ্নিহোত্র সম্পাদন করি।” তাঁরা মিত্র ও বরুণের কাছে বললেন, “তোমরা জ্ঞানী, সন্তানসমৃদ্ধ, মধুরতা বর্ষণ করো, আমাদের শক্তি দাও। অমঙ্গল দূর করো, ভুল হলে মুক্ত করো।” তাঁরা বললেন, “হে বন্ধুজন, এই মহাবীর ইন্দ্রের মধ্যে আনন্দ করো; তাঁর শক্তিতে ঐক্যবদ্ধ হও। তিনি যুদ্ধে জয়ী, ধনসম্পদ জয় করেন, বজ্রধারী, প্রতিযোগিতায় সর্বদা বিজয়ী, শত্রুদের চূর্ণ করেন।” ঋষিরা ঘোষণা করলেন, “ইন্দ্রই বিজয়ী; অন্য কেউ যেন জয়ী না হয়। তিনি রাজাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ রাজা। এখানে তাঁকে বন্দনা, পূজা ও আরাধনা করতে হবে। ইন্দ্র, তুমি শ্রেষ্ঠ রাজা, বিখ্যাত, মানুষের মধ্যে মহাশক্তি; তুমি দেবগণের অধিপতি; তোমার রাজত্ব চিরস্থায়ী হোক।” তাঁরা বললেন, “পূর্বদিকে তুমি রাজা, উত্তরদিকে তুমি বৃত্রনাশক, দক্ষিণ থেকে তুমি বলবান হয়ে আহুতি গ্রহণ করো, আর জলধারার যেখানে গতি, সেখানেই তোমার জয়।” ঋষিরা দূর থেকে ইন্দ্রকে আহ্বান করলেন, যেমন পূর্বপুরুষরা করতেন। তাঁরা বললেন, “আজ যারা আমাদের শত্রু হয়ে ক্ষতি করতে চায়, তারা যেন উঠতে না পারে; আমরা চতুর্দিকে ইন্দ্রের বাহু স্থাপন করি।” তাঁরা আরও বললেন, “আমরা ইন্দ্রের বাহু দিয়ে চতুর্দিকে সুরক্ষা স্থাপন করি; রক্ষক আমাদের রক্ষা করুন। হে সবিতার, রাজা সোম, আমাদের মঙ্গলময় চিত্ত দাও।” ঋষিরা স্মরণ করলেন, “দেবতারা দিয়েছেন, সূর্য দিয়েছেন, আকাশ দিয়েছেন, পৃথিবী দিয়েছেন। সরস্বতী তাঁর চিত্ত দিয়ে তিনবার দিয়েছেন, বিষ দূর করেছেন। দেবতারা মরুভূমিতে যে জল ঢেলেছিলেন, তাই দিয়ে এই বিষ পরিশুদ্ধ করো।” তাঁরা বললেন, “তুমি অসুরকন্যা, দেবতাদের বোন, স্বর্গ ও পৃথিবী থেকে জন্ম নেওয়া, তুমি রস, তুমি বিষ সৃষ্টি করেছ।” এরপর তাঁরা বললেন, “বয়ে যাও, শ্বাস নাও, বেড়ে ওঠো, বিস্তার লাভ করো। পুরুষাঙ্গ যথাযথভাবে বৃদ্ধি পাক, তার দ্বারা নারী জয় করো।” তাঁরা ব্রহ্মণস্পতির কাছে প্রার্থনা করলেন, “যা রোগীকে সুস্থ করে, যা কৃশকে পুষ্ট করে, তাই দিয়ে পুরুষাঙ্গকে ধনুকের মতো প্রসারিত করো।” তাঁরা বললেন, “আমি তোমার পুরুষাঙ্গকে ধনুকের মতো টেনে দিচ্ছি; তুমি লাল ষাঁড়ের মতো, নিরন্তর, অপ্রতিহত অগ্রসর হও।” ঋষিরা বললেন, “যেমন ঘোড়ার দল একত্র হয়ে একত্রে চলে, তেমনই তোমাদের মন আমার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হোক, একত্রে চলুক। আমি রাজঘোড়াকে যেভাবে যুতে আনি, তেমনই তোমার মন আমার দিকে আনি; ঘাস যেমন গাঁথা হয়, তেমনই তোমার মনও আমার সঙ্গে গাঁথা হোক।” তাঁরা ভগ দেবতার কৃপা আহ্বান করলেন, মলম, মধু, কুষ্ঠা ও জটামান্সি দিয়ে। ঋষিরা বললেন, “বৃহস্পতি, সবিতৃ, মিত্র, অর্যমান, ভগ ও অশ্বিনীকুমার—তোমরা আমাদের ঐক্যবদ্ধ করো। উচ্চ, নিম্ন ও মধ্যবর্তী সবাই যেন এক হয়; ইন্দ্র তাঁদের ঘিরে রাখুন, অগ্নি তাঁদের আমাদের জন্য ঐক্যবদ্ধ করো।” তাঁরা বললেন, “যারা যুদ্ধের জন্য পতাকা উড়িয়ে আসে, ইন্দ্র তাঁদের ঘিরে রাখুন, অগ্নি তাঁদের আমাদের জন্য ঐক্যবদ্ধ করো।” এরপর তাঁরা বললেন, “গ্রহণ ও বন্ধনের দ্বারা আমরা শত্রুদের অধীন করি; যাদের প্রাণ ও শ্বাস চলে যাচ্ছে, তারা অচেতন হোক।” তাঁরা বললেন, “এই গ্রহণ আমি তপস্যা ও ইন্দ্রের অনুমতিতে করেছি; যারা এখানে আমাদের শত্রু, অগ্নি, তাদের অধীন করো।” তাঁরা বললেন, “ইন্দ্র, অগ্নি, সোম ও পৃথিবীর রাজা তাঁদের আঘাত করুন; ইন্দ্র ও মারুৎগণ আমাদের শত্রুদের ধন-সম্পদ কাড়িয়ে আমাদের দিন।” ঋষিরা বললেন, “মন যেমন চিন্তায় দ্রুত উড়ে যায়, তেমনই হে কাশি, তুমি মন অনুসরণ করে দূরে চলে যাও।” তাঁরা বললেন, “তীক্ষ্ণ তীর যেমন দ্রুত ছুটে যায়, তেমনই তুমি, হে কাশি, পৃথিবীর পথে চলে দূরে চলে যাও।” এইভাবে দেবতাদের স্মরণ, ঐক্য, শত্রু-নাশ, রোগমুক্তি ও কল্যাণের প্রার্থনায় ঋষিরা এক পবিত্র দিনের যজ্ঞ সম্পন্ন করলেন—তাদের হৃদয় ছিল এক, তাদের প্রার্থনা ছিল দেবতাদের উদ্দেশে, আর তাদের আশীর্বাদ ছড়িয়ে পড়ল সকলের মঙ্গলার্থে।