একদিন, কোনো এক দুর্বল ও রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে ঘিরে, ঋষিরা তাঁদের ঔষধি মন্ত্র উচ্চারণ করতে শুরু করলেন। তাঁরা বললেন, “যে রোগ তোমার দেহে বাসা বেঁধেছে, সে যেন বাসা থেকে উড়ে যাওয়া পাখির মতো তোমাকে ছেড়ে চলে যায়। সূর্য যেন তোমাকে আরোগ্য দান করে, চাঁদ যেন তোমার কষ্ট শুষে নেয়।” তাঁরা নানা রকমের রোগের কথা স্মরণ করলেন—কেউ ফ্যাকাশে, কেউ কালো, কেউ লাল, দু’জন হলুদাভ—এই সব রোগের নাম ধরে ডেকে বললেন, “হে সর্বনাশকারী, তোমরা বিদায় হও!” প্রসববেদনা-গ্রস্ত নারী, কষ্টে ভোগা মানুষ, গলার ফোলা কিংবা গয়টার যাঁদের আছে—তাঁদের সকলের দুঃখও যেন দূর হয়। ঋষি তাঁদের মনোযোগ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে বলিদান অর্পণ করলেন, “এ আমার নিবেদন, মনোযোগ সহকারে গ্রহণ করো, স্বাহা!” এরপর তাঁরা নরকের দেবী নিরৃতি-কে সম্বোধন করে বললেন, “যাঁরা ভয়ে আবদ্ধ, তাঁদের মুক্তির জন্য এই বলি। মানুষ তোমাকে পৃথিবী বলে ডাকে, কিন্তু আমি তোমাকে চতুর্দিকে নিরৃতি রূপে জানি।” “তুমি আমাদের মধ্যে বলিদানের অংশী হও, আমাদের পাপ থেকে মুক্ত করো, স্বাহা। হে নিরৃতি, আমাদের সকল পাপ ছিন্ন করো, লোহার শিকল ভেঙে দাও। যম যেন আবার তোমাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়—যমকে, মৃত্যুকে, কুর্ণিশ জানাই। হে লৌহময়, কাঠের, বিদ্ধ, মৃত্যুর সহস্র রূপে পরিচিত, যম ও পিতৃপুরুষদের সঙ্গে তুমি যেন সর্বোচ্চ স্বর্গে আরোহণ করো।” ঋষিরা তখন বরণ বৃক্ষের পুজো করলেন, যিনি অরণ্যের দেবতা। বললেন, “এই দেব বৃক্ষ তোমার রোগ প্রতিহত করুক; যে রোগ তোমার দেহে প্রবেশ করেছে, দেবতারা সেটি দূর করে দিয়েছেন।” আবার, ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ এবং সকল দেবতাদের আদেশে তাঁরা রোগ দূর করার জন্য আহ্বান করলেন। তাঁরা বললেন, “যেমন জলে বৃত্রকে রুদ্ধ করেছিল, তেমনি অগ্নি ও বৈশ্বানরার সাহায্যে তোমার দেহ থেকে রোগ দূর করি।” ঋষিরা ইন্দ্রকে স্বর্গের বল বললেন, পৃথিবীর বল এই ব্যক্তিকে, আর বললেন, “তুমি যেন সর্বত্র একমাত্র বল হও।” সমুদ্র প্রবাহমান নদীর অধিপতি, অগ্নি পৃথিবীর অধিপতি, চন্দ্র তারকারাজ্যের অধিপতি—তুমিও যেন তাঁদের মধ্যে প্রধান বল হও। দেবতাদের মধ্যে তুমি শাসক, মানুষের নেতা—তুমি তাঁদের মধ্যেও একমাত্র বল হও। তাঁরা বললেন, “তোমাকে অন্তর থেকে নিয়ে এসেছি, দৃঢ়ভাবে স্থির হও। সবাই যেন তোমাকে কামনা করে, তোমার শাসন যেন অটুট থাকে।” তাঁরা আরও বললেন, “এখানে থাকো, চলো না, পর্বতের মতো অটল থাকো; ইন্দ্রের মতো দৃঢ় থেকো, তোমার শাসন রক্ষা করো।” ইন্দ্র এই দৃঢ়তাকে বলিদান দিয়ে রক্ষা করেছিলেন; সোম ও ব্রহ্মণস্পতি তাই ঘোষণা করেছিলেন। আকাশ দৃঢ়, পৃথিবী দৃঢ়, এই জগৎ দৃঢ়; পর্বতমালা দৃঢ়, রাজাও দৃঢ়। তোমার রাজা বরুণ দৃঢ়, বৃহস্পতি দৃঢ়; ইন্দ্র ও অগ্নি তোমার শাসন দৃঢ় রাখুন। হে অচঞ্চল, শত্রুদের পরাজিত করো, বিরোধীদের দমন করো; চতুর্দিকের সবাই যেন ঐক্যবদ্ধ হয়, তোমার সভা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হোক। ঋষিরা বললেন, “এই উৎকৃষ্ট মস্তক, যেটি সোম শক্তি দিয়ে দিয়েছেন, তার দ্বারা ও তার উৎপন্ন দ্বারা আমরা তোমার হৃদয়ের অশুভ জ্বালিয়ে দেই।” তাঁরা বললেন, “তোমার হৃদয় ও মন থেকে যা আছে, তা জ্বালিয়ে দেই; যেমন বাতাস ধোঁয়া সরিয়ে দেয়, তেমনই তোমার হৃদয়ের অশুভ আমার থেকে দূরে যাক।” মিত্র, বরুণ, দেবী সরস্বতী, পৃথিবীর মধ্যভাগ ও দুই প্রান্ত আমাদের জন্য ঐক্যবদ্ধ হোক। রুদ্র যদি তোমার অঙ্গ বা হৃদয়ে কোনো বাণ ছেড়ে দেন, আজই আমরা সেই রোগ দূর করি। তোমার অঙ্গে শত শত বিষাক্ত শলাকা যদি গেঁথে থাকে, আমরা তাদের ডাকি, বিষহীন করি। রুদ্রকে নমস্কার, বিরোধীকেও, মুক্তকেও, পতিতকেও নমস্কার। তাঁরা আট ও ছয় উপাদানে প্রস্তুত যবের মিশ্রণ দিয়ে শুচিতা কামনা করলেন, “এতে তোমার দেহের কলঙ্ক ধুয়ে পশ্চিমে সরে যাক।” বাতাস নিচের দিকে বইছে, সূর্য নিচে পোড়াচ্ছে, দুধ না-দেওয়া গাভীও নিচে দুধ দিচ্ছে—তোমার অশুচিতাও নিচে নেমে যাক। জলই আরোগ্য, জলই রোগ দূর করে, জলই সকল রোগের ঔষধ—এই জল তোমার আরোগ্য করুক। তাঁরা বললেন, “ও ঘোড়া, বাতাসের মতো দ্রুত হও, যুদ্ধে প্রস্তুত থেকো; ইন্দ্রের তাড়নায়, চিন্তার গতিতে ছুটো। মারুৎগণ, সর্বজ্ঞ, তোমাকে যোজনা করুন; ত্বষ্টা তোমার পায়ে গতি দিক।” তোমার গতি কোথায় লুকানো—ঈগলে, বাতাসে, না ঘোরার মধ্যে—তুমি সেই শক্তি নিয়ে প্রতিযোগিতায় জয়ী হও। তোমার স্বরূপ তোমার দেহকে পরিচালনা করুক, কল্যাণ আমাদের দিকে, সুরক্ষা তোমার দিকে আসুক; দেবতা তোমার জন্য মহান সহায়তা দিন, যেমন আকাশের আলো নিজেকে মাপে। তাঁরা যম, মৃত্য, অঘমারা, নিরৃতি, বভ্রু, শর্ব, অস্তা ও নীলশিখণ্ড—এই দেবতাদের আহ্বান করলেন, “তারা আমাদের বীরদের অকল্যাণ থেকে রক্ষা করুন।” তাঁরা শর্ব, অস্ত্র ও রাজা ভব-কে ঘি ও মনোযোগ দিয়ে পূজা করলেন, “আপনাদের নমস্কার, কুর্ণিশ, আমাদের থেকে অকল্যাণ দূর করুন।” তাঁরা প্রার্থনা করলেন, “আমাদের অকল্যাণ, হত্যার হাত থেকে রক্ষা করো, দেবগণ, মারুৎগণ, অগ্নি, সোম, দক্ষ বরুণ; বাত ও পার্জন্যের কৃপা যেন আমাদের হয়।” ঋষিরা বললেন, “তোমাদের মন, সংকল্প, উদ্দেশ্য এক হোক; যারা বিভক্ত, তাদেরও ঐক্য দিই।” তাঁরা বললেন, “আমার মন দিয়ে তোমাদের মন ধারণ করি, আমার ভাবনা তোমাদের মনে প্রবেশ করুক; তোমাদের হৃদয় আমার অধীন হোক, তোমরা আমার পথ অনুসরণ করো।” আকাশ, পৃথিবী, দেবী সরস্বতী, ইন্দ্র ও অগ্নি আমার সঙ্গে যুক্ত; সরস্বতী যেন আমাকে সফলতা দান করেন। তাঁরা বললেন, “পিপল গাছ দেবতাদের বাসস্থান, অসীম আকাশে তার স্থান; সেখানে দেবতারা অমরত্বের ঔষধ কুষ্ঠা খুঁজে পেয়েছিলেন।” আবার বললেন, “স্বর্ণে মোড়া এক স্বর্ণপাত্র আকাশে চলে গেল; সেখানে দেবতারা অমরতার ফুল—ঔষধি কুষ্ঠা—পেয়েছিলেন।” এইভাবে, ঋষিদের মন্ত্র ও প্রার্থনায় রোগ, অকল্যাণ, শত্রুতা ও দুঃখ দূর হয়ে, ঐক্য, আরোগ্য, ও চিরস্থায়ী কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। দেবতাদের কৃপায়, প্রকৃতির শক্তিতে, ও মানুষের দৃঢ় সংকল্পে, জীবন আবার শান্তি ও সুস্থতায় ভরে ওঠে।